বুকে ধরে তোমার রুমাল নিয়ে আলোচনা করলেন অনিন্দিতা শাসমল
কবি সুমন রায়ের লেখা "বুকে ধরে তোমার রুমাল" কাব্যগ্রন্থটি হাতে নিয়েই স্নিগ্ধতায় মন ভরে গেল প্রচ্ছদ দেখে। প্রচ্ছদ শিল্পী সৌগত চট্টোপাধ্যায়ের সুনিপুণ হাতের রঙ তুলিতে শৈল্পিক ছোঁয়া দিয়ে আঁকা সুন্দর প্রচ্ছদ।
শ্রীলিপি প্রকাশনার উচ্চমানের পৃষ্ঠা ,মুদ্রণ ও অক্ষর বিন্যাসসহ প্রকাশনা, কাব্যগ্রন্থটির উৎকর্ষ বৃদ্ধি করেছে।
এক ঝলক পাতা উল্টে পুরো বইটি দেখার পর , ক্রমান্বয়ে প্রবেশ করলাম কাব্যগ্রন্থের অন্তরমহলে ।
প্রথমেই উৎসর্গের পাতায় চোখ আটকে গেল--
"বলা না বলা সব কথা আজ
তোমাকে
না বলে
ভাসিয়ে দিলাম
স্রোতে
কুবাই..."
হুবহু তুলে দিলাম উৎসর্গের পৃষ্ঠাটি। আমার মতো কোনো পাঠকেরই বুঝতে নিশ্চয়ই অসুবিধে হবে না, একটি বহমান জীবনের ধারাবাহিকতার মধ্যে অনুচ্চারিত কিছু কথা দিয়ে গাঁথা হয়েছে কবিতাগুলো। উৎসর্গের পাতা অন্তত সেই কথাই বলছে। কুবাই--আমার অতি পরিচিত ও বড় প্রিয় একটি গ্রামীণ নদীর নাম। এই কবিতার বই তাকে উৎসর্গ করা হয়েছে দেখে, স্বভাবতই খুব ভালো লাগলো।
এবার আসি সূচিতে। মোট ৫৬টি কবিতা সম্বলিত ৫৬ পাতার বই এটি। বিভিন্ন ধরণের নামকরণ করা হয়েছে প্রতিটি কবিতার। প্রেম ,বিরহ ,অনুভব , অপেক্ষা,জীবন ,প্রকৃতি ও বৈচিত্র্য ছুঁয়ে যাওয়া সব নাম।
🍂
অতঃপর প্রবেশ করা যাক কবিতার পাতায়। একের পর এক পাতা উল্টে একটানা শেষ করলাম ৫৬টি কবিতা। বেশির ভাগ কবিতাতেই কুবাই নদীর অনুসঙ্গে ,প্রেম ও বিরহের হৃদয়গাথা আঁকা হয়েছে রক্তের অক্ষরে।
প্রথম কবিতা 'ঘূর্ণি'তে কবি লিখছেন--
"রূপাই আর সাজুর মতন বুকের পাঁজরে টোটো করে রুমাল চুরি করা প্রেম।"
পরের কবিতা "সিঞ্চনে সুখ"। কুবাই এর সঙ্গে কথোপকথন--
"-- কুবাই নির্ভার বয়ে চলে
---পাটকাঠি ঘর সব
-- লোপাট ,লোপাট
--এসো তোমার শূন্যতায়
--- স্পষ্ট অন্ধকারে "
"অবগাহন " কবিতাতেও সেই কুবাই এর স্মৃতি রোমন্থন করেছেন কবি --
"কৈশোরের সেই স্নান বন্ধু কুবাই
এখন ফিতের মতো বয়ে যায়
নেপথ্য নায়িকার মতো
আমাকে ফিরিয়ে দেয় না
তার তীব্র দহন।"
প্রকৃতি প্রেমিক কবি তাঁর 'বর্ষা ', 'দীন দিন', 'একটা চড়ুই','আয় বৃষ্টি ', 'বৃষ্টি শেষে', 'মহব্বত ' কবিতাগুলোতে প্রকৃতির অপরূপ রূপ ও সৌন্দর্যের অকৃপণ ছবি এঁকেছেন।
বেশ কিছু কবিতায় কবির অতলস্পর্শী অনুভব মিশে আছে। "জীবন যেমন" কবিতায় তিনি লিখছেন --
"এখন সারাদিন সব সাফ
কেয়া বাৎ
এখনোতো তোমার মেয়ে
সমাজ মাধ্যমের স্নান করে প্রতিদিন
দূর থেকে
দেখে সেতো বাজিমাত "
"সুধাংশুবাবুর গাণিতিক বোধ" বেশ অন্যরকম একটি কবিতা।
সেখানে তিনি লিখছেন--
"আপনার অংকের জটিল তত্ত্ব ছাড়িয়ে কুবাই দুরন্ত গতিতে
মশগুল
যে জীবন অংকে যন্ত্রণার দর্শন বুঝেছে।"
শেষ কবিতা 'জীবনের মানে "।
এই কবিতাটি এইরকম--
"শান্ত নদী একরকম উচ্ছল
শান্ত কুবাই এরকম চঞ্চল
সে নির্নিমেষ চেয়ে আছে
জীবনের হাতেখড়ি দেবে
অশান্ত হয়ে আপাতত
ঘুম আর ঘোরের মতোন
শান্ত বিপ্লব তার মৈথুন।"
এখানে নদীর সঙ্গে এক গভীর বোধের সমন্বয় সাধন করছেন কবি।
কয়েকটি ছন্দের কবিতা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ।
"ধারাপাত" কবিতায় তিনি লিখছেন --
"এক পথে পালক বিছানো
এক পথে বালি
অনর্গল পায়ে পায়ে
কেতকী সুবাস খালি
আসলে পালক নয়
ভোকাট্টা ঘুড়ি
মৃত্যুর বিজনপথে
একা মুখপুড়ি "
কুবাই নদীকে উৎসর্গীকৃত এই কাব্যগ্রন্থে কুবাই-এর স্মৃতি বিজড়িত কবিতাগুলো পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে ,এই নদীর জলস্রোত কবির নস্টালজিয়া ছোঁয়া শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কোথাও। তার থেকে তিনি কখনও মুক্তি চান না । বরং সেই স্মৃতি বুকে নিয়েই চলতে চান জীবনের অনন্ত পথ।
"সে কুবাই সে কুবাই " কবিতায় দেখি তাঁর সেই আবেগঘন অনুভব--
"শব্দহীন জলতরঙ্গ বাঙ্ময় মুখ
আমার শৈশব সুখ
সে কুবাই সে কুবাই
কিশোরকান্তি প্রগলভ নয়
তার চোখে মুখে তপ্ত
বালির সিঁড়ি ভাঙা দাগ
সে কুবাই সে কুবাই।"
একটি গ্রামীণ নদীকে ভালোবেসে ,তার স্মৃতি রোমন্থন করে, কবির শৈশব থেকে শুরু করে কৈশোর,যৌবন, প্রেম ,প্রকৃতি ,বিরহ আর জীবনবোধের গভীর বৃন্ত থেকে উঠে আসা কবিতাগুলো পড়তে পড়তে পাঠক হিসেবে নিজেও এইসব বোধের সঙ্গে কখন একাত্ম হয়ে গেছি ,বুঝতে পারিনি। এই কাব্যগ্রন্থ প্রতিটি কবিতাপ্রেমী পাঠকের কাছে সাদরে গৃহীত হবে বলে আমার স্থির বিশ্বাস। কবি সুমন রায়ের কাব্যজীবনের পথে অন্তহীন শুভকামনা থাকলো ।
0 Comments