জ্বলদর্চি

মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন ডে/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে


মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন ডে

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 


আজ ২৮শে মে মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন দিবস, মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন কি, এটির মেয়েদের জীবনে কি গুরুত্ব আছে, আসুন সব কিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

মাসিককালীন স্বাস্থ্যবিধি (Menstrual Hygiene) হলো, ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে সুস্থ, পরিষ্কার ও সুরক্ষিত থাকার উপায়। এটি প্রজনন স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে এবং মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) ও যৌনাঙ্গের ইনফেকশন (RTI) প্রতিরোধে অত্যন্ত জরুরি। সঠিক নিয়ম মেনে চললে এসময়ের শারীরিক অস্বস্তি ও মানসিক চাপ অনেক কমে যায়। নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক ও জৈবিক প্রক্রিয়া হলো, মাসিক বা ঋতুস্রাব। কৈশোরে প্রবেশের পর নির্দিষ্ট সময় অন্তর নারীদের শরীরে এই প্রক্রিয়া ঘটে,কিন্তু আজও সমাজের অনেক অংশে মাসিক নিয়ে লজ্জা, কুসংস্কার ও নীরবতা বিরাজমান। এই পরিস্থিতি বদলাতে এবং মাসিক স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ২৮শে মে “মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন ডে” পালন করা হয়।
মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন ডে বা মাসিক স্বাস্থ্যবিধি দিবস হলো, এমন একটি আন্তর্জাতিক সচেতনতা দিবস, যার উদ্দেশ্য মাসিক সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা এবং মাসিককালীন পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা। ২০১৪ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে।
🍂
২৮শে মে তারিখটি বেছে নেওয়ার একটি বিশেষ কারণ আছে। সাধারণত মাসিক চক্র প্রায় ২১ থেকে২৮ দিন অন্তর ঘটে এবং গড়ে ৪ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তাই প্রতীকীভাবে ৫ নম্বর মাসের ২৮ তারিখ নির্বাচন করা হয়েছে।
মাসিকের সময় শরীরের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক স্বাস্থ্যবিধি না মানলে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন,সংক্রমণ, চুলকানি, ত্বকের সমস্যা বা প্রজনন স্বাস্থ্যজনিত জটিলতা।
সঠিক মেনস্ট্রুয়াল হাইজিনের মধ্যে রয়েছে,পরিষ্কার ও নিরাপদ স্যানিটারি প্যাড, ট্যাম্পন বা মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করা।নির্দিষ্ট সময় অন্তর ব্যবহৃত সামগ্রী পরিবর্তন করা। শরীর ও গোপন অঙ্গ পরিষ্কার রাখা,ব্যবহৃত সামগ্রী নিরাপদভাবে ফেলে দেওয়া।পরিষ্কার জল ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবহার,এই অভ্যাসগুলো নারীদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে সাহায্য করে।

অনেক সমাজে মাসিককে এখনও “অশুচি” বা “লজ্জার বিষয়” হিসেবে দেখে,এর ফলে অনেক মেয়ে ও নারী নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হন। কোথাও তাদের রান্নাঘরে যেতে দেওয়া হয় না, ধর্মীয় স্থানে প্রবেশে বাঁধা দেওয়া হয় বা সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা হয়।
গ্রামীণ ও দরিদ্র অঞ্চলে আরও বড় সমস্যা হলো, স্যানিটারি সামগ্রীর অভাব। অনেক মেয়ে বাধ্য হয়ে অপরিষ্কার কাপড় বা অস্বাস্থ্যকর জিনিস ব্যবহার করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত টয়লেট, পানি বা স্যানিটারি ব্যবস্থার অভাব থাকায় মাসিকের সময় ছাত্রীদের স্কুলে যেতে অসুবিধা হয়, ফলে তাদের পড়াশোনায় ফব্যাঘাত ঘটে। মাসিক সম্পর্কে সচেতনতা শুধু মেয়েদের জন্য নয়, ছেলে, পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের সকল মানুষের জন্য প্রয়োজন,কারণ এটি কোনো রোগ নয়, বরং শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
কৈশোরে পৌঁছানোর আগে মেয়েদের মাসিক সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানানো দরকার, যাতে তারা ভয় বা বিভ্রান্তিতে না ভোগে। একই সঙ্গে ছেলেদেরও এই বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া উচিত, যাতে তারা সম্মানজনক ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতে শেখে।
স্কুল, পরিবার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে কুসংস্কার কমবে এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে উঠবে।
এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো,মাসিক সম্পর্কে সামাজিক নীরবতা ও লজ্জা দূর করা।
মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া।
সকল নারী ও কিশোরীর জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসামগ্রী নিশ্চিত করা।
স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও জনস্থানে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও জল সরবরাহের গুরুত্ব তুলে ধরা। নারীস্বাস্থ্য ও অধিকার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা।
আমাদের করণীয়
মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন নিশ্চিত করতে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও সরকারের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্কুলে মাসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা,সাশ্রয়ী মূল্যে স্যানিটারি প্যাড সহজলভ্য করা,পরিষ্কার টয়লেট ও জলের ব্যবস্থা করা।
মাসিক নিয়ে খোলামেলা ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা বাড়ানো, কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা, প্রত্যেক পরিবারকে বুঝতে হবে যে, মাসিক কোনো লজ্জার বিষয় নয়,বরং এটি নারীর সুস্থ প্রজনন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন ডে শুধুমাত্র একটি দিবস নয়, এটি নারীস্বাস্থ্য, মর্যাদা ও সমঅধিকারের বার্তা বহন করে। মাসিক সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, কুসংস্কার দূরীকরণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা একটি সহানুভূতিশীল ও স্বাস্থ্যবান সমাজ গড়ে তুলতে পারি। তাই মাসিক নিয়ে নীরবতা নয়, প্রয়োজন খোলামেলা আলোচনা, সম্মান ও সঠিক জ্ঞান। মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন ডে আমাদের সেই বার্তাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

Post a Comment

0 Comments