জ্বলদর্চি

দর্শনের আলোকে/চতুর্দশ পর্ব/ স্বাতী ভৌমিক

দর্শনের আলোকে
চতুর্দশ পর্ব 

স্বাতী ভৌমিক 

                
( দর্শনের আলোকে আত্মহত্যা ও কৃপাহত্যা )

 দর্শন শুধুমাত্র তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদান করে না। ব্যবহারিক জীবনের সমস্যাগুলোর মূল উদ্ঘাটনের ও সমাধানের দিশাও প্রদর্শন করায়।জাগতিক বিষয়ের দুটো দিক রয়েছে- ভাব ও অভাব।ভাব হোলো সদর্থক দিক আর অভাব হোলো নঞর্থক দিক। আত্মহত্যা ও কৃপাহত্যা দুটোই এই অভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।আত্মহত্যার কারণ হোলো মানসিক ভারসাম্যহীনতা এবং কৃপাহত্যার কারণ হলো শারীরিক ভারসাম্যহীনতা। 

 জীবন সকলের কাছেই প্রিয়।এই জীবন যখন জীবনের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে ফেলে,জীবন যখন বোঝা স্বরূপ বলে মনে হয়,তখন ব্যক্তি ওই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি লাভের অন্য কোন উপায় না পেয়ে বিদেহ মুক্তির পথ বেছে নেয়।

 আত্মহত্যার অর্থ হোলো, স্বেচ্ছায় স্বীয় হত্যাকর্ম সম্পন্ন করা।আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজেই মুখ্য ভূমিকায় থাকে। কামনা বাসনার বশবর্তী হয়ে ব্যক্তি হিতাহিত জ্ঞান তথা বিবেক জ্ঞান অনেক সময় হারিয়ে ফেলে।
    
   জীবন পথের পথিক যখন,
    হারিয়ে ফেলে পথের খোঁজ-
   নিঃস্ব ভেবে হয় সে আকুল,
    পায়না আর নিজের খোঁজ।।🍂
                 
 -আর তখনই ব্যক্তি দিশেহারা হয়ে পড়ে।বেছে নেয় দুঃখমুক্তির উপায় স্বরূপ মৃত্যু তথা আত্মহননের পথ।

 এখন প্রশ্ন হোলো,এটা কি মুক্তির সঠিক পথ?এভাবে কি প্রকৃতই মুক্তি পাওয়া যায়? উত্তরে বলা যায়,না- এইভাবে মুক্তির পথ সঠিক না আর এভাবে প্রকৃত মুক্তি লাভ সম্ভবও না। এটা এক প্রকারের পালিয়ে বাঁচা।জীবনের নিজস্ব একটা মূল্য আছে।জীবন একটা journey,জীবন স্বতঃমূল্যবান্। জীবন কোন কিছু লাভের উপায় মাত্র নয় যে,সুখের বদলে দুঃখ এলো বলে জীবনটা গুরুত্বহীন হয়ে যাবে।শুধুমাত্র আত্মহত্যা নয়, দুঃখ বিলাসিতার কারণও কিন্তু ব্যক্তির হতাশামূলক নঞর্থক ধরনের চিন্তাধারা-ই। দুঃখের তাপে তপ্ত হতে হতে একটা সময় ধৈর্য হারিয়ে ব্যক্তি হয় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় বা দুঃখসাগরে নিজেকে হারিয়ে জীবন্মৃত অবস্থায় জীবন কাটায়।

 স্বীয়কর্ম অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বাধীন হলেও, কর্মফল সবসময় ব্যক্তির ইচ্ছাধীন হবে-তার কোন মানে নেই।সৎকর্ম করার ফলে ব্যক্তির মনের মধ্যে এক প্রশান্তি ভাব আসে,আত্মবিশ্বাস আসে। কিন্তু এর সাথে আশা যুক্ত হলেই কিন্তু দুঃখের পটভূমি অনেকাংশে রচিত হয়। তাই বলা যায় -

      কর্ম হোক উচ্চমানের 
      শান্তি থাক্ মনে। 
      কর্মফলের আশা রেখে
       কি লাভ বৃথা শুধু,
      বেদনার বীজ বুনে!  

 এই মহাবিশ্বের কতটুকুই বা ব্যক্তি জানতে পারে!নিজের সম্বন্ধে কতটুকুই বা স্পষ্ট ধারণা থাকে ব্যক্তির!যদি প্রকৃত স্পষ্ট ধারণা থাকতো তাহলে ব্যক্তি কখনোই হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত হোতো না বা আত্মহত্যার পথও বেছে নিতো না।

 পৃথিবীতে আসা বা পৃথিবী থেকে যাওয়া- দু'টোর সময়-ই ব্যক্তির অজানা।তাই শুধু শুধু মৃত্যুর মানসিকতা না এনে,মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচার মতো  বাঁচার চেষ্টা করাটাই মনে হয় উচিত কর্ম।এবং এটাই হয়তো জীবনের প্রতি প্রকৃত সম্মান জ্ঞাপন।

 প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য,আত্মহত্যা ও আত্মবিসর্জন কিন্তু এক ব্যাপার নয়। বৃহত্তর স্বার্থে বা পরার্থে  যখন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে,তখন তাকে বলে আত্মবিসর্জন।সেক্ষেত্রে ক্ষুদ্র স্বার্থ বা ব্যক্তিস্বার্থ উপেক্ষিত হয়।বৃহত্তর লক্ষ্যে কর্ম করতে করতে  বা নিজ কর্তব্যের পথে অগ্রসর হতে হতে,সর্বাধিক মঙ্গলের জন্য যখন ব্যক্তি মৃত্যুর দ্বারস্থ হয়,তখন তা আত্মবিসর্জন পদবাচ্য হয়।

 শুধু দেহের মৃত্যুই কিন্তু মৃত্যু না, মনের মৃত্যুও কিন্তু মৃত্যু বটে। চাওয়া-পাওয়ার মাঝের ফারাকটুকুর সঠিক ব্যাখ্যা থাকা খুব জরুরী।এই ফারাকের মাঝেই অনেক সময় ব্যক্তি নিজেকে হারিয়ে ফেলে।এহেন পরিস্থিতিতে ভারসাম্য রক্ষার জন্য ব্যক্তির আত্মপরিচিতির জ্ঞান থাকা খুব প্রয়োজন।স্বীয় আশা -আকাঙ্খার সাথে সাথে স্বীয় সীমাবদ্ধতার জ্ঞানটুকুও থাকা কাম্য।

 এবার আসা যাক্,কৃপাহত্যার আলোচনায়।জন্ম- মৃত্যু- জরা -ব্যাধি- জীর্ণ এই জীবনে ব্যক্তি কখনোই ইচ্ছেমতো চির সুখী হতে পারে না।জরা ব্যাধি জীর্ণ শরীর যখন ব্যক্তির কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন ব্যক্তির অনুমতিক্রমে বা অনুমতি প্রদানে অক্ষমতার ক্ষেত্রে ব্যক্তির আত্মীয় পরিজনের অনুমতিক্রমে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয়ভাবে ব্যক্তির জীবন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে অপর ব্যক্তির সহায়তায় যখন প্রাণ বিচ্ছেদ ঘটানো হয়, তখন তাকে বলা হয় কৃপাহত্যা।এক্ষেত্রে উচিত বা অনুচিত-এর প্রশ্নের থেকেও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়,ব্যক্তির যন্ত্রণা বা জীবন অসহায়ত্বের পরিমাণকে।এক্ষেত্রে জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা ব্যাপারটি অনেকাংশেই রক্ষিত হয়।।

 ক্রমশঃ..

Post a Comment

0 Comments