জ্বলদর্চি

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি/ ৪১পর্ব/ চিত্রা ভট্টাচার্য্য


ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি   
৪১পর্ব 

চিত্রা ভট্টাচার্য্য 

(কবি নজরুলের জীবনের শেষ পর্যায় )

চির দুর্দম, আত্মভোলা, পরোপকারী ও স্বাধীনচেতা বিদ্রোহী কবি এক সময় জীবনের কাছে সম্পূর্ণ হেরে গেলেন। ১৯৪২ সালের ১০ জুলাই মস্তিষ্কের দুরারোগ্য কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অসহায় শিশুর মতোই অসুস্থ হয়ে পড়লেন কবি। এদিকে অসুখের জন্য কবির কথা বলার ও লেখার শক্তি ক্রমশঃ হারিয়ে গেল।   বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধূমকেতুর মতো যে কবির আবির্ভাব হয়েছিল ,যে কবি বিদ্রোহী রূপে গর্জে উঠেছিলেন ' ভীম ভাসমান মাইন 'হয়ে  ।  কিন্তু আকস্মিক ভাবে সে ধূমকেতুর ও খুব দ্রুত পতন ঘটলো যা বাঙালীর জাতীয় জীবনে সম্পূর্ণ অভাবনীয় ঘটনা । বাংলা কাব্য সাহিত্য, সংগীত শিল্পের তথা সুরের আকাশের  উজ্জ্বল ধ্রুবতারাটি চিরতরে বিলীন হলো। এ  এক জাতীয় জীবনে  বিপুল বিস্ময় যা কেউ কোনদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। 

কবির শেষ দিনগুলো ছিল বড়ই কষ্টের আর বেদনা দায়ক। শেষ জীবনটা নির্বাক হয়ে প্রায় ৩৪ টা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন সাদা হাস্য মুখর কবি । কথা বলার এক অপ্রতিরোধ্য চেষ্টা অথচ কথা বলতে পারতেন না। শুধু ঠোঁট নাড়তেন। চিকিৎসকরা অনেক কষ্ট করে ডায়াগনোসিস করেছিলেন, 'পিক ডিজিজ'। অথচ চিকিৎসকদের আগে সেই কবেই নিজের নীরব হয়ে যাওয়ার কারণ লিখে রেখেছিলেন দূরদর্শী নজরুল---     
'গানের পাখি গেছে উড়ে শূন্য নীড়
কণ্ঠে আমার নাই সে আগের কথার ভিড়
আলেয়ার এ আলোতে আর আসবে না কেউ কুল ভুলি।।
ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি।' 

  এবার তাঁর গানের অজস্র সুরের প্রস্রবণ , তাল লয় ছন্দ শব্দের ঝঙ্কার  চিরতরে স্তব্ধ হলো। নজরুল প্রতিভার আলোচনার শুরু থেকে কর্ম জীবনের শেষ পর্বে চলে এসে ও মনেহয় কিছুই যেন বলা হলো না। কবি  জীবনীর আলোচনায় বারেবারে সে কথাই অনুরণিত হয়ে বিষাদের সুর বাজে । চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে কবি -এই বঙ্গভূমির অন্যতম তোমার আমার গানের পাখি। প্রিয় কবি নজরুল। 
🍂

কবির শেষ ভাষণের কথায় তাই বুঝি বলেছিলেন-- ''আমার কাব্য, আমার গান আমার জীবনের সেই অভিজ্ঞতার মধ্য হতে জন্ম নিয়েছে। যদি কোনদিন আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকিত্বের পরম শূণ্য থাকে অসময়ে নামতে হয়, তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না, আমি সেই নজরুল। সেই নজরুল অনেক দিন আগে মৃত্যুর খিড়কী দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে। মনে করবেন পুর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে একটি অশান্ত তরুণ এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল। যদি আর বাঁশী না বাজে, আমি কবি বলে বলছি নে, আমি আপনাদের ভালবাসা পেয়েছিলাম, সেই অধিকারে বলছি, আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন। ''  

তিনি  বলেছিলেন ---''যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়ত বা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামে। দেশপ্রেমী,ত্যাগী,বীর,বিদ্রোহী- বিশেষনের পর বিশেষন। টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পর মেরে। বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রার্থ্য দিনে বন্ধু তুমি যেন যেও না। যদি পার চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ কোর। তোমার ঘরের আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বলো বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি।''

' জীবনের শেষ তিন  দশকেরও বেশি সময় নজরুল কাটিয়েছেন একেবারে জীবন্মৃত অবস্থায়। তাঁর সৃজনপ্রতিভা তো বটেই, বাকশক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিও একেবারে লোপ পেয়েছিল। সেই ১৯৫৩ সালেই ডাক্তাররা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন “বর্তমান অবস্থায় কোনো প্রকার সার্জারি করলে রোগীর জন্য তা হিতে বিপরীত হতে পারে। রোগী একরকম চিন্তাহীন, শান্ত, শিশুর মতন (childlike) অবস্থায় আছেন, তাকে সেভাবেই থাকতে দেয়া উচিত, কেন না এর চেয়ে ভালো কোনো অবস্থায় তাঁকে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।” 

১৯৪০ সালে কবিপত্নী প্রমীলা দেবী পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁকে সুস্থ করে তোলার জন্য কবি অজস্র অর্থ ব্যয় করেছিলেন। একে একে স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ,কিস্তিতে কেনা শখের মোটরগাড়ি, বালিগঞ্জের ভক্তের দান করা জমি, তাঁর আজন্মের সৃষ্টি গ্রন্থাবলির কপিরাইট, রেকর্ড করা গানের রয়্যালটির টাকা সবই  চিকিৎসায় খরচ করলেও সব চেষ্টাই বিফলে গেল। সব চেষ্টার অবসান ঘটিয়ে  ১৯৬২ সালের ৩০ শে জুন দীর্ঘ ২২ বছর পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে শয্যাশায়ী থাকার পর প্রমীলা দেবী মারা গেলেন।এই মৃত্যু যে শুধু কবিই সহজভাবে নিতে পারেননি তা নয় , এর সাথে কবির  দুই পুত্র সানি ,নিনির মানসিক ভারসাম্যকে গভীর ভাবে নাড়া দিয়ে  চরম  আঘাত করেছিল। 

১৯৪২ সালের ১৭ আগস্ট কবি তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু ও অনুজপ্রতিম সুফি জুলফিকার হায়দারকে যে পত্র লিখেছিলেন, তাতে তাঁর মানসিক অবস্থার স্পষ্ট চিত্র একটি পাওয়া যায়। পত্রটির কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা গেল  
— “প্রিয় হায়দার, ...Blood pressure-এ শয্যাগত। অতি কষ্টে চিঠি লিখছি। আমার বাড়িতে অসুখ, ঋণ, পাওনাদারের তাগাদা প্রভৃতি worries, সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত খাটুনি। তারপর নবযুগের worries ৩/৪ মাস পর্যন্ত। এই সব কারণে আমার nerves shattered হয়ে গেছে। ৬ মাস ধরে হক সাহেবের কাছে গিয়ে ভিখারির মতো ৫/৬ ঘণ্টা বসে থেকে ফিরে এসেছি।...আমি ভালো চিকিৎসা করাতে পারছি না। ...আমার হয়তো এই শেষ পত্র তোমাকে। ...কথা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অতি কষ্টে দু’একটা কথা বলতে পারি, বললে যন্ত্রণা সর্বশরীরে। হয়তো কবি ফেরদৌসীর মতো ওই টাকা আমার জানাজার নামাজের দিন পাব। কিন্তু ওই টাকা নিতে নিষেধ করেছি আমার আত্মীয়স্বজনকে। চিকিৎসার ব্যাপারে অবশ্য প্রথম দিকে বেশ কিছু ত্রুটি হয়েছে এবং বলা ঠিক হবে অবহেলাই করা হয়েছিল। নতুবা কে জানে হয়তো-বা আজকের দিনের মতো এমনি এক ‘অসুখ সারাবার নয়’ বলবার মতো দিন না-ও আসতে পারত।”

'' কবির বিভিন্ন জীবনীকারদের দেওয়া নানা তথ্য থেকে জানা যায় ,যখন কবির ভয়ানক অর্থসংকট, কবি পত্নী প্রমীলা প্যারালাইসিস রোগে  আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ,তাঁর দুই নাবালক পুত্র সানি ও নিনি। এই অবস্থায় ও কবির সরলতার সুযোগ নিয়ে কিছু মানুষ তাঁকে ঠকিয়েছে।  চরম অর্থকষ্টের সুযোগে কবির বইয়ের কপিরাইট কিনে নিয়ে তাঁকে যেমন অবিশ্বাস্যভাবে বঞ্চিত করেছে প্রকাশকরা (কলকাতার বিখ্যাত পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা ডি. এম লাইব্রেরীর নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য), তেমনি খবরের কাগজ ও মাসিক পত্রিকার মালিকগণ দিন শেষে মাত্র ৫/৬ টাকা দিয়ে কবিকে বিদায় করতেও কার্পণ্য করেননি।  

নজরুল গবেষকদের মতে কবির ঠিক কী রোগ হয়েছিল সে নিয়ে কিছু ধোঁয়াশা প্রচলিত আছে । ১৯৫৩ তেই Dr. Hans Hoff-এর রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “রোগটি সম্ভবত GPI (General Paralysis of Insane) নয়, বেশ সম্ভব এটি এক ধরনের Pseudo- Paralytic Condition caused by Meningo- Vascular Syphilis। রোগ বর্তমানে এতদূর অগ্রসর হয়েছে যে সার্জারিতে কোনো প্রকার সুফল পাবার সম্ভাবনা নেই।” এই অবস্থায় নজরুল বেঁচে ছিলেন আরও তেইশ বছর। ১৯৭২ সালের ২৪ মে নজরুলের তিয়াত্তরতম জন্মদিনের ঠিক আগের দিন ভারত সরকারের বিশেষ অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বিপুল সমারোহে কবিকে ঢাকায় নিয়ে যান। ততদিনে কবি সম্পূর্ণ বোধরহিত, কার্যত নিশ্চেতন। বিমানবন্দরে কয়েক লক্ষ অনুরাগীর প্রবল উচ্ছ্বাস, রাজকীয় সংবর্ধনা, বিলাসবহুল বাসভবন, স্বাচ্ছন্দ্যের সতর্ক আয়োজন -এসব কিছুই তিনি টের পাবার অবস্থায় ছিলেন না। ডঃ নুরুল ইসলাম, ডঃ ইউসুফ আলির মতো সে সময়ের ঢাকার শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকদের নিয়ে গড়া চার সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড নজরুলের স্বাস্থ্য বিষয়ে সদাসতর্ক ছিল। পরের বছর তাঁকে কলকাতায় ফিরিয়ে দেবার কথা ছিল। কিন্তু কোনও কারণে বাংলাদেশ সরকার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার কথা ভাবেননি। ভারত সরকারও, বাংলাদেশে কবিকে নিয়ে এই অভূতপূর্ব উন্মাদনা ও সম্মান দেখেই বোধহয়, এ বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করেননি। কবির পরিবারের পক্ষ থেকেও এমন কোনও দাবি আসেনি। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।  ''

 কবি বন্ধু সুফি জুলফিকার হায়দারের  মতে ,' প্রথম অবস্থায় কবির সুচিকিৎসা হলে হয়তো আমরা কবিকে জীবন্মৃত অবস্থায় না পেয়ে সুস্থ অবস্থায় পেতাম। যে জাতিকে কবি অকাতরে অনেক কিছুই বিলিয়ে দিয়েছেন, তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখার সময় এমন-কি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কয়েক বছর সরকার বা আমাদের হয়ে ওঠেনি। প্রথম অবস্থায় কবি পরিচিত কাউকে দেখলেই মুখে অদ্ভুত শব্দ করে কী যেন বলতে চাইতেন। হয়তো-অনেক অনুযোগ অনেক অব্যক্ত বেদনায় মনেমনে গুমরে মরতেন কবি  হয়তো ভাবতেন —যে দেশ এবং যে জাতির জন্য আমি জীবন উৎসর্গ করলাম, ওরা কেন আজ আমার খোঁজ নেয় না ? আমার আজ এই দুর্দশা কেন? '' 

এই প্রসঙ্গে ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে শ্রদ্ধেয় মুজফ্ফর আহমেদ লিখেছেন—‘১৯৪২ সালের জুলাই মাসে তাঁর রোগ যখন সকলের চোখে প্রকাশ পেল তখন চিকিৎসা হয়েছিল বটে, কিন্তু প্রাথমিক চিকিৎসা অত্যন্ত অপরিমিত ও অসম্পূর্ণ হয়েছে। তখন অবশ্য কোনো কোনো ডাক্তার বলেছিলেন যে, বড় দেরি হয়ে গেছে। তখন যদি কবিকে ইউরোপে পাঠানো যেত তাহলে তাঁর মস্তিষ্কে অপারেশন অন্তত হতে পারত...কিন্তু নজরুল নিরাময় সমিতি গঠিত হয়েছিল বড় দেরিতে—১৯৫২ সালের জুন মাসে।’ এর সম্পাদক ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ এবং প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তিনি কবিকে দেখে ব্যথিত হলেন এবং হাতে ৫০০ টাকা দিয়ে নানা রকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন। কবি ও তাঁর পত্নীকে পাঠানো হলো লন্ডনে। তারিখটি ছিল ১৯৫৩ সালের ১০ মে। ডা. উইলিয়ম স্যারগ্যান্ট, ই এ বেটন, রাসেল ব্রেন নজরুলকে পরীক্ষা করেন। কিন্তু চিকিৎসার ব্যাপারে তাঁরা একমত হতে না পারায় কবি ও তাঁর স্ত্রীকে পাঠানো হয় ভিয়েনায়। ৯ ডিসেম্বর নজরুলের ওপর সেরিব্র্যাল অ্যানজিওগ্রাফি পরীক্ষা করানো হয়। ফলস্বরূপ প্রখ্যাত স্নায়ু বিশেষজ্ঞ ডা. হ্যান্স হক বলেন, নজরুল ‘পিকসডিজিজ’ নামক এক প্রকার মস্তিষ্কের রোগে ভুগছেন যা নিরাময়ের বাইরে। এই রোগে রোগী শিশুর মতো ব্যবহার করেন এবং মস্তিষ্কের সামনের ও পাশের অংশগুলো সংকুচিত হয়ে যায়। ১৯৬২ সালের আগস্ট মাসে প্রমীলা দেবীর এবং   ১৯৭৫ সালে  কবির কনিষ্ঠ পুত্র ‘নিনি’ অর্থাৎ কাজী অনিরুদ্ধ ইসলাম চলে গেলেন । স্তব্ধবাক জড়বৎ কবি কিছুই বুঝলেন না, কিছুই জানলেন না।''  

''কবি নজরুলের শেষ জীবনের পরিণতি ও ,দুর্দশার সাথে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় এই বঙ্গভূমিরই সুপ্রসিদ্ধ, স্বনাম ধন্য কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের শেষ জীবনের করুণ পরিণতির । মাইকেলের অন্তরঙ্গ বন্ধু গৌরদাস বসাক তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, পাশাপাশি দুটি বিছানায় দুটি রোগগ্রস্ত জীবন, সাধনা শেষে সিদ্ধির সাথে এগিয়ে চলেছেন, মাইকেল আর হেনরিয়েটা, স্বামী আর স্ত্রী।' 
'তেমনি বাংলা দেশের বিস্মৃতপ্রায় আর এক কবি আর তাঁর নর্ম সহচরী. ..জনমানবের অবহেলার বস্তুর মতো পড়েছিলেন।  এক দুর্গন্ধযুক্ত গন্ধ, মোষের খাটালের ওপর তলায় মশার ঝাঁক আর নোংরা জঞ্জাল স্তূপের দুর্গন্ধের অবাঞ্ছিত আবহাওয়ার মাঝে। ’ মাইকেলের শেষ জীবনের সঙ্গে নজরুলের শেষ জীবনের -এ যেন এক অদ্ভুত মিল। সাহিত্যিক নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের লেখায়  তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়—‘ বাড়ির নিচ থেকে ভেসে আসে গোবর পচা ভ্যাপসা দুর্গন্ধ। মোষের খাটালের একঝাঁক মশা এসে ঘরের অন্ধকার কোণে কবিকে করে অভিনন্দন। মশারা অন্তত সে সম্বন্ধে উদাসীন নয়। অদূরে অনড় অবস্থায় প্রমীলা স্তব্ধ হয়ে শুয়ে আছেন।’

তবে যত দিন কবিপত্নী প্রমীলা জীবিত ছিলেন কবির প্রতি যত্নআত্তি ভক্তি ভালোবাসার কোনো ত্রুটিরাখেন নি । পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় শুয়ে শুয়ে সংসার চালানো ছাড়াও কবির সেবা শুশ্রূষা করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।' অসাড় নিম্নাঙ্গ তবুও তিনি  আধ শোয়া অবস্থায় কুটনো কাটা রান্না করা কবিকে খাওয়ানো সব কাজ গুলো স্বহস্তে করতেন। কবির প্রতি যত্ন ও পরিচর্যার র ব্যাপারে প্রমীলা সম্পর্কে কবির পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী বলেছেন—     '‘যত দিন বেঁচে ছিলেন, প্রমীলা বেশির ভাগ দিন-ই নিজের হাতে বাবাকে খাইয়ে দিতেন। খাওয়া শেষ হলে তাঁর হাত-মুখ ধুইয়ে সযত্নে তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিতেন। তিনি খাবার পরিবেশন না করলে, বা তাঁর সামনে বসে না খেলে আমাদের তৃপ্তি হতো না। বাবার সম্বন্ধে তাঁর দায়িত্বজ্ঞান ও কর্তব্যবোধ ছিল অসাধারণ, গভীর রাত্রে সবাই যখন সুপ্তির কোলে নিমগ্ন তখন তিনি একা খেলে চলেছেন হয় লুডো, নয় তাস, নয়তো বা চায়নিজ চেকার। উদ্দেশ্য, বাবাকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো পাহারা দেওয়া। কারণ, বাবা ঠিক এক নাগাড়ে ঘুমোতেন না। তাই মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে মাঝে মাঝে শুনতে পেতাম, ঠক্ ঠক্ করে গুটির আওয়াজ হচ্ছে আর থেকে থেকে একটি কণ্ঠস্বর বলে উঠছে—এসো, বাইরে যেয়ো না। শোনো, শুয়ে পড়ো।’ 

'' নজরুল ইসলামের স্ত্রী প্রমীলা দেবী এবং তাঁর শাশুড়ি  মা গিরিবালা দেবী 'হিন্দু ছিলেন তাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি । নজরুলের জীবন নিয়ে লিখতে বসে আজ শেষের পর্যায়ে পৌঁছে নানা জনের  নানা মত পড়ার সুযোগ হওয়ায় এই দুই দেবী তুল্য নারী  কে নিয়ে যে সাম্প্রদায়িক কু-প্রচারণা  আবহমান কাল ধরে কম বেশি সমাজে প্রচলিত রয়েছে।  আজ সুযোগ পেয়েছি  সেই প্রসঙ্গে কবি জসিম উদ্দীনের লেখা ‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’ থেকে কিছু প্রতক্ষ্য অভিজ্ঞতা তুলে ধরার ।'তিনি লিখেছেন ,  “একদিন বেলা একটার সময় কবিগৃহে গমন করিয়া দেখি খালা আম্মা (গিরিবালা দেবী) বিষন্ন  বদনে বসিয়া আছেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার মুখ আজ বেজার কেন? খালা আম্মা বলিলেন, জসিম, সব লোকে আমার নিন্দা করে বেড়াচ্ছে। নুরুর (নজরুল ইসলামকে গিরিবালা এই নামে ডাকতেন) নামে যেখান থেকে যত টাকা পয়সা আসে, আমি নাকি বাক্সে বন্ধ করে রাখি। নুরুকে ভালো মত খাওয়াই না, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করি না। তুমি জানো আমার ছেলে নেই, নুরুকেই আমি ছেলে করে নিয়েছি। আর আমিই বা কে! নুরুর দুটি ছেলে আছে- তারা বড় হয়ে উঠেছে। আমি যদি নুরুর টাকা লুকিয়ে রাখি, তারা তা সহ্য করবে কেন? তাদের বাপ খেতে পেলো কিনা, তারা কি চোখে দেখে না? নিজের ছেলের চাইতে কি কবির প্রতি অপরের দরদ বেশী? আমি তোকে বলে দিলাম জসিম, এই সংসার থেকে একদিন আমি কোথাও চলে যাবো। এই নিন্দা আমি সহ্য করতে পারিনে...। এই বলিয়া খালা আম্মা কাঁদিতে লাগিলেন। আমি বলিলাম, খালা আম্মা, কাঁদিবেন না একদিন সত্য উদ্ঘাটিত হবেই। খালা আম্মা আমার হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া গেলেন, যে ঘরে নজরুল থাকিতেন সেই ঘরে। দেখিলাম, পায়খানা করিয়া কাপড়-জামা সমস্ত অপরিস্কার করিয়া কবি বসিয়া আছেন। খালা আম্মা বলিলেন, এই সব পরিস্কার করে স্নান করে আমি হিন্দু বিধবা তবে রান্না করতে বসব। খেতে খেতে বেলা পাঁচটা বাজবে। রোজ এইভাবে তিন-চার বার পরিস্কার করতে হয়। যারা নিন্দা করে তাদের বলো, তারা এসে যেন এই কাজের ভার নেয়। তখন যেখানে চক্ষু যায় আমি চলে যাবো। (ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়, জসিম উদ্দীন, পৃষ্ঠা ১৭১-১৭২)। 

সত্যি একদিন প্রবল অভিমানে গিরিবালা দেবী তাঁর মেয়ের সংসার ছেড়ে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। কোথায় গেলেন তার আর কোন খবর কোনদিন পাওয়া যায়নি। শুধু একবার একটা চিঠি প্রমীলা দেবীকে লিখেছিলেন, সে যেন তার জন্য কোন চিন্তা না করে...। এই শেষ, গিরিবালা দেবীর আর কোন খবর কোনদিন পাওয়া যায়নি।
(পরবর্তী অংশ আগামী পর্বে )

গ্রন্থ ঋণ : ১) অরুণকুমার বসু/ নজরুল জীবনী/ আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা। 
২) ডঃ গৌতম দত্ত/ নজরুলের চিকিৎসা/ নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। 
৩)নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
৪)নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য
 ৫) নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি।
৬) নজরুল / রফিকুল ইসলাম।

Post a Comment

0 Comments