জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড স্মরণ দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ১৩ই এপ্রিল, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড স্মরণ দিবস। এই দিবসটি কেন পালন করা হয় এবং এই দিনটিতে কি হয়েছিল, আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে এর গুরুত্ব কতটা,আসুন সবকিছুই আমরা বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। প্রতি বছর ১৩ই এপ্রিল এই দিনটি স্মরণ দিবস হিসেবে পালন করা হয়, যাতে সেই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞে শহীদ হওয়া নিরীহ মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো যায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করা যায়।
১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল, পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। দিনটি ছিল বৈশাখী উৎসবের দিন, তাই অনেকেই আনন্দ উদযাপন করতে সেখানে এসেছিলেন। পাশাপাশি, ব্রিটিশ সরকারের পাশ করা রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদও চলছিল। এই আইন অনুযায়ী, ব্রিটিশ সরকার কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে গ্রেফতার ও আটক করতে পারত, যা ভারতীয়দের মৌলিক অধিকারকে লঙ্ঘন করেছিল।
🍂
এই সময়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জেনারেল ডায়ার (Reginald Dyer) তার সৈন্যদের নিয়ে জালিয়ানওয়ালাবাগে প্রবেশ করেন। কোনো ধরনের সতর্কতা ছাড়াই তিনি নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। সংকীর্ণ প্রস্থানপথ থাকায় মানুষ পালানোর সুযোগও পায়নি। প্রায় ১০ মিনিট ধরে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়, এবং শত শত মানুষ নিহত ও হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হন। অনেকেই বাঁচার আশায় বাগানের কূপে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, যা ঘটনাটির নির্মমতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি সহিংস ঘটনা ছিল না, এটি ছিল মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ। ব্রিটিশ সরকারের এই নিষ্ঠুরতা সমগ্র ভারতবাসীকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার হয়। বহু মানুষ, যারা আগে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি আন্দোলনে যুক্ত হননি, তারাও এই ঘটনার পর স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে নামেন।
এই ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। মহান কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন, যা ছিল এক সাহসী প্রতিবাদ। গান্ধীজি এই ঘটনার পর অসহযোগ আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, যা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা কতটা মূল্যবান এবং এর জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। এই স্মরণ দিবস আমাদেরকে শুধু অতীতের সেই দুঃখজনক ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয় না, বরং আমাদেরকে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতার গুরুত্ব সম্পর্কেও সচেতন করে।
বর্তমানে জালিয়ানওয়ালাবাগ একটি স্মৃতিসৌধ হিসেবে সংরক্ষিত আছে, যেখানে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যান। সেখানে শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, প্রার্থনা এবং নীরবতা পালন করা হয়। এই স্থানটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, এটি ভারতের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের এক জীবন্ত প্রতীক।
1 Comments
সত্যি এক হৃদয় বিদারক ঘটনা ছিল নির্বিচারে নিরিহ ভারতবাসীর উপর গুলি চালানো। কত আত্ম ত্যাগের পরে আমাদের স্বাধীনতা লাভ তা আমাদের সব সময় মনে রাখা উচিৎ। প্রত্যকের ভারতের ইতিহাস জানা উচিৎ। শ্রদ্ধার সঙ্গে ভারতবর্ষ তথা ভারতের জনগণের দিকে দৃষ্টি রাখা উচিত।
ReplyDelete