জ্বলদর্চি

শহর : তমলুক || স্কেচ : চন্দন বৈতালিক / তথ্য : প্রদীপ্ত খাটুয়া




শহর : তমলুক

স্কেচ : চন্দন বৈতালিক 

তথ্য : প্রদীপ্ত খাটুয়া 


তমলুক স্টিমার ঘাট

পশ্চিমবঙ্গের রূপনারায়ণ নদীর তীরে অবস্থিত তমলুক স্টিমার ঘাট, প্রাচীন বন্দর নগরী তাম্রলিপ্তের একটি ঐতিহাসিক স্থান। সপ্তম শতাব্দী থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এটি পরিদর্শন করেছিলেন। আজ ঘাটটি একটি মনোরম পরিবহন স্থান হিসেবে কাজ করে যেখানে পুরানো ঔপনিবেশিক যুগের কাঠামো এবং প্রাণবন্ত নদীর দৃশ্য দেখা যায়। 

ঐতিহাসিকভাবে তাম্রলিপ্ত বা তাম্রলিপ্তি ছিল একটি প্রধান সামুদ্রিক কেন্দ্র, যা ভূগোলবিদ টলেমি এবং প্লিনি উল্লেখ করেছেন। এখান থেকে তামা, নীল ও রেশম দূরবর্তী দেশগুলিতে রপ্তানির মাধ্যমে বাণিজ্য সহজতর হয়েছিল।

সপ্তম শতাব্দীতে চীনা সন্ন্যাসী জুয়ানজ্যাং এই অঞ্চলটিকে একটি সমৃদ্ধ বৌদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্র এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হিসাবে নথিভুক্ত করেছিলেন।

স্থানীয় উৎসব, বিশেষ করে দুর্গাপূজা এবং মকর সংক্রান্তির সময় এই অঞ্চলটি সক্রিয় থাকে, যা এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। 

প্রাচীন বর্গভীমা মন্দিরের খুব কাছেই অবস্থিত           হওয়ায় স্টিমারঘাট অঞ্চলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সার্কিটের অংশ হয়ে উঠেছে।


বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনীর স্মৃতি-স্তম্ভ 

মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এক মহান বিপ্লবী নেত্রী। বিয়াল্লিশের 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ২৯ সেপ্টেম্বর তদানীন্তন মেদিনীপুর জেলার বর্তমানে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ছয় হাজার মহিলা স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে তমলুক থানা দখলের উদ্দেশ্যে একটি মিছিল বের করে। এই মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ৭৩ বছর বয়সী মাতঙ্গিনী হাজরা। শহরের উপকণ্ঠে মিছিল পৌঁছালে ব্রিটিশ রাজপুলিশ ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু সেই আদেশ অমান্য করে মাতঙ্গিনী অগ্রসর হলে তাঁকে তিনবার গুলি করা হয়। গুলি লাগে তার কপালে ও দুই হাতে। কংগ্রেসের পতাকাটি মুঠোর মধ্যে শক্ত করে উঁচিয়ে ধরে ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি উচ্চারণ করতে করতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

 বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা ব্রিটিশ শাসকদের বুলেটের আঘাত খেয়ে যেখানে ভূমিশয্যা নিয়েছিলেন, তমলুক জেলা কোর্টের পেছনে বানপুকুরের পাশে সেই পুণ্যস্থানে নির্মিত হয়েছে ছোট্ট অথচ সুন্দর মাতঙ্গিনী স্মৃতি স্তম্ভ (১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ)। এই স্মৃতিস্তম্ভের পাশেই সম্প্রতি মাতঙ্গিনীর একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি স্থাপিত হয়েছে‌। এবং স্থানটিকে সুন্দরভাবে সুসজ্জিত করাও হয়েছে।

সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হল জ্বলদর্চি'র নববর্ষের বৈঠকি আড্ডা ১৪৩৩

তাম্রলিপ্ত সংগ্রহশালা ও গবেষণাকেন্দ্র

তমলুক শহরের অন্যতম দর্শনীয় হল 'তাম্রলিপ্ত সংগ্রহশালা ও গবেষণাকেন্দ্র' বা তমলুক মিউজিয়াম। এখানে স্থান পেয়েছে নানা পুরাবস্তু যাদের পাওয়া গেছে তমলুক এবং তার আশপাশ থেকে। তমলুক থেকে ১৪/১৫ কিলোমিটার দূরে রূপনারায়ণের তীরবর্তী নাটশাল অঞ্চল থেকে প্রস্তরযুগের বহু গুরুত্বপূর্ণ পুরাবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলিও রাখা হয়েছে এই মিউজিয়ামে। নাটশাল অঞ্চল থেকে পাওয়া পুরাবস্তুগুলি সংখ্যায় অনেক। 

এগুলির মধ্যে আছে, আদি প্রস্তর যুগ থেকে মধ্যপ্রস্তর যুগ অবধি আদিম মানুষের ব্যবহৃত প্রস্তরীভূত হাড়, পাথরের অস্ত্রশস্ত্র, হরিণের শিঙের উপর খোদাই করা নকশাযুক্ত আসবাব, তামা ও হাড়ের তৈরি অস্ত্রশস্ত্র, মৌর্য-সুঙ্গ যুগ থেকে পাল-সেন আমল অবধি প্রাপ্ত বহু পোড়ামাটির মূর্তি, ফলক ও নানাবিধ খেলনা-পুতুল, জাতকের কাহিনী সম্বলিত পোড়ামাটির কয়েকটি ফলক, ব্রাহ্মীলিপি উৎকীর্ণ হাঁড়ি, প্রাচীন তাম্রপট, ব্রোঞ্জের ক্ষুদ্রাকৃতি দেবীমূর্তি, প্রাচীন কিছু প্রস্তর ভাস্কর্য ইত্যাদি। বেশ কিছু প্রাচীন মুদ্রাও রয়েছে এই মিউজিয়ামে। এগুলি বিভিন্ন যুগের। মিউজিয়ামের প্রায় সব পুরাবস্তু তমলুক এবং তার আশপাশ থেকে পাওয়া এবং এগুলি প্রাচীন তাম্রলিপ্তেরই নিদর্শন।


বর্গভীমাদেবীর মন্দির 

পশ্চিমবঙ্গে আজ পর্যন্ত যে কটি মন্দির স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত তাদের অন্যতম হলো পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত তমলুকের (প্রাচীন তাম্রলিপ্ত) দেবী বর্গভীমা মন্দির। তমলুক বিখ্যাত দেবীতীর্থ হিসাবে। বলা যেতে পারে তীর্থস্থান। ৫১টি মহাপীঠের এক পীঠ, দেবী দুর্গার খণ্ড-বিখণ্ড দেহের 'বামগুলফ' (পায়ের বাম গোড়ালির অংশ) এখানে পড়েছিল। দেবী এখানে ভীমরূপা। তাই তিনি বর্গভীমা। বর্গভীমা দেবীর মূর্তি একশিলা পাথরের। এই পাথরের সামনের দিকে মূর্তিটি খোদিত। উগ্রতারার মতো এই মূর্তি। বর্গভীমা খুবই জাগ্রতা দেবী। বর্গী তথা মারাঠারা এই দেবীকে ষোড়শোপচারে পূজা করেছে। বহুকাল ধরে তমলুক শহরে অন্য কোন দেবীপূজা নিষিদ্ধ ছিল।

বর্গভীমাদেবীর মন্দির এক প্রাচীন কীর্তি। অনেকে মনে করেন সম্রাট অশোক তাম্রলিপ্তে যে স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন, উত্তরকালে সেই স্তূপের উপরে এই মন্দিরটি নির্মিত। মাটি থেকে প্রায় কুড়ি ফুট উঁচুতে, রাস্তা থেকে ২২ টি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হয়। মূল মন্দির বা দেউলের উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট। 

বর্গভীমা মন্দির নিয়ে তিনটি কিংবদন্তি প্রচলিত। প্রবাদ অনুসারে এক ধীবর রমণীর মুখে মরা শোল মাছের জ্যান্ত হওয়ার রহস্য অনুসন্ধান থেকে রাজা তাম্রধ্বজ সেখানে দেবীর মন্দির বানিয়ে পূজার ব্যবস্থা করেন। সেই থেকেই মা বর্গভীমা পূজা পাচ্ছেন তমলুকে।


তমলুক রাজবাড়ি 

তমলুক রাজবাড়ির সঙ্গে যুক্ত ইতিহাস ২৫০০ বছর আগের।  রাজবাড়ির প্রাসাদটি খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে ময়ূরধ্বজ রাজবংশ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

মহাভারত, ভাগবত, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ ইত্যাদিতে ময়ূর-ধ্বজ (ময়ূর) রাজবংশকে সেই অঞ্চলের একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং সবচেয়ে উঁচু রাজবংশ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। তমলুক রাজবাড়ি এলাকাটিতে একটি প্রশস্ত আঙিনা রয়েছে। বর্তমানে বামদিকের অংশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সামনের দিকে বিশাল প্রধান কাঠামো রয়েছে যার প্রশস্ত স্তম্ভযুক্ত আর্চগুলি ইসলামিক স্থাপত্যের অনুরূপ খিলানগুলিতে পরিণত হয়েছে। পুরো কাঠামো ইট দিয়ে তৈরি এবং সম্পূর্ণ দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। 

এছাড়াও, এই স্থানটি মহাভারত মহাকাব্যের দেবী দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভার (বিবাহ অনুষ্ঠান) ঘটনার সঙ্গেও যুক্ত। শ্রীকৃষ্ণ নিজেই কুন্তীর পুত্র অর্জুনের কাছে তমলুকের প্রতি তাঁর স্নেহের কথা স্বীকার করেছিলেন।

মন্দির প্রধান ভারতবর্ষের অন্যতম আদি সভ্যতার কেন্দ্রস্থল যে, তাম্রলিপ্ত ছিল, রাজবাড়ির মন্দির পরিদর্শনে সে ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

ঔপনিবেশিক শাসনকালে মহাত্মা গান্ধী এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীরা তমলুক রাজবাড়ি পরিদর্শন করেছিলেন।


তমলুক হ্যামিল্টন হাইস্কুল (উচ্চমাধ্যমিক)

১৮৫২ সালের মে মাসে স্যার রবার্ট চার্লস হ্যামিল্টনের উদ্যোগে যে 'Middle English School' স্থাপিত হয়, তা ‘হ্যামিল্টন হাই ইংলিশ স্কুল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন হ্যামিল্টন সাহেব। পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার নেন-রাজেন্দ্রলাল গুপ্ত, শ্রুতিনাথ চক্রবর্তী, কালোবরণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ শিক্ষাব্রতী ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ১৯৫৯ সালে এই স্কুল 'তমলুক হ্যামিল্টন হাইস্কুল (উচ্চ মাধ্যমিক)' নামে পরিচিত হয়।

            তমলুক হ্যামিল্টন হাইস্কুল এই দেড়-শত বৎসরের ইতিহাসে অবিভক্ত বাংলায় শিক্ষা সংস্কৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছে। এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন বিজ্ঞানী পুলিনবিহারী সরকার, ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠি, শিক্ষাবিদ অমলকৃষ্ণ ভট্টাচার্য্য, সুকুমার দত্ত, ডঃ সুকুমার মাইতি, চিত্রশিল্পী পরেশ মাইতি প্রমুখ। শুধু শিক্ষা-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে নয়, ভারতের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে এই স্কুলের ছাত্রদের ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই স্কুলের ছাত্র ক্ষুদিরাম বসু হয়েছেন বাংলার প্রথম বীর বিপ্লবী শহীদ। এছাড়াও যদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, পূর্ণচন্দ্র সেন, অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়, রজনীকান্ত প্রামাণিক, সুশীল কুমার ধাড়া, রমণী মোহন মাইতি প্রমুখ জাতীয় আন্দোলনের মুক্তিযোদ্ধা ও দেশ নায়কের ছাত্র-জীবন অতিবাহিত হয়েছে এই স্কুলের অঙ্গনে।


 মহাপ্রভু মন্দির



তমলুক শহরের কোর্ট এলাকার সন্নিকটে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের মন্দির অবস্থিত। 

এই মন্দির নির্মাণ সম্পর্কে একটি কাহিনী কথিত আছে। ১৪০২ শকাব্দে (ইংরেজি ১৫২০) শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তমলুক হয়ে পুরী গমনকালে তাম্রলিপ্তে স্নান করেন এবং শ্রীমধুসূদন বিগ্রহ পরিদর্শন করেন। ১৪৫৫ শতাব্দী অর্থাৎ ইংরেজি ১৫৩৪ খ্রিস্টাব্দে মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের পর তার প্রিয় শিষ্য বাসুদেব ঘোষ (বিশিষ্ট গৌড়ীয় বৈষ্ণব কবি এবং চৈতন্যের প্রত্যক্ষ সহযোগী) অত্যন্ত শোকাকুল হয়ে তমলুকে মহাপ্রভুর বিগ্রহ ও বৈষ্ণবধর্ম প্রচার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তীর্থ পর্যটনের মধ্য দিয়েও তিনি মানসিক শান্তি পাননি। তিনি শেষ পর্যন্ত তমলুক প্রত্যাবর্তন করে নিজেকে মহাপ্রভু মন্দিরের বাইরে অবস্থিত বকুলতলায় মাটির মধ্যে প্রোথিত করেন। যার জন্য মহাপ্রভুর মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলটি 'নরপোতা' নামে খ্যাত।

বর্তমানে যে মহাপ্রভুর মন্দির রয়েছে তা বাসুদেবের সময়কার নয়। তার প্রায় আড়াইশো বছর পরে তমলুকের রাজা আনন্দনারায়ণ রায়ের (খ্রি. ১৭৭১-১৭৯৫) রাণী হরিপ্রিয়া দেবী বহু অর্থ ব্যয়ে বর্তমান মন্দির নির্মাণ করেন। মহাপ্রভু মন্দিরে যে কিশোর গৌরাঙ্গের দারুময় মূর্তি রয়েছে যা পুরী থেকে নিয়ে আসা বলে কেউ কেউ অনুমান করেছেন। এটি একটি উল্লেখযোগ্য গৌড়ীয় বৈষ্ণব স্থান।

🍂

Post a Comment

0 Comments