মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০৫
শ্রীপতিচরণ প্রধান (অধ্যাপক, শিক্ষাব্রতী, রামনগর)
ভাস্করব্রত পতি
স্বপ্ন দেখতেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ওড়িশা সীমান্তবর্তী রামনগর এলাকায় এখানকার ছাত্র ছাত্রীদের জন্য একটি মহাবিদ্যালয় নির্মাণের। উচ্চশিক্ষার জন্য যা হয়ে উঠবে আলোর দিশারী। তাঁর স্বপ্নপূরণ হয়েছিল। তাঁর ইচ্ছে বাস্তবায়িত হয়েছিল। তাঁর সাধ নতুন দিনের আলোয় আলোকিত হয়েছিল।
শ্রীপতিচরণ প্রধান। একজন আপাদমস্তক শিক্ষাবিদ। মেদিনীপুরের অনালোচিত শিক্ষা সম্প্রসারক। রামনগরের দয়ানিধিবাড় গ্রামে ১৯২৬ এর ২৮ শে এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন এই মানুষটি। বাবা প্রসন্নকুমার প্রধান এবং মা হেমাঙ্গিনী প্রধান। ছোট থেকেই মেধাবী ও কৃতি ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন যথেষ্ট কর্মঠ।
একদিকে ছিলেন শিক্ষাব্রতী, অন্যদিকে নিস্বার্থভাবে সমাজসেবা চালিয়ে গিয়েছেন আজীবন। এলাকার জীর্ণ মন্দির সংস্কার সহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও উদ্যোগে সামিল ছিলেন আমৃত্যু। ১৯৯৯ এর ১৭ ই জুলাই মৃত্যু হয় শ্রীপতিচরণ প্রধানের।
রামনগর মহাবিদ্যালয়
প্রথমে মানিকাবসান হাইস্কুল এবং পরে রামনগর রাও হাইস্কুল থেকে ১৯৪৮ এ ম্যাট্রিক পাস করেন। কাঁথি প্রভাত কুমার কলেজ থেকে আই.এ. পাস করে চলে যান কলকাতা। সেখানে ১৯৫২ তে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ. পাশের ডিগ্রি অর্জন করেন।
পাঠ শেষ হতেই মেধাবী শ্রীপতিচরণ প্রধান সাদী রাজেন্দ্র নারায়ণ হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এক অভূতপূর্ব উত্তরণ। আর এটাই প্রাপ্য ছিল তাঁর। শুরু হল কর্মজীবনের পথচলা। থেমে থাকার উপায় নেই আর। শিক্ষক জীবনকে পাথেয় করেই তাঁর নিরন্তর পথচলা।
চাকরিরত অবস্থাতেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সংস্কৃত বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের জন্য। অবশেষে সংস্কৃত বিষয়ে এখান থেকে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। ফের তাঁর কর্মস্থল বদলে যায়।
এবার অধ্যাপক পদে যোগদান করেন দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার টেংরাখালি বঙ্কিম সর্দার কলেজে। উত্তরণের সিঁড়ির ধাপ আরও বাড়তে লাগলো। এই মহাবিদ্যালয়ে কাজ করতে করতেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নিজের জেলা, নিজের জন্মস্থান রামনগরের বুকে একটি নতুন মহাবিদ্যালয় স্থাপনের।
তাঁর স্বপ্ন, তাঁর ভাবনা, তাঁর ইচ্ছাকে সফল করতে পাশে এসে দাঁড়ালেন উপাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ সেন, টেংরাখালি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুধীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, দেপাল বাণেশ্বর চারুবালা বিদ্যামন্দিরের প্রধানশিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ সাউ প্রমুখ বিশিষ্ট মানুষজন। সকলেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন অকাতরে। প্রশাসনিক কাজকর্মের যাবতীয় গিঁট খোলার কাজ সম্পাদিত হল ধীরে ধীরে। পাশে পেলেন স্থানীয় জনগণকেও।
অবশেষে ১৯৭২ সালের ৯ ই সেপ্টেম্বর রামনগরের বুকে রামনগর মহাবিদ্যালয় গড়ে তোলার অনুমোদন গৃহীত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা থেকে। এটি ছিল সেসময়কার কাঁথি মহকুমার পঞ্চম উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। এটি ছিল তাঁর জীবনের নানা ধরনের কাজের অন্যতম মাইলস্টোন। এই মহাবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাথমিকভাবে তিনি জমিদান (৫৩ ডেসিমাল) করেন। আর সেসময় বিপুল পরিমাণ অর্থের (২৫০০০ টাকা) সংস্থানও তিনিই করে দিয়েছিলেন। এছাড়াও জমি ও অর্থ দিয়েছিলেন প্রফুল্ল কুমার পাত্র। সেসময় আরও যাঁদের নামোল্লেখ করা যায়, তাঁরা হলেন বলরাম দাস, অবিনাশচন্দ্র দাশ, অনিলকুমার প্রধান, মৃগাঙ্কশেখর মাইতি, রামপদ পাণিগ্রাহী, ব্রজকৃষ্ণ মণ্ডল, সুরেন্দ্রনাথ সাউ, যতীন্দ্রনাথ মাইতি, বিশ্বেশ্বর পাণিগ্রাহী প্রমুখ। শুরু হয় মহাবিদ্যালয়ের পথচলা। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন (২/৭/১৯৭৩) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ সেন।
রামনগর মহাবিদ্যালয়ের লোগো
সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা রামনগর মহাবিদ্যালয়ের প্রথম অধ্যক্ষের দায়িত্ব অর্পিত হয় মেদিনীপুরের এই মহান মানুষ রতনটির ওপর। তিনি অধ্যক্ষ পদে সরকারিভাবে আসীন হন ১৯৭৩ এর ১ লা আগস্ট। নিজের দায়িত্বের প্রতি অবিচল থেকে ১৯৯৮ এর ৩০ শে এপ্রিল পর্যন্ত কাজ চালিয়ে গিয়েছেন সুচারুভাবে। যদিও প্রথমে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন অধ্যাপক শশধর মাইতি (পি আই সি ০১/০৯/১৯৭২ - ৩১/০৭/১৯৭৩)।
🍂
0 Comments