জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার/কমলিকা ভট্টাচার্য /চতুর্থ খণ্ড/পর্ব ৮: নতুন জীবনের শুরু

বাঁচার উত্তরাধিকার
কমলিকা ভট্টাচার্য 
চতুর্থ খণ্ড
পর্ব ৮: নতুন জীবনের শুরু

সেই রাতটা যেন অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ ছিল। হাসপাতালের করিডোরে সাদা আলো জ্বলছে। দেয়ালের ঘড়িটা টিক টিক করে সময় গুনছে, কিন্তু সেই শব্দটাও যেন অদ্ভুত ভারী লাগছে। নাতাশার প্রসব বেদনা শুরু হয়েছিল হঠাৎই। ডক্টর সেন খুব দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে বলেছিলেন, “আমাদের এখনই অপারেশন করতে হবে। ঝুঁকি আছে, কিন্তু অপেক্ষা করলে ঝুঁকি আরও বাড়বে।” নাতাশাকে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হল। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে রইল অনির্বাণ, ইরা আর ঋদ্ধিমান।
সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে অনির্বাণের বুকের ভিতর যেন একটা অদৃশ্য চাপ জমে উঠছিল। কতবার সে যুদ্ধের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, কত বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিয়েছে—কিন্তু এই অপেক্ষা যেন সবকিছুর থেকে কঠিন। ইরা ধীরে এসে তার পাশে দাঁড়াল। “তুমি বসো,” সে বলল। অনির্বাণ মাথা নাড়ল। “না… আমি দাঁড়িয়েই থাকব।” ঋদ্ধিমান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধগুলো অনেক সময় নীরব অপেক্ষার ভিতরেই হয়।” অনির্বাণ তাকাল না, কিন্তু তার চোখের কোণে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তার মনে তখন একটাই কথা ঘুরছিল—“আমি কি আবার তাকে হারাতে যাচ্ছি?”🍂
অপারেশন থিয়েটারের ভিতরে সময় যেন অন্য গতিতে চলছিল। ডক্টর সেন আর তার টিম দ্রুত কাজ করছেন। মেশিনের শব্দ, মনিটরের আলো—সব মিলিয়ে একটা টানটান পরিবেশ। নাতাশার শরীর খুব দুর্বল। তবুও সে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করছিল। ডক্টর সেন ধীরে বললেন, “আর একটু… আমরা পারব।”
বাইরে তখন গভীর রাত। হাসপাতালের করিডোর প্রায় ফাঁকা। অনির্বাণ হঠাৎ বলল, “আমি অনেক বড় বড় মেশিন বানিয়েছি, এমন প্রযুক্তি বানিয়েছি যা মানুষ কল্পনাও করেনি। কিন্তু আজ বুঝছি… জীবনের সামনে আমরা কত অসহায়।” ঋদ্ধিমান ধীরে বলল, “জীবনকে পুরো নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। কিন্তু তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করা যায়।” ইরা তখন চুপ করে বসে ছিল। তার চোখ বারবার সেই বন্ধ দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল।
হঠাৎ ভিতর থেকে একটা তীব্র শব্দ ভেসে এল। তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর—একটা ছোট্ট কান্না। একটা নবজাতকের কান্না। সেই শব্দটা যেন পুরো করিডোরে ছড়িয়ে পড়ল। অনির্বাণ স্থির হয়ে গেল। তার চোখে বিস্ময়। ইরা ধীরে বলল, “শুনতে পাচ্ছ?” অনির্বাণ খুব ধীরে মাথা নাড়ল। তার চোখ ভিজে উঠছে।
কিছুক্ষণ পরে অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলল। ডক্টর সেন বেরিয়ে এলেন। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু চোখে একটা শান্তি। তিনি বললেন, “শিশুটি জন্মেছে।” অনির্বাণ যেন হঠাৎ নিঃশ্বাস নিতে পারল। কিন্তু ডক্টর সেন একটু থামলেন। “তবে…” ঘরের বাতাস আবার ভারী হয়ে গেল। “শিশুটির শরীর খুব দুর্বল। স্নায়ুতন্ত্র পুরোপুরি বিকশিত নয়। আমাদের খুব সাবধানে ওকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।”
অনির্বাণ ধীরে জিজ্ঞেস করল, “ও বাঁচবে?”
ডক্টর সেন বললেন, “আমরা আশা ছাড়ছি না।”
কিছুক্ষণ পরে তারা শিশুটিকে দেখতে পেল। একটা ছোট্ট, নরম শরীর। মেশিনের সঙ্গে সংযুক্ত। কিন্তু সে বেঁচে আছে। তার ছোট্ট আঙুলগুলো কাঁপছে। অনির্বাণ ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল। শিশুটির ছোট্ট আঙুল তার আঙুলটা আঁকড়ে ধরল। সেই মুহূর্তে অনির্বাণের চোখ ভিজে উঠল। সে খুব ধীরে বলল, “তুমি এসেছ।”
কিন্তু ঠিক সেই সময়ই আরেকটা খবর এল। ডক্টর সেন দ্রুত এসে বললেন, “নাতাশার অবস্থা খারাপ হচ্ছে।” অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ আর শারীরিক দুর্বলতায় সে আবার কোমায় চলে গেল। সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। ইরা ধীরে বলল, “আবার?” ডক্টর সেন বললেন, “আমরা চেষ্টা করছি। কিন্তু এখন ও গভীর কোমায়।”
রাতটা আবার ভারী হয়ে উঠল। একদিকে নবজাতকের দুর্বল জীবন, অন্যদিকে নাতাশার নিস্তব্ধ দেহ। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে অনির্বাণ। সে অনেকক্ষণ নাতাশার বিছানার পাশে বসে রইল। তার হাতটা আলতো করে ধরে বলল, “তুমি সবসময় লড়াই করেছ। এবারও করো।” কোনো উত্তর এল না। মেশিনের আলো নিঃশব্দে জ্বলছে।
সকালের দিকে অনির্বাণ ধীরে উঠে দাঁড়াল। ইরা তখন শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসে আছে। সে মৃদু হেসে বলল, “ও খুব শান্ত।” ঋদ্ধিমান পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “এই ছোট্ট জীবনটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।” অনির্বাণ ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে আবার সেই পুরোনো দৃঢ়তা ফিরে এসেছে। “এই লড়াই আমরা ছাড়ব না।”
ইরা বলল, “বিজ্ঞান আছে। আমরা চেষ্টা করব।”
ঋদ্ধিমান বলল, “আর ভালোবাসা আছে।”
হাসপাতালের জানালার বাইরে তখন সূর্য উঠছে। আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। একটা নতুন দিন শুরু হচ্ছে। কিন্তু সেই নতুন দিনের সঙ্গে শুরু হচ্ছে আরেকটা কঠিন অধ্যায়—একটা অসুস্থ শিশুকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার লড়াই, আর নাতাশাকে আবার জাগিয়ে তোলার চেষ্টা।
অনির্বাণ, ইরা আর ঋদ্ধিমান জানে—এই পথ সহজ হবে না। তবুও তারা হার মানবে না। কারণ তাদের বিশ্বাস, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রযুক্তি নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি হল ভালোবাসা, আশা আর বাঁচার ইচ্ছা। আর সেই ইচ্ছার নামই—বাঁচার উত্তরাধিকার।

চলবে ...

Post a Comment

4 Comments

  1. Soumen RoyApril 09, 2026

    এই পর্বের লেখাগুলি ধারাবাহিকভাবে পড়লাম।সাবলীল গদ্যে টানটান লেখা।কৌতূহল ধরে রাখে।বিজ্ঞানের সঙ্গে মানবিক সম্পর্কের মেলবন্ধনে যথেষ্ট দক্ষতা আছে।চরিত্রগুলি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।শুধু কিছু কিছু স্থানে একটু ডিটেলিং দরকার। যেমন করিডোরে গুলি চলছে কিন্তু কাউকে লাগছে না, কেন ?

    সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য। দিদিমণির কলম চলতে থাকুক।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাApril 09, 2026

      অনেক ধন্যবাদ স্যার।নেক্সট টাইম আপনার সাজেশনের কথাটা মাথায় রাখবো নিশ্চয়ই।
      আপনার এই দিদিমণি সম্বোধনটি আমার খুব ভালো লাগলো,আমরা স্কুলে টিচার দের দিদিমণি বলতাম,আজকাল কেউ বলে না সবাই ম্যাম কিম্বা আন্টি বলে।🙏

      Delete
  2. লেখার শেষটুকু মন ছুঁয়ে গেল। এই কথাগুলোই তো সারাৎসার। “ মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রযুক্তি নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি হল ভালোবাসা, আশা আর বাঁচার ইচ্ছা। ”। এই সত‍্যে পৌঁছতে গেলে গভীর উপলব্ধি লাগে। লেখক সেখানে পৌঁছতে পেরেছেন। অভিনন্দন। 🙏🙏🙏

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাApril 09, 2026

      কতটা পৌঁছেছি জানিনা,তবে আপনাদের আশীর্বাদ আর উৎসাহ থাকলে একদিন ঠিক পৌঁছে যাব তার কাছে।🙏

      Delete