জ্বলদর্চি

আলোচনা : চূর্ণীকে লেখা চিঠি/বাসুদেব গুপ্ত

আলোচনা : চূর্ণীকে লেখা চিঠি
বাসুদেব গুপ্ত

“হেমন্তের প্রভাতশিশিরে ছলছল করে গ্রাম চূর্ণীনদীতীরে” চূর্ণী কি এক নদী? না কি বাংলার অভিমানী গাঁয়ের আড়ালে বয়ে চলা এক অশ্রুবারিধারা? বাংলার অজস্র ধানক্ষেতের রহস্য আবাসে লুকিয়ে থাকা এক মেয়ে? যে খেলে চলে সন্ধ্যের আধো অন্ধকারে তার পুঁতির মালা গলায় সাজিয়ে?
নাকি চূর্ণী কোন মানবী নয়, অর্ধেক মানবী সে যে  আধেক কল্পনা?
কবি অরুণের চূর্ণীকে লেখা চিঠিতে তার উত্তর নেই। শুধু আছে হৃদয়ের রঙএর বাটি উলটে দিয়ে আঁকা শত শত শব্দের বিহ্বল আল্পনা। বই শুধু বই নয়, বই হয়ে উঠেছে এক গৃহ, যার শৈল্পিক অলঙ্করণ ফুটে উঠেছে গৃহের দেয়ালে দেয়ালে, কখনো ঝাপসা, কখনো উল্লম্ব প্রার্থনা স্তম্ভের মত দাঁড়িয়ে উঠেছে আকাশ ছুঁতে চেয়ে।

বইটি একটি মোহসুন্দর সৃষ্টি। সর্বাঙ্গ সুন্দরী। চোখ ভরে যায়, পড়তে ইচ্ছে করে, হাতে রাখতে ইচ্ছে করে, কাউকে দিতে ইচ্ছে করে। সম্পাদনার পিছনে এক শিল্পী মন কাজ করেছে দেখাই যায়, খুবই অল্প কিছু বানান ভুল চোখে পড়ে ( বর্ণই ব্রক্ষ্ম, স্বযত্নেই ??, ঝরনা  ??, শূণ্য, মোন দুপুর) ।
🍂
কবি অরুণের লেখার সঙ্গে আগে পরিচিত হবার সৌভাগ্য হয় নি।  লেখক পরিচিতি পড়ে কৌতূহলী হলাম। “তাঁর চেতনার পরমস্তরের অনুভবই যেন Z-প্রজন্মের কবিতা যুগের সূচক, নিয়তি ও পরিণাম।“ Z-প্রজন্মের কথা আজকাল সংবাদপত্রে, মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়। নেটু জ্যাঠা বললেন “Z-প্রজন্মেরা হল মিলেনিয়ালদের অনুসরণকারী এবং জেনারেশন আলফার পূর্ববর্তী সাধারণত ১৯৯৭ থেকে ২০১০ এর দশকের গোড়ার দিকে জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। মানে যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৮। প্রথম নোকিয়া ফোনের আবির্ভাব ১৯৯২।  World Wide Web বা বিশ্ব জোড়া জালের আগমন ১৯৯৩। আর কল্কি অবতারের মত প্রবল তরবারি ঘুরিয়ে মর্তে  আইফোনের আগমন ২০০২।
মানে Z-প্রজন্মের জন্ম এক পালটে যাওয়া বাতাবরণে, যেখানে চিঠি লেখা এক অজানা স্মৃতি, যখন এক মুহূর্তেই পৌঁছে যাওয়া যায় বেতারবাহিত হয়ে প্রিয়সমাবেশে। যেখানে বছরভর বসে থাকতে হয় না একটি চুম্বনের আকাশ্চুম্বী প্রত্যাশায়, কোন এক ঝড় উঠে আসা বিকেলে, বাসন্তী শাড়ীর আঁচল থেকে ছিটকে আসা এক ঝলক বিদ্যুল্লতার সর্বনেশে আক্রমণে জান লপেট দেওয়ার আকুল আগ্রহে। এসব হত জেন এক্সদের সময়ে।  যাদের বিস্মৃত জেনারেশান, আমার মত পাঠক যারা ধীরে ধীরে এরিনার পিছনের আলো আঁধারিতে মিশে যাচ্ছে ধীরে ধীরে সঙ্গে নিয়ে পিট্টু ব্যাগে কত বসন্তের কত দীর্ঘশ্বাস।

এত গৌরচন্দ্রিকার পিছনে আছে কিছু গূঢ় প্রশ্ন। Z-প্রজন্মের মানুষ মানুষীরা কি প্রেমে পড়ে? সেই সব বোকা বোকা প্রেম, সে সব উদাসী হাওয়ায় ওড়ানো প্রেমপত্র, প্রতীক্ষা, আর নদীতীরে ফেলে আসা সেইসব হতাশ দীর্ঘশ্বাস কি এখনো ঘটে? এই ফটাফটএর যুগে? যখন মনের কথা জানাতে লাগে এক সেকেন্ড, যখন প্রতি রাতের ভিডিও কল হয়ে অনায়াসে হয়ে ওঠে রতিসুখসারে, তখন কবিতাই বা কি, প্রেমই বা কার? একসঙ্গে হোয়াতে তিন প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে ফস্টিনস্টি করতে আর ক্যাসানোভা হতে হয় না। শুভদীপ অনিকেতরা দিব্যি রায়া সায়নীদের সঙ্গে গ্রুপ প্রেম চালিয়ে যেতে পারা এবং যায়।
সেখানে কবিতার কি প্রয়োজন, যদি ভিডিও তোলা যায় মুঠোফোনেই, সেখানে বতিচেল্লি বা মানের প্রয়োজন কি যদি ন্যানো ব্যানানাকে বললেই সবথেকে এরোটিক, সর্বনেশে সুন্দর শরীর সে এঁকে দেবে এক মুহূর্তেই? Z-প্রজন্মের কবিতার দরকারি নেই। কবিতা লেখার জন্য ফোনে বসে আছে তিন এ আড় কবি?
কবিরা তবে কি লেখে? কার জন্য লেখে? শুনে অবাক হলাম কবি অরুণ Z-প্রজন্মের জন্য লেখেন। কিই বা লেখার আছে? যদি হৃদয়ে ফোটে না আর প্রেম, দুচোখে ফোটে না আর বিস্ময়, আর বাহুতে না থাকে এক চির অপূর্ণ আশ্লেষ? 
কবি অরুণ হাতধরে নিয়ে যান সেই ব্লু লেগুনে, সেই কৈশোরের আধো আঁধারিতে ধানের শীষের মত বেড়ে ওঠা প্রেমানুভূতি, সেই চিরন্তন জেনেটিক অনিবার্যতার অসম্ভাবনার বয়সে। এই বইএর সব কটি কবিতাই প্রেমের, আকুল প্রেমনিবেদনের, অজানা বিরহের মালা পরে আকুল অংগবিহীন আলিংগনের।
 একদিন শূন্য হবো জেনেও 
শূন্যতা নিয়ে বসে থাকি   রোজ 
পাহাড় জঙ্গল পাথর হয়ে ওঠা দুটি মানুষের হলুদ নিঃশ্বাস? সে সব একাত্ম
মৃত্যুলিপি?
আমাদের নগ্ন নির্জন শরীরে জড়িয়ে অগুনতি চাঁদের চাদর।
 তোর লাল মাটির শরীর ছুঁয়ে বাৱে পড়ে সূর্য।
প্রেম জানে শূন্যতাই ভবিতব্য, নিয়তি। তবু, পাথরে কেন ফুল এঁকে যায় প্রেম?
মায়াময় বর্ষা রাতে...
মনের গভীরে আঁকি মেঘ।
পাখির চোখে পাহাড়ী ঘুম
অন্ধরাত ছুঁয়ে মিলিয়ে যায়
মন খারাপ।

কবিতায় প্রেমিকার দেখা কক্ষনই আসে না, সে কথা বলে না, সে প্রকৃতির মত, শুধু চেয়ে থাকে তার নিস্তব্ধতা নিয়ে,

তোর চোখ ধাঁধানো বুকের ভূগোল। স্তনের টুকরোগুলো দিয়ে
সাজানো ককেবাকার একগুচ্ছ ছবি। উপচে পড়া দুপুর।
উলোমোলো সবুজ জলে, তোর ফেলে আসা পায়ের ছাপ...
কবি শুধু দেখে আর ভাবে, আর ছবি রচনা করে পঙক্তিতে পক্তিতে।
তোমাকে দেখি দূর মুগ্ধতায়।
দেখি, তোমার ডানায় বসে থাকা সোনারঙ পাখিদের।
গাছ তার নির্জন ছায়ায় মেখে নিচ্ছে তোমাকে। মুগ্ধ বাতাস উড়িয়ে দিচ্ছে
তোমার চুল।
আর ভুল স্বপ্নের অহংকারে লেখা সে সব মৌন দুপুর
 
অবৈধ কথাটি বারবার এসে পড়ে শ্রী অরুণের লেখায়। 
মায়ার আঁচল ভেঙ্গে, অবৈধ সূর্য নামে,
সে সময় অবৈধ রাতের কথা বলি
ছুঁয়ে ফেলে অবৈধ আঁচল
অবৈধ ছায়ালাপ
প্রেম কবে বৈধতা নিয়ে চিন্তিত? এখানেই উঠে আসে Z-প্রজন্মের মনের স্ন্যাপশট। সে এখন সবে কিশোর। হঠাত এক রমণী তার রহস্য নিয়ে ঢুকে পড়েছে তার স্বপ্নে, নিদ্রায়, জাগরণে, ছেয়ে ফেলেছে ঘিরে ফেলেছে তার আঁচল দিয়ে, আর নিয়তির মত নেমে এসেছে তার জ্যোৎস্নাকুসুম ঠোঁট কিশোরের অনভিজ্ঞ অধরে, তার আর মুক্তি নেই। কিন্তু এ কি বৈধ? সেই ভাবনা থেকে যায়। 

বইটি এই প্রেমের উন্মেষের উৎসবের উদযাপন। শরীরের পূজা এক দেহতপস্বীর। একলা ঘরে চূর্ণীকে  লেখা চিঠি। জেন এক্স হয়ত ভাববে “তোমার মন নাই?” কিন্তু তা হবে অপ্রাসঙ্গিক। এখানে আছে অবগাহন, অনুধাবন নয়।
Z-প্রজন্ম বুঝবে এই বইএর ভাষাঃ-
‘এক চুমুতেই শিখে ফেলি সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয়’

Post a Comment

1 Comments