সুমন জানা
আমার কিশোরী মা
আমি আমার যৌবনের মাতামহকে দেখিনি,
দেখিনি কিশোরী বেলার মাকেও।
আমার অশীতিপর মা সারাদিন বিছানায় বসে
বই পড়ে আর মাঝে মাঝে মুখ তুলে
আমার মেয়েকে তার কিশোরী বেলার গল্প শোনাতে গিয়ে
ঘটনার পারম্পর্য সব ভুলে যায়।
যে গাছটি এখন আর নেই, মাতামহের নিজের হাতে লাগানো
উঠোনের সেই কাঞ্চন গাছের নীচে আমি দাঁড়াই।
ফাল্গুনের বিকেল, কাঞ্চন ফুলের গোলাপি পাপড়িতে
লেগে থাকে অপত্য স্নেহের মতো রোদ।
আমার কিশোরী মা আর আমার মেয়ে হাত ধরাধরি করে
ঝরে পড়া কাঞ্চন ফুল কুড়োতে কুড়োতে
টপকে চলে পুরানো সময়...
বেলগাছ
আবার ঘরে ফিরে এসেছি আমরা।
ছেঁড়া মাদুরের টানে ফিরে এসেছি –
বাটিভরা মুড়ি নিয়ে উঠোন ঘিরে বসেছি
বুড়ি বাশুলি মেলা থেকে পিসিমার কিনে আনা সবং-এর মাদুরে।
পিসিমার দাঁত নেই, হামান দিস্তায় মুড়ি গুঁড়ো করে দিতে হত।
হামান দিস্তাটা কোথাও হারিয়ে গিয়েছে,
প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় খোঁজার কথাও আর মনে হয়নি কারও।
উঠোনের বেলগাছে এ বছরও বেল ধরেনি।
বাবার হাতে লাগানো বেলগাছ,
নতুন বাড়ি তৈরির সময় শিকড় কেটে যাওয়ায়
এখন আর বেল হয় না।
তবু বেলগাছ আছে,
মাথার উপরে তার ভুলে যাওয়া ডালপালা নিয়ে।
বাবার ভাগের এক জামবাটি মুড়ি,
যদি খায়, ভেবে, বেলগাছটির নীচে রেখে আসি...
দুধরাজ পাখি
বাঁশগাছে বসেছিল দুধরাজ পাখি,
কোন এক ছেলেবেলা, বাবা-মা দাঁড়িয়েছিল পাশে।
আরও কতদিন পরে একতলা বাড়ি হল
পুরোনো মাটির বাড়ি ভেঙে।
বাবার মৃত্যুর পরে সেই বাড়ি ফাঁকা
আমাদের দুভাইয়ের ফ্ল্যাট
নক্ষত্রের থেকে দূরে দুটি পৃথক শহরে
দেশের বাড়িটি আজ বিক্রি হয়ে যাবে। কাল থেকে
বাঁশগাছে চিরকাল বসে থাকবে দুধরাজ পাখি
দাক্ষিণ্য
পুকুরের উত্তর পাড়ে আমাদের বাড়ি,
দক্ষিণে শুয়ে আছে বাবা।
যেখানে সাজানো হয়েছিল তার চিতা
এখন সেখানে শুধু মাটি।
কামিনী ফুল তার প্রিয় ছিল বলে
একটা কামিনী গাছ তার মাথায় সারাদিন
একটু একটু করে পাপড়ি ঝরায়।
গরমে ঘুম আসে না,
দক্ষিণের জানালা খুলে বসে থাকে মা।
যে নক্ষত্র নেই, তার আলো আজও আসে
পুকুরের জলে ছায়া ফেলে যায়।
বাবার ছায়া কোথাও নেই।
আগাছায় ভরে থাকে তার প্রিয় ফুলের বাগান।
কেবল অনেক রাতে বাঁশবনে একটা হাওয়া ওঠে,
দক্ষিণের হাওয়ায় ভেসে আসে কামিনী ফুলের গন্ধ।
সারারাত গরমের শেষে সেই হাওয়াটার জন্য
দক্ষিণের জানালায় জেগে বসে থাকে মা।
যোগসূত্র
ছোটবেলায় আমরা দুভাই
বাবার দুহাত ধরে চলতাম।
কেউ হাত ছাড়িয়ে দৌড়োতে চাইলে,
পাছে হোঁচট খেয়ে পড়ি,
বাবা টেনে ধরত তার হাত।
বৃদ্ধ বয়সে আমাদের দুভাইয়ের
হাত ধরে চলত বাবা।
পাল্লা দিয়ে হাঁটতে না পারলে
আমরা টেনে ধরতাম বাবার হাত।
বাবাকে মাঝখানে রেখে
এতদিন দুভাই পাশাপাশি হেঁটেছি।
আজ বাবা নেই, ইচ্ছে করলেই
যে যার নিজের মতো দূরে যেতেই পারি,
তবুও দুভাই পাশাপাশি হাঁটি
0 Comments