পর্ব ২
কমলিকা ভট্টাচার্য
অদৃশ্য নজর
আদরের রেজাল্ট বেরোনোর পর যেন বাড়িটার ভেতরের বাতাস বদলে গেছে।
বাইরে সব আগের মতোই স্বাভাবিক—রাস্তায় বিকেলের ভ্যানওয়ালার হাঁক শোনা যায়, সকালে পাখির ডাক আসে, বারান্দার টবে নতুন ফুল ফুটেছে—অথচ ভিতরে সবাই একটু বেশি সতর্ক হয়ে গেছে।
সকালের চায়ের টেবিলে এখনও হাসি আছে, কথাবার্তা আছে, কিন্তু কোথাও একটা চাপা চিন্তা সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াচ্ছে।
যেন কেউ অদৃশ্য হয়ে ঘরের এক কোণে বসে সব শুনছে।
আদর অবশ্য কিছুই বুঝতে পারছে না।
সে এখনও আগের মতোই।
রেজাল্ট বেরোনোর দুদিন পরও তাকে দেখা যায় বারান্দায় বসে স্কেচ করতে, কখনও ভায়োলিন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে।
কখনও আবার দুপুরের রোদ মাথায় নিয়েই বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে বেরিয়ে যাচ্ছে।
যেন স্কুলে ফার্স্ট হওয়ার ঘটনাটা তার নিজের কাছেই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়।
কিন্তু ঋদ্ধিমান জানে—সমস্যা এখানেই।
অস্বাভাবিক প্রতিভা যখন নিজেকে স্বাভাবিক ভেবে বাঁচতে চায়, তখনই সে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।
সেই রাতে অনির্বাণ ল্যাবে ঢুকতেই দেখে ঋদ্ধিমান একা বসে পুরোনো server log খুলে দেখছে।
ঘর অন্ধকার।
🍂
শুধু monitor-এর নীল আলো তার মুখে পড়ছে।
চারদিকে পুরোনো যন্ত্রের গন্ধ, ঠান্ডা ধাতব নীরবতা, আর দূরে কোথাও চলতে থাকা cooling fan-এর ক্ষীণ শব্দ।
অনির্বাণ ধীরে বলে,
“তুমি এখনও চিন্তা করছ?”
ঋদ্ধিমান স্ক্রিন থেকে চোখ সরায় না।
তার আঙুল খুব দ্রুত keyboard-এর উপর নড়ছে।
“আজ তিনবার আমাদের network-এ ঢোকার চেষ্টা হয়েছে।”
অনির্বাণ থমকে যায়।
“কোথা থেকে?”
“Location hide করা। কিন্তু খুব professional.”
ঘরের বাতাস হঠাৎ আরও ঠান্ডা হয়ে যায়।
অনির্বাণ ধীরে চেয়ারে বসে পড়ে।
তার মুখের উপর স্ক্রিনের আলো কাঁপছে।
“তাহলে খবর ছড়িয়েছে…”
ঋদ্ধিমান এবার তাকায়।
তার চোখ শান্ত, কিন্তু ভিতরে অস্বস্তি স্পষ্ট।
“ওদের ধারণা হয়েছে আদরের ভেতরে কিছু এখনও আছে।”
অনির্বাণ নিচু গলায় বলে,
“আছেও।”
দু’জনেই চুপ করে যায়।
কারণ তারা জানে—আদরের অসাধারণ ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
শুধু সে নিজেকে সাধারণ ভাবে বাঁচতে শিখেছে।
আর সেটাই তাকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
পরদিন দুপুরে আদর নিজের ঘরে বসে ছবি আঁকছিল।
জানলার বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছে।
বৃষ্টির জল কাঁচ বেয়ে নেমে আসছে ধীরে ধীরে।
তার ক্যানভাসে অদ্ভুত একটা দৃশ্য তৈরি হচ্ছিল—
একটা দীর্ঘ রাস্তা, রাস্তার শেষে কুয়াশার ভিতর দাঁড়িয়ে একজন মানুষ।
ছবিটার চারপাশে এত শূন্যতা যে তাকালেই বুকের ভিতর কেমন চাপা ঠান্ডা লাগে।
ইরা ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
তার চোখ ছবিটার উপর স্থির হয়ে যায়।
“এটা কে?”
আদর না তাকিয়েই বলে,
“জানি না। বারবার মাথায় আসছে।”
ইরার বুকের ভেতর হালকা কাঁপন হয়।
কারণ ছবিটার মানুষটার অবয়ব অদ্ভুতভাবে হরগ্রিভের মতো।
বাইরে হঠাৎ মেঘ গর্জে ওঠে।
ঘরের আলো এক মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাসে লাগে।
আদর হঠাৎ বলে,
“যশোদা মা… আমি কি সত্যিই খুব সাধারণ?”
প্রশ্নটা শুনে ইরা থেমে যায়।
এই প্রশ্নটা সে বহু বছর ধরে ভয় পেয়েছে।
“এমন প্রশ্ন কেন?”
আদর একটু হেসে বলে,
“কারণ সবাই ছোটবেলা থেকে খুব সাবধানে ছিল আমাকে নিয়ে। যেন আমি কাঁচের কিছু।”
ইরা এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রাখে।
চুলে আঙুল বুলিয়ে দেয় ধীরে।
“সব মা-ই এমন হয়।”
আদর কিছু বলে না।
কিন্তু তার চোখে স্পষ্ট—সে পুরো উত্তরটা বিশ্বাস করেনি।
সন্ধ্যায় বাড়িতে ছোটখাটো celebration হয়।
পাড়ার কয়েকজন আসে। আদরের বন্ধুরা আসে।
ড্রয়িংরুম আলোয় ভরে ওঠে।
হাসির শব্দ, কেক কাটার মুহূর্ত, মোবাইল ক্যামেরার flash—সব মিলিয়ে বাড়িটা অনেকদিন পর সত্যিকারের আনন্দে ভরে ওঠে।
কেউ বলে,
“আদর IIT crack করবে।”
কেউ বলে,
“ওকে বিদেশে পড়তে পাঠান।”
আদর হাসে, কিন্তু কথাগুলো শুনে অদ্ভুত বিরক্ত লাগে তার।
কারণ সে সত্যিই কখনও নিজেকে ওই ধরনের ছাত্র ভাবেনি।
তার কাছে জীবন মানে এখনও—একটা sketchbook, একটা violin, আর খোলা আকাশের নিচে হেঁটে যাওয়া।
রাত বাড়তে থাকলে ভায়োলিন বের করে সে।
ঘর ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে যায়।
বাইরের বৃষ্টি থেমে গেছে। জানলার কাঁচে জমে থাকা জল আলো প্রতিফলিত করছে।
সুর ভেসে ওঠে ধীরে ধীরে।
প্রথমে শান্ত।
তারপর গভীর।
তারপর অদ্ভুত বিষণ্ণ।
মনে হয় যেন বহু দূরের কেউ হারিয়ে যাওয়া ভাষায় কথা বলছে।
নাতাশা চুপচাপ শুনছিল।
হঠাৎ তার চোখ বদলে যায়।
সে খুব আস্তে বলে,
“এই melody…”
ঋদ্ধিমান তাকায়।
নাতাশা ফিসফিস করে,
“এটা সেই neural frequency pattern-এর মতো শোনাচ্ছে…”
অনির্বাণ থেমে যায়।
ঘরের ভিতর হঠাৎ চাপা আতঙ্ক জমে ওঠে।
ঋদ্ধিমান ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
আদর কিছু না জেনেই বাজিয়ে যাচ্ছে।
তার চোখ আধবোজা। যেন সুরটা সে শুনছে না—অনুভব করছে।
কিন্তু সুরের ওঠানামা অদ্ভুতভাবে মিলছে পুরোনো neural waveform-এর সঙ্গে।
একটা ঠান্ডা শিরশিরানি নেমে যায় সবার ভিতরে।
ঋদ্ধিমান খুব আস্তে বলে,
“ও এখনও subconsciously pattern ধরতে পারে…”
ইরা ধীরে বলে,
“আদর, এই সুরটা তুমি কোথা থেকে শিখলে?”
আদর বাজানো থামায় না।
খুব স্বাভাবিক গলায় বলে—
“নিজে থেকেই আসে… মনে হয় কেউ আমায় ডাকছে অনেক দূর থেকে।”
কথাটা শেষ হতেই লাইট দু’বার ঝিলমিল করে ওঠে।
তারপর পুরো বাড়ি অন্ধকার।
সবাই চমকে যায়।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য শুধু বাইরে বাতাসের শব্দ শোনা যায়।
তারপর backup power জ্বলে ওঠে।
ঘরের আলো এবার আগের চেয়ে আরও ফ্যাকাসে লাগে।
অনির্বাণ দ্রুত laptop খুলে।
তার মুখের রং বদলে যায়।
“Someone is inside the system.”
ঋদ্ধিমান মুহূর্তে console-এ বসে পড়ে।
স্ক্রিনে একের পর এক code ছুটছে।
Firewall alert, encrypted access trail, hidden port request—সব একসঙ্গে জ্বলতে থাকে।
অজানা কেউ তাদের server-এ ঢুকে শুধু একটা জিনিস খুঁজছে—
আদরকে।
ইরার বুক ঠান্ডা হয়ে যায়।
আদর এবার প্রথমবার একটু ভয় পায়।
“কি হয়েছে?”
কেউ উত্তর দেয় না।
মনিটরে হঠাৎ এক লাইন জ্বলে ওঠে—
“We never stopped looking.”
নাতাশার হাত থেকে কফির কাপ পড়ে যায়।
গরম কফি মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু কেউ সেদিকে তাকায় না।
ঋদ্ধিমান সঙ্গে সঙ্গে পুরো system offline করে দেয়।
ঘর নিস্তব্ধ।
শুধু আদরের ভায়োলিনের একটা অসমাপ্ত সুর এখনও বাতাসে ভেসে আছে।
যেন অন্ধকারেও কেউ সেটাকে শুনে যাচ্ছে।
সেই রাতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আর দেরি করা যাবে না।
আদরকে বিদেশে পাঠাতেই হবে।
শুধু পড়াশোনার জন্য নয়।
ওকে বাঁচানোর জন্য।
কিন্তু রাত তখনও শেষ হয়নি।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর ল্যাবের আলো আবার জ্বলে ওঠে।
অনির্বাণ console-এর সামনে দাঁড়িয়ে।
তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
অনেক বছর পর আবার সেই পুরোনো অনুভূতিটা ফিরে এসেছে—অদৃশ্য যুদ্ধের অনুভূতি।
একসময় এই ল্যাব ঘুমাত না।
নতুন নতুন humanoid prototype, neural adaptation, synthetic cognition—কত পরীক্ষা চলত এখানে।
রাতের পর রাত monitor জ্বলত।
মানুষ আর যন্ত্রের সীমারেখা নিয়ে চলত নিরন্তর গবেষণা।
তারপর একদিন সব থেমে যায়।
আদরকে বাঁচানোর জন্য।
একটা স্বাভাবিক জীবন দেওয়ার জন্য।
অনির্বাণ নিজেই সব project বন্ধ করে দিয়েছিল।
Humanoid research archive lock করে রাখা হয়েছিল।
যেন অতীতকে ইচ্ছে করে মাটির নিচে চাপা দেওয়া হয়েছিল।
ঋদ্ধিমান চুপচাপ দাঁড়িয়ে পুরোনো robotic chamber-এর দিকে তাকিয়ে ছিল।
কাঁচের ভিতরে ধুলো জমেছে।
নিষ্ক্রিয় server-গুলো মৃত যন্ত্রের মতো নিঃশব্দ।
অনির্বাণ ধীরে বলে,
“আমাদের আবার শুরু করতে হবে।”
ঋদ্ধিমান তাকায়।
অনির্বাণ এবার আরও নিচু গলায় বলে,
“ওদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য।”
সে পুরোনো holographic screen অন করে।
ধীরে ধীরে একটা পরিচিত architecture ফুটে ওঠে।
মানুষের মুখ।
আদরের মুখ।
ঋদ্ধিমানের চোখ হঠাৎ জ্বলে ওঠে।
“তুমি কি ভাবছ…?”
অনির্বাণ মাথা নাড়ে।
“আমরা আরেকটা আদর বানাব।”
ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তে ভারী হয়ে ওঠে।
“একটা synthetic neural twin,” অনির্বাণ বলতে থাকে।
“ওরা যদি আবার আদরকে track করে, তাহলে তারা confuse হবে। আসল আর নকল আলাদা করতে পারবে না।”
ঋদ্ধিমান চুপচাপ শোনে।
অনির্বাণ এবার console-এ পুরোনো file খুলে দেখায়—
Project A-Shadow.
স্ক্রিনে পুরোনো blueprint জ্বলে ওঠে।
মানুষের neural mapping, adaptive response matrix, emotional mimic layer—সব আবার জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকে।
“আদর বিদেশে থাকবে। আর এখানে থাকবে তার আরেকটা presence। যদি ওর কোনো বিপদ হয়, যদি কেউ ওকে track করার চেষ্টা করে—আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারব।”
ঋদ্ধিমান ধীরে বলে,
“তুমি জানো এটা কত dangerous?”
“জানি।”
“একটা humanoid যত perfect হবে, তত unpredictable হবে।”
অনির্বাণ মৃদু হেসে বলে,
“আমরা তো ঋদ্ধিমানকেও একদিন impossible ভেবেছিলাম।”
কথাটা শুনে ঋদ্ধিমান চুপ করে যায়।
কিছুক্ষণ পরে সে ধীরে robotic chamber-এর কাছে এগিয়ে যায়।
কাঁচের উপর হাত রাখে।
দশ বছর আগে এখানেই সব শেষ হয়েছিল।
হয়তো আবার এখান থেকেই সব শুরু হবে।
ঠিক তখনই পিছন থেকে খুব আস্তে একটা শব্দ আসে—
“তোমরা আবার কিছু লুকাচ্ছো?”
দু’জনেই ঘুরে তাকায়।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আদর।
ঘুম জড়ানো চোখ। হাতে জলের গ্লাস।
কিন্তু তার চোখে সেই পুরোনো তীক্ষ্ণতা এক মুহূর্তের জন্য ফিরে এসেছে।
যে দৃষ্টি একসময় মানুষের ভিতরটা পড়ে ফেলতে পারত।
অনির্বাণ দ্রুত screen minimize করে।
“না তো। পুরোনো কিছু data দেখছিলাম।”
আদর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
তারপর হেসে বলে,
“তোমরা যখন ‘না’ বলো, তখনই সবচেয়ে বেশি সন্দেহ হয়।”
ঋদ্ধিমান হেসে ওঠে।
আদর এগিয়ে এসে পুরোনো chamber-এর দিকে তাকায়।
আঙুল দিয়ে ধুলো মুছে ফেলে।
“এটা এখনও রেখে দিয়েছ?”
অনির্বাণ বলে,
“সব জিনিস ফেলে দেওয়া যায় না।”
আদর ধীরে কাঁচে হাত ছোঁয়ায়।
এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে অদ্ভুত একটা অনুভূতি আসে—
যেন সে কিছু মনে করার চেষ্টা করছে।
যেন এই ঘরের সঙ্গে তার কোনো গভীর, বিস্মৃত সম্পর্ক আছে।
তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
“আমি কিন্তু বিদেশে গেলে তোমরা emotional হয়ে যেও না,” বলে সে হেসে বেরিয়ে যায়।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর আবার নীরবতা নামে।
অনির্বাণ ধীরে বলে,
“দেখলে? ও এখনও sense করতে পারে।”
ঋদ্ধিমান খুব আস্তে মাথা নাড়ে।
তারপর console-এর দিকে তাকিয়ে বলে—
0 Comments