জ্বলদর্চি

বিশ্ব ধরিত্রী দিবস : বাসযোগ্য পৃথিবীর অঙ্গীকার গ্রহণের দিন/পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

বিশ্ব ধরিত্রী দিবস:  বাসযোগ্য পৃথিবীর অঙ্গীকার গ্রহণের দিন

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

১৯৬৯ সালের ২৮ জানুয়ারি। ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা বারবারা চ্যানেল থেকে প্রায় ৬ মাইল দূরে ইউনিয়ন অয়েল কোম্পানির 'প্ল্যাটফর্ম এ' নামের একটি অফশোর ড্রিলিং রিগ-এ একটি তেলের কূপ খননের সময় প্রচণ্ড চাপে বিস্ফোরণ ঘটে যায়। এটি ছিল একটি বড়সড় পরিবেশগত বিপর্যয় যেটি আমেরিকার ইতিহাসে আজও কালো অক্ষরে লেখা আছে। কর্মীরা কূপটি বন্ধ করার চেষ্টা করলেও সমুদ্রতলের ভূত্বক ভেঙে একসাথে পাঁচটি জায়গায় ফাটল ধরে। ফলে, মূল কূপের মুখ বন্ধ করা হলেও সমুদ্রতলের ফাটল দিয়ে তেল ও গ্যাস বেরোতে শুরু করে। সান্টা বারবারার নীল জলরাশি অপরিশোধিত তেলের কালচে আস্তরণে ঢেকে যায়। এই অপরিশোধিত তেলের কারণে প্রায় ৩,৫০০ সামুদ্রিক পাখি এবং অসংখ্য ডলফিন, সিল ও সামুদ্রিক সিংহ মারা যায়।

সমুদ্রের ওপর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত তেলের কালচে আস্তরণ এবং হাজার হাজার মৃত সামুদ্রিক পাখির দৃশ্য দেখে উইসকনসিনের ডেমোক্র্যাট সিনেটর গেলর্ড নেলসন গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন।তিনি ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ওয়াশিংটনে ফিরে এসে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের রাজনীতিবিদদের এই বিপর্যয়ের গভীরতা  সম্পর্কে জানালেন। তিনি বললেন , "অর্থনীতি হলো পরিবেশের একটি অঙ্গ মাত্র, পরিবেশ অর্থনীতির অঙ্গ নয়। এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিতে হবে আমাদের। " তিনি একইসাথে বুঝতে পেরেছিলেন, পরিবেশ রক্ষা কোনো একক রাজনৈতিক দলের কাজ নয়। পৃথিবী বাঁচাতে জনগনকে সচেতন করে তুলতে হবে। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন ,  তৎকালীন তরুণ প্রজন্ম ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে যেভাবে সোচ্চার, ঠিক সেভাবেই যদি তাদের পরিবেশের প্রতি আকৃষ্ট করা যায়, তবেই বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন সম্ভব। সান্টা বারবারার সেই কালচে তেলের আস্তরণ দেখে তিনি অফশোর ড্রিলিং বা সমুদ্রের গভীরে তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা বিধিমালা প্রণয়নের দাবি তুললেন। তিনি চেয়েছিলেন পরিবেশ রক্ষা যেন কোনো দলীয় ইস্যু না হয়ে জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়।
সিনেটর গেলর্ড নেলসন

 রিপাবলিকান সিনেটর পিট ম্যাকক্লস্কিকে সহ-সভাপতি এবং তরুণ কর্মী ডেনিস হেইসকে জাতীয় সমন্বয়কারী হিসেবে নিয়ে একটি গণ আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করলেন তিনি। । হেইস এবং তার তরুণ দলটি সারা দেশে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুলগুলোতে পরিবেশ সচেতনতার প্রচার শুরু করেন। তারা চেয়ে ছিলেন আন্দোলনটি যেন তৃণমূল পর্যায় থেকেই গড়ে ওঠে। ধনী -দরিদ্র, শহরবাসী-গ্রামবাসী, এবং রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট—সবাই সব বিভেদ ভুলে প্রকৃতির সুরক্ষায় সবাইকে সহমতে নিয়ে এলেন তারা। সিয়াটলে এক সম্মেলনে নেলসন আর ম্যাকক্লস্কি প্রথমবারের মতো 'ধরিত্রী দিবস' উদযাপনের প্রস্তাব দিলেন। যদিও,  তখন তারা ধরিত্রী বা 'আর্থ 'শব্দটি ব্যবহার করেননি।
🍂

এই কর্মসূচীর জন্য তারা এমন একটি দিন বেছে নিতে চাইলেন ছিল, যেদিন সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থীদের একসাথে পাওয়া  যাবে। অনেক ভেবে চিন্তে শেষ পর্যন্ত ২২ এপ্রিল তারিখটিকেই বেছে নিলেন তারা । কারণ এটি ছিল মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বসন্তকালীন ছুটি এবং চূড়ান্ত পরীক্ষার মাঝামাঝি সময়। এই দিনে হলে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী এবং তরুণ প্রজন্ম এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে পারবে বলেই সবাই মনে করেছিলেন। হায়েস ৮৫ জনের একটি দল গঠন করে সারা দেশব্যাপী এই কর্মসূচীর ব্যাপারে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে চেষ্টা করলেন।
১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ ঘটল। প্রায় ২ কোটি মানুষ, যা তৎকালীন আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ১০% ছিল, পরিবেশ রক্ষার দাবিতে রাজপথে নেমে এল। দেখা যায় ধরিত্রী বাঁচানোর লক্ষ্যে নিউইয়র্ক শহরেই মেয়র জন লিন্ডসে-র সাথে র‍্যালিতে অংশ নিয়েছেন  ১ লক্ষেরও বেশি মানুষ । শিকাগো ও ফিলাডেলফিয়ার মত বড় বড় শহরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ পার্কে সমবেত হয়েছেন দূষণের বিরুদ্ধে শপথ নিতে। এটি ছিল এমন এক বিরল মুহূর্ত যখন রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট, উভয় দলের সমর্থকরা একমঞ্চে দাঁড়িয়েছিল। ধনী-দরিদ্র, শ্রমিক নেতা থেকে শুরু করে শিল্পপতিরা পর্যন্ত পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সেদিন পথে নেমেছেন। দিনটি ছিল আধুনিক পরিবেশ আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। 

গেলর্ড নেলসন সেই বৃহত্তম আন্দোলনটির নাম দিয়েছিলেন 'ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল টিচ-ইন' (National Environmental Teach-In)।
কিন্তু এই নামটি বেশ বড় ছিল এবং রাজনৈতিকভাবে সাধারণ মানুষের কাছে কিছুটা কঠিনও মনে হয়েছিল।
নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত বিজ্ঞাপন নির্মাতা  জুলিয়ান কোয়েনিগ এই আন্দোলনের সাথে নিজেকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যুক্ত করেছিলেন। তিনি নেলসনকে বেশ কয়েকটি ছোট ও সহজ নাম প্রস্তাব করেন, যেমন—'E-Day', 'Ecology Day', 'Environment Day' এবং 'Earth Day'। ১৯৭০ সালের শুরুর দিকেই নেলসন এবং আন্দোলনের জাতীয় সমন্বয়কারী ডেনিস হেইস Earth Day নামটি গ্রহণ করেন। Earth Day' বা 'ধরিত্রী দিবস' নামটি ছিল সহজ এবং এটি দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে এক করার মত একটি নিরপেক্ষ শব্দ। নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় একটি পূর্ণ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল যার শিরোনাম ছিল—"Earth Day: The Beginning"। এরপর থেকে সংবাদমাধ্যমগুলো ব্যাপকভাবে এই নামটি ব্যবহার করতে শুরু করলে 'আর্থ ডে' বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়। নেলসন তখন বলেছিলেন, "আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এমন একটি পৃথিবী তৈরি করা, যেখানে মানুষ তার পরিবেশের অংশ হিসেবে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, তার শত্রু হিসেবে নয়।" 

এই আন্দোলনের চাপে ওই বছরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরিবেশ রক্ষা সংস্থা (EPA) গঠিত হয় এবং এক দশকের মধ্যেই দশকের মধ্যে 'ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট', 'ক্লিন ওয়াটার অ্যাক্ট' এবং 'বিপন্ন প্রজাতি আইন' পাস হয়। 
১৯৮০-এর দশকে এসে আন্দোলনটির  প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন এই দিবসটিকে কেন্দ্র করে বৃক্ষরোপণ এবং স্থানীয় জলাশয় পরিষ্কারের মতো নিয়মিত কর্মসূচি চালু করে। স্কুল ও কলেজগুলোতে পরিবেশ বিজ্ঞান পাঠ্যবহারের অংশ হিসেবেও গুরুত্ব পায়।

১৯৯০ সালে এসে এই  আন্দোলনের সমন্বয়কারী ডেনিস হেইস আন্দোলনটিকে আন্তর্জাতিক রূপ দিলেন। 'আর্থ ডে নেটওয়ার্ক' নামের একটি অলাভজনক প্লাটফর্মের সাথে যুক্ত হয় এই আন্দোলন। ততদিনে বিশ্বের ১৪১টি দেশের প্রায় ২০ কোটি মানুষ এই আন্দোলনের সাথে নিজেদের জুড়ে নিয়েছেন। সেই বছরে ধরিত্রী দিবসটি বিশ্বের ১৪১টি দেশে পালিত হয় এবং পরিবেশগত সমস্যাগুলো বিশ্ব মঞ্চে উচ্চারিত হল। ২০০০ সালের মধ্যেই এই আন্দোলন বিশ্বব্যাপী একটি শক্তিশালী পরিবেশবাদী আন্দোলনে রূপ নেয়। ২০০৯ সালে জাতিসংঘ ২২ এপ্রিলকে ' আন্তর্জাতিক মাতৃ ধরিত্রী দিবস ' হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে।

সেদিনের সেই ধরিত্রী দিবস বিশ্বের বৃহত্তম অসাম্প্রদায়িক দিবস হিসেবে আজও বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছর এক বিলিয়নেরও বেশি মানুষ মানুষের আচরণ পরিবর্তন করতে এবং বিশ্বব্যাপী, জাতীয় এবং স্থানীয় নীতিগত পরিবর্তন আনার দিন হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতি বছর এপ্রিল মাসের বাইশ তারিখে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস পালন করে চলেছেন। 
বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু সংকট, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ধরিত্রী দিবসকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এর ফলে আমরা মেরু অঞ্চলের বরফ গলা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিক আবহাওয়া , যেমন- অতিবৃষ্টি বা দীর্ঘস্থায়ী খরা প্রত্যক্ষ করছি। ধরিত্রী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য এখনই পদক্ষেপ  নেওয়া জরুরি। অন্যদিকে মানুষের বসতি স্থাপন এবং বনভূমি ধ্বংসের ফলে লাখ লাখ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদও আজ বিলুপ্তির পথে। বাস্তুসংস্থানের (Ecosystem) এই ভারসাম্যহীনতা শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ওপর আঘাত হানছে। স্বাভাবিক কারনেই ধরিত্রী দিবস এখন আর শুধু গাছ লাগানো বা পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। 

২০২৬ সালের ধরিত্রী দিবসের মূল ভাবনা বা থিম হলো— "আমাদের শক্তি, আমাদের পৃথিবী" -Our Power, Our Planet। 
২০৩০ সালের মধ্যে পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎপাদন তিনগুণ করার লক্ষ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতা কমানো এখন সময়ের দাবি। এতে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা করা সহজ হবে।
পরিবেশ ও সমুদ্র রক্ষার জন্য প্লাস্টিক বর্জ্য নির্মূল করাও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। গাছ লাগানো, জল অপচয় রোধ এবং টেকসই জীবনযাপন আজ প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

আমেরিকান সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ও লেখিক র‍্যাচেল কার্সন লিখেছিলেন Those who contemplate the beauty of the earth, find reserves of strength that will endure as long as life lasts. বিশ্ব ধরিত্রী দিবস তো শুধুমাত্র একটি দিন নয়, আগামীর বাসযোগ্য পৃথিবীর অঙ্গীকার করারও দিন। 
এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা প্রকৃতির মালিক নই, বরং তার অংশ। শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানো থেকে শুরু করে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তন—সব মিলিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী। নিজে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু এবং প্রতিবেশীদের পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে জানানো ও সচেতন করার কাজটিও আজকের দিনে অত্যন্ত জরুরী। 'ধরিত্রী দিবস 'এই কথাগুলিই মনে করিয়ে দিয়ে যায়।

Post a Comment

0 Comments