চূর্ণীকে চিঠি : সম্বোধনের ভেতর শূন্যতা
অয়ন মুখোপাধ্যায়
অরুণ দাসের চূর্ণিকে লেখা চিঠি পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে, এই বই শুধুমাত্র কবিতার কোনো সংকলন নয়; এটি এক দীর্ঘ অন্তরঙ্গ সম্বোধন, এক ব্যক্তিগত আবহের নির্মাণ, এক স্মৃতিবাহী প্রেম ভাষার পুনরাবৃত্ত অনুশীলন। এখানে “চিঠি” শব্দটি নিছক অলংকার নয়; এটি একটি কাব্যভঙ্গির কেন্দ্র। কবি যেন পাঠককে নয়, এক অনুপস্থিত অথচ অন্তরঙ্গ ভাবে বর্তমান সত্তাকে সম্বোধন করে লিখে চলেছেন। এই নিবিড় সম্বোধনের ভেতরেই বইটির প্রধান আকর্ষণ তৈরি হয়। আবার, এখানেই তার সীমার মধ্যে লুকিয়ে থাকে তার সম্ভাবনাও।
আমার মনে হয়, সত্যিকারের কবিতা পুরোপুরি বোঝার আগেই পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে যায়। অরুণ দাসের কবিতার ক্ষেত্রে এই কথাটি অনেকখানি সত্য। কারণ তাঁর বহু কবিতাই প্রথম পাঠে অর্থের আগে একটি মেজাজ, একটি সুর, একটি আবছা বিষণ্নতা, একটি অন্তর্মুখী দহন নিয়ে আমাদের মনের কোণায় পৌঁছে যায়। পাঠক প্রথমে ব্যাখ্যা করেন না, আগে অনুভব করেন। কিন্তু সেই কথার মধ্যে আর-একটি কঠিন ইঙ্গিতও আছে— কবিতা কেবল প্রথম স্পর্শে নয়, পুনর্পাঠেও টিকে থাকতে হবে। সেই দিক থেকে বলতে হয়, অরুণ দাসের কবিতায় প্রথম সংবেদন বহু জায়গায় কার্যকর হলেও, সব কবিতা পরের স্তরে সমান শক্তিতে স্থায়ী হয় না।
🍂
এই বইয়ের প্রধান শক্তি তার আবহ-নির্মাণে। প্রেম, শরীর, বৃষ্টি, রাত, চাঁদ, ছায়া, অনুপস্থিতি, গোপন স্পর্শ, নিঃসঙ্গতা— এইসব চেনা উপাদানকে অরুণ দাস তাঁর কবিতায় এমনভাবে সাজিয়ে তুলেছেন যে তারা আর নিছক কাব্য-সামগ্রী হয়ে থাকে না; বরং এক ধরনের অন্তর্জলবায়ু তৈরি করে। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি বাইরের দৃশ্য নয়, বরং অনুভূতির সম্প্রসারণ। রাত কেবল সময় নয়, অন্তর্গত অন্ধকার; বৃষ্টি শুধু ঋতু নয়, স্মৃতির পুনরাগমন; শরীর শুধু কামনা নয়, অনুপস্থিতিরও স্পর্শযোগ্য ছায়া। এই কারণেই বইয়ের অনেক কবিতা পড়ে পাঠকের মনে একটি নরম অথচ দীর্ঘস্থায়ী আবেশ থেকে যায়।
বইয়ের একটি কবিতা এই স্বরটিকে আরও স্পষ্ট করে। যেমন,
“তোমাকে নির্মাণ করি / অবসর বর্ণনায়” কবিতায় আমরা পাই—
আনমনা সূর্য সাজাই তোমার ঠোঁটে। শব্দের কালো বরনালা ছুঁতে চায়
সময়ের গাছ।
জলে ওঠে পলক শরীর। নিথর চাঁদের কাছে হেঁটে যাওয়া অন্ধকারে।
শরীর চিনে নেয় প্রতিটি দুর্বল ঢেউ ছায়ার মাঝে অবসর চাঁদ।
লীনা, এই যে চাঁদের ফাঁদ। এই আমি নষ্ট প্রজাপতি, ...আর তুমি, দিশেহারা
পৃথিবীর খেয়ালী জোনাকি।
এই পঙ্ক্তিগুলির মধ্য দিয়ে অরুণ দাসের কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বর ধরা পড়ে। এখানে অনুভূতি সরাসরি ঘোষণা হয়ে ওঠে না; বরং চিত্রকল্প, শরীরী ইঙ্গিত, আলো-অন্ধকারের আবহ এবং এক ধরনের অন্তরঙ্গ সম্বোধনের মধ্যে দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে। তাঁর কবিতার শক্তি ঠিক এইখানেই— তিনি বক্তব্যকে বলেন না, বরং পরিবেশের মধ্যে মিশিয়ে দেন। “আনমনা সূর্য”, “পলক শরীর”, “নিথর চাঁদ”, “নষ্ট প্রজাপতি”, “খেয়ালী জোনাকি”— এইসব চিত্রকল্পে আমরা দেখি, দৃশ্য, শরীর ও স্মৃতি পরস্পরের মধ্যে বিনিমেয় হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, অরুণ দাসের কবিতায় ভাবের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পরিবেশ, স্পর্শ ও অনুরণন। তিনি অনেক সময় বক্তব্যকে উচ্চারণ করেন না; বরং ঘিরে ধরেন। আর সেই ঘিরে ধরার ক্ষমতাই তাঁর কবিত্বের আসল জায়গা।
অনেক সমালোচক মনে করেন, কবিতা কেবল অর্থ বয়ে আনবে না, সে নিজেই এক সত্তা হয়ে উঠবে। অরুণ দাসের কবিতার দিকে তাকালে আমার মনে হয়, তিনিও অর্থের স্বচ্ছতার চেয়ে উপস্থিতির আবহকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কবিতায় ‘কী বলা হল’-এর চেয়ে ‘কীভাবে থেকে গেল’— এই প্রশ্নটিই বেশি জরুরি। কিন্তু এখানেই সমস্যা শুরু হয়। সব কবিতাই সমান ভাবে সেই উপস্থিতি নির্মাণ করতে পারে না। কোথাও তা কবিতা হয়ে ওঠে, কোথাও তা আবেগময় উচ্চারণ হিসেবেই থেকে যায়। অর্থাৎ, বইটির উচ্চাকাঙ্ক্ষা বড়, কিন্তু সব কবিতা সেই উচ্চতায় পৌঁছয় না।
আমার মূল আপত্তি এই যে, অরুণ দাসের কবিতায় আবেশ আছে; কিন্তু বহুক্ষেত্রে দেখেছি সেই আবেশই প্রায় একমাত্র অবলম্বন হয়ে উঠেছে। ফলে বইটি যত এগোয়, ততই চোখে পড়ে— একই ধরনের চিত্রকল্প, একই ধরনের অনুভব, একই ধরনের শব্দপরিসর বারবার ফিরে আসছে। বৃষ্টি, রাত, শরীর, ঠোঁট, চাঁদ, গোপনীয়তা, বিষণ্ন আলো, আবছা স্মৃতি— এইসব উপাদান আলাদা আলাদা কবিতায় নতুন নতুন মাত্রা তৈরি করার বদলে অনেক সময় পুনরুচ্চারণে পরিণত হয়েছে। ফলে সমগ্র বইয়ের একটি একরৈখিক সৌন্দর্য তৈরি হয় বটে, কিন্তু পৃথক কবিতার স্বতন্ত্র মুখ সবসময় আলাদা হয়ে ওঠে না।
অনেক সমালোচক মনে করেন, কবিতার ভাষা মূলত বৈপরীত্যের ভাষা। সেই কথা এখানে বিশেষভাবে আমার মনে হয়েছে। বড় কবিতায় শুধু অনুভূতি থাকে না; থাকে টানা পোড়েন, অন্তর্দ্বন্দ্ব, পরস্পর বিরোধী সুরের সংঘর্ষ। তাই অরুণ দাসের কবিতায় কোমলতা আছে, অবসাদ আছে, শরীরী স্মৃতি আছে; কিন্তু সেই দ্বৈততা, সেই অন্তর্গত সংঘর্ষ, সেই কাব্যিক বিপন্নতা সবসময় যথেষ্ট ঘনীভূত হয়নি। প্রেম আছে, কিন্তু প্রেমের ভেতরের ক্ষয় কোথায়? শরীর আছে, কিন্তু শরীরের সঙ্গে সময়ের সংঘাত কতখানি? স্মৃতি আছে, কিন্তু স্মৃতির বিরুদ্ধে বর্তমানের প্রতিবাদ কোথায়? এই প্রশ্নগুলি আমাদের কাছে থেকে যায়। ফলে কবিতা তার মাধুর্য অর্জন করে, কিন্তু সর্বত্র গভীর সংঘাত অর্জন করে না।
অরুণ দাসের কবিতার আর-একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য তার সংগীতধর্মিতা। তিনি ঝাঁকুনি দিয়ে নয়, ধীরে ধীরে, মৃদু সুরে পাঠককে টেনে নেন তাঁর কাছে। যেমন তাঁর কিছু পঙ্ক্তি অনেক সময় উচ্চারণযোগ্য, স্মরণ যোগ্য এবং আবেগ সঞ্চারী। এই গুণকে খাটো করার উপায় আমাদের নেই। কিন্তু এই সংগীতধর্মিতাই কোথাও কোথাও তাঁর কবিতাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কারণ সুর ভাষাকে মনোরম করতে পারে, কিন্তু সবসময় তাকে শাণিত করে না। আর কবিতার জন্য শুধু সুর থাকলেই হবে না ; দরকার বাক্যের ভেতরের চাপ, কাটা ছেঁড়া, বর্জন, সংযম ও অনিবার্যতা। অরুণ দাস সেই সংযমের জায়গায় আরও কঠোর হতে পারতেন।
কোলরিজের একটি বহুল প্রচলিত উক্তি আছে— কবিতা হল শ্রেষ্ঠ শব্দের শ্রেষ্ঠ বিন্যাস। উক্তিটি নিয়ে পাণ্ডিত্যজগতে আলোচনার জায়গা থাকলেও, কবিতার বিচার-মানদণ্ড হিসেবে এর তাৎপর্য আজও অমলিন। অরুণ দাসের ভাষায় সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সর্বত্র কি সেই কঠোর নির্বাচনের ছাপ আছে? আমার মনে হয়, না। অনেক কবিতা আরও সংক্ষিপ্ত হলে, কিছু বিশেষণ কমলে, কিছু চিত্রকল্প সংযত হলে, বইটি আরও তীক্ষ্ণ ও স্মরণীয় হতে পারত। এখানে অনুভব আন্তরিক, কিন্তু আত্মসম্পাদনা আরও নির্মম হওয়া দরকার ছিল।
তবু এই সমালোচনার মধ্যেও একটি কথা স্পষ্ট করে বলা জরুরি— অরুণ দাস কোনো কৃত্রিম কবি নন বরং অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁর কবিতার ভেতর কোনো দুর্বোধ্যতার ভান নেই, নেই কোনো আধুনিকতার অভিনয়, জবরদস্তি করা বাগাড়ম্বরও নেই। তিনি যে অঞ্চলে লেখেন, তা তাঁর স্বাভাবিক এলাকা— প্রেম, অনুপস্থিতি, দেহস্মৃতি, নরম বিষণ্নতা, অন্তর্জাগতিক নিবেদন। এই সততাই অরুণ দাসের বইটির বড় সম্পদ। এমনও হয়, অসম্পূর্ণ কবিতাও পাঠককে ছুঁয়ে যায়, কারণ তার ভেতরে একটি খাঁটি অনুভব থাকে। অরুণ দাসের কবিতায় সেই খাঁটিত্ব আছে।
আধুনিক বাংলা কবিতায় বনলতা সেন, নীরা— এরকম অনেক নামের সঙ্গেই আমরা পরিচিত। তাই কবিতায় কোনো নারীর নামের ব্যবহার নতুন নয়। কিন্তু এখানে “চূর্ণি” নামটিও কাব্যিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি হয়তো নির্দিষ্ট একজন নারী; কিন্তু বইয়ের ভেতরে তিনি ধীরে ধীরে একটি প্রতীকে রূপ নেন। ফলে চূর্ণি এখানে কখনো প্রেমিকা, কখনো স্মৃতি, কখনো অনুপস্থিতি, শূন্যতা অথবা হারানো সময়; এমনকি কবির নিজস্ব অন্তর্জগতেরও অন্য নাম হয়ে বারবার ফিরে আসে। এই রূপান্তর চূর্ণিকে লেখা চিঠিকে কখনোই নিছক প্রেমের দিনলিপি হয়ে উঠতে দেয় না; বরং এক মানসিক ভুবনের মানচিত্রে পরিণত করে। কিন্তু এখানেও সম্ভাবনা যতখানি, সার্থক বাস্তবায়ন ততখানি নয়। কারণ প্রতীককে বহুমাত্রিক করতে হলে ভাষায় আরও ভাঙন, আরও বিস্ময়, আরও দ্বন্দ্ব দরকার।
সব মিলিয়ে, চূর্ণিকে লেখা চিঠি এক সংবেদনশীল, আবেশময়, কিন্তু অসম কাব্যগ্রন্থ। এর বড় শক্তি তার অন্তরঙ্গ সম্বোধন, সংগীতময় বাক্যপ্রবাহ, কোমল চিত্রকল্প এবং অনুভবের সততা। এর বড় সীমা তার পুনরাবৃত্তিতে, আবেগের অতিরিক্ত আবছায়া এবং বহু কবিতায় পর্যাপ্ত কাব্যঘনত্বের অভাব। বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, অরুণ দাস তাঁর কাব্যভূমি চিনে ফেলেছেন; এখন তাঁর প্রয়োজন আরও কঠোর বাছাই, আরও সংযত নির্মাণ, আরও ঝুঁকিপূর্ণ ভাষা। কারণ বড় কবিতা কেবল হৃদয় থেকে আসে না, হৃদয়ের বিরুদ্ধে ভাষার দীর্ঘ সাধনা থেকেও আসে।
এই কারণেই চূর্ণিকে লেখা চিঠিকে আমি শেষ পরিণতির বই বলব না; বরং বলব, এটি এমন এক কবির বই, যিনি নিজের ভেতরের সুর শুনতে পান, কিন্তু এখনও সেই সুরকে সর্বত্র অবিস্মরণীয় কবিতায় রূপ দিতে পারেননি। আর ঠিক সেখানেই বইটির গুরুত্ব। সুতরাং, এই কাব্যগ্রন্থ আমাদের কাছে কোনো গন্তব্য হয়ে ওঠে না; বরং একটি নির্মম অথচ সম্ভাবনাময় যাত্রাপথের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়।
0 Comments