ইস্কুল ফিস্কুল : শিক্ষা ব্যবস্থার অন্তর্লীন অসুখের এক সৎ প্রতিবেদন
কমলিকা ভট্টাচার্য
কোনো এক বিশেষ কিংবা আপাত অবিশেষ কারণেই হোক, সৌমেন রায়-এর লেখা ইস্কুল ফিস্কুল বইটি একদিন আমার হাতে এসে পড়ে। বিশেষ এই কারণে যে, জ্বলদর্চির বাংলা নববর্ষ অনুষ্ঠানে বইটি আমার স্বামী বিপ্লব ভট্টাচার্য-এর হাতেই প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তার আগে যদিও লেখাগুলি জ্বলদর্চি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পেয়েছিল আর অবিশেষ এই কারণে যে সে সময় সেগুলি আমার পড়ার সুযোগ হয়নি আর বাড়িতে আনার পর বইটি বহুদিন আমার বইয়ের তাকেই নিঃশব্দে পড়ে ছিল—যেমনভাবে আমাদের সমাজে শিক্ষার মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও প্রতিদিন চোখের সামনে থেকেও প্রয়োজনীয় মনোযোগ পায় না। আমরা তাকে নিয়ে আলোচনা করি, উদ্বেগ প্রকাশ করি, কিন্তু খুব কম মানুষই গভীরে নেমে বুঝতে চেষ্টা করি সমস্যার আসল শিকড় কোথায়।
একদিন হঠাৎ নানা বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে ইস্কুল ফিস্কুল আবার আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। বইটি হাতে নিয়ে পড়া শুরু করার পর থেকেই মনে হতে লাগল, এই বইটি কেবল আমার মতো সাধারণ পাঠকের নয়—প্রত্যেক শিক্ষক, অভিভাবক, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষাবিদ, এমনকি শিক্ষা নীতিনির্ধারকদেরও পড়া উচিত। কারণ এই বই শুধুমাত্র একটি বই নয়; এটি আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের ব্যর্থতা, দায়িত্বহীনতা, আশা, সম্ভাবনা—সবকিছুরই প্রতিফলন দেখতে পাই।
🍂
বইটির প্রচ্ছদ চমকপ্রদ বা আকর্ষণীয় না হলেও ভীষণভাবে প্রতীকি এবং তার ভেতরের বিষয়বস্তু অসাধারণ শক্তিশালী। বইটির মূল আকর্ষণ লেখকের ভাষার সততা। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তাঁর গভীর দায়িত্ববোধ, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং সমাজের প্রতি তাঁর জবাবদিহিতার মনোভাব বইটির প্রতিটি পাতায় স্পষ্ট। আজকের দিনে যখন অনেকেই সমস্যাকে এড়িয়ে যেতে অভ্যস্ত, তখন সৌমেন রায় সমস্যার গভীরে প্রবেশ করেছেন, কঠিন প্রশ্ন তুলেছেন এবং অকপটে সত্য বলার সাহস দেখিয়েছেন।
বইয়ের প্রথম পর্বে তিনি আশির দশকের নিজের স্কুলজীবনের স্মৃতিচারণ করেছেন অত্যন্ত নস্টালজিক ভঙ্গিতে। কিন্তু সেই স্মৃতিচারণ কোনোভাবেই আজকের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে অহেতুক তুলনামূলক নালিশ হয়ে ওঠেনি। তিনি অতীতকে মহিমান্বিত করে বর্তমানকে অপমান করতে চাননি। বরং তাঁর লেখায় একটি ইতিবাচক বিশ্বাস আছে—পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা সত্যিকারের সমস্যাগুলোকে স্বীকার করি এবং তা সমাধানের চেষ্টা করি।
এই বিষয়টাই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। আমি নিজেও যখন স্কুলে পড়াতাম, তখন এক প্রধান শিক্ষিকা আমাদের বলেছিলেন—
“Please don’t come with only problems. Come with reasons and solutions as well.”
সেদিনের সেই কথাটি আমার জীবনের এক বড় শিক্ষা হয়ে আছে। শুধুমাত্র সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়; সমস্যার কারণ বোঝা এবং সমাধানের পথ খোঁজাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইস্কুল ফিস্কুল পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে, সৌমেন রায়ও যেন সেই একই দর্শনকে ধারণ করেছেন। তিনি শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার অসংগতি তুলে ধরেননি; তিনি খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছেন কেন এই অসুখ জন্ম নিচ্ছে, কোথা থেকে তার বিস্তার, এবং কীভাবে আমরা ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক অবস্থার দিকে এগিয়ে চলেছি।
তিনি বুঝতে চেয়েছেন কেন আজকের ছাত্রছাত্রীরা প্রকৃত অর্থে শিখতে পারছে না। কোথায় সিলেবাসের ত্রুটি, কোথায় মূল্যায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতা, কোথায় শিক্ষকের সীমাবদ্ধতা, কোথায় অভিভাবকদের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, আবার কোথায় সমাজ ও রাজনীতির অস্বাস্থ্যকর হস্তক্ষেপ—সবকিছুই তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
আজকের দিনে শিক্ষা যেন ক্রমশ একটি নম্বর সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। শিশুর কৌতূহল, চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা—এসবের জায়গা দখল করে নিয়েছে মুখস্থবিদ্যা, অন্ধ র্যাঙ্কিং এবং সামাজিক তুলনা। বইটিতে লেখক এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে পরিবার, সমাজ এবং তথাকথিত “সফলতা”-র সংজ্ঞা শিশুমনকে ধীরে ধীরে যান্ত্রিক করে তুলছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি শিক্ষকদের ভূমিকাও এড়িয়ে যাননি। একজন শিক্ষক হিসেবে নিজের অবস্থান থেকেই তিনি আত্মসমালোচনার সাহস দেখিয়েছেন। বর্তমান সময়ে এই সততা অত্যন্ত বিরল। অনেক সময় আমরা সমস্যার দায় একে অপরের উপর চাপিয়ে দিই—অভিভাবক শিক্ষককে দোষ দেন, শিক্ষক প্রশাসনকে, প্রশাসন নীতিকে, আর নীতি সমাজকে। কিন্তু এই বইয়ে লেখক দেখিয়েছেন, সমস্যাটি আসলে বহুমাত্রিক এবং প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু দায় আছে।
তিনি টিউশন সংস্কৃতি, ডিজিটাল বিভ্রান্তি, মোবাইল নির্ভরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়, শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক উদাসীনতা—এই সমস্ত সংবেদনশীল বিষয় নিয়েও নির্ভীকভাবে লিখেছেন। তাঁর লেখায় কোথাও চটকদার নাটকীয়তা নেই, আছে গভীর পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার নির্যাস। এই কারণেই বইটি পড়তে পড়তে মনে হয় না কেউ দূর থেকে তত্ত্ব দিচ্ছেন; বরং মনে হয় একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের ভেতর থেকে তাঁর অভিজ্ঞতার সত্য কাহিনি শোনাচ্ছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি কোনো পক্ষকে খুশি করার জন্য লেখেননি। সত্য উচ্চারণ করার জন্য যদি তাঁকে বিরাগভাজনও হতে হয়, তবুও তিনি পিছিয়ে আসেননি। আজকের সময়ে এই সাহস সত্যিই প্রশংসনীয়। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে সরাসরি কথা বলা মানেই অনেক সময় অস্বস্তিকর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ানো। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে সেই সত্য উচ্চারণ করাটাই একজন প্রকৃত শিক্ষকের দায়িত্ব, এবং সৌমেন রায় সেই দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এই বইটির বক্তব্যকে আরও বেশি সত্য বলে মনে করায়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে স্কুলে পড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, যদিও লেখক মূলত পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সামনে রেখে লিখেছেন, তবুও সমস্যাগুলো কেবল একটি রাজ্যের নয়। ভাষা, বোর্ড, অঞ্চল বদলালেও সমস্যার মূল চরিত্র প্রায় একই থেকে যায়। কোথাও হয়তো উনিশ, কোথাও বিশ—কিন্তু শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর কাছে পৌঁছতে পারছে না, এই বাস্তবতা সর্বত্রই বিদ্যমান।
আমরা প্রায়ই ভাবি, শিক্ষা মানেই শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া। অথচ শিক্ষা আসলে মানুষ তৈরি করার প্রক্রিয়া। সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। শিশুরা তথ্য পাচ্ছে, কিন্তু জ্ঞান নয়; ডিগ্রি পাচ্ছে, কিন্তু মূল্যবোধ নয়; প্রতিযোগিতা শিখছে, কিন্তু সহমর্মিতা নয়। ইস্কুল ফিস্কুল এই গভীর সংকটকেই সামনে নিয়ে আসে।
এই বইটির আরেকটি বড় গুণ হলো এর ভাষা। অত্যন্ত সহজ, প্রাঞ্জল অথচ তীক্ষ্ণ ভাষায় লেখা। কোনো জটিল তাত্ত্বিক পরিভাষার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখেননি লেখক। ফলে বইটি যেমন একজন শিক্ষাবিদের জন্য প্রাসঙ্গিক, তেমনই একজন সাধারণ অভিভাবকও সহজেই এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই বইটিকে আমাদের আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত। শুধুমাত্র সাহিত্যচর্চার অংশ হিসেবে নয়, সামাজিক দায়িত্ব হিসেবেও। কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন কেবল সরকারের কাজ নয়; এটি সমগ্র সমাজের দায়িত্ব। আমরা যদি সমস্যাগুলোকে বুঝতেই না পারি, তাহলে তার সমাধানের পথও কখনো খুঁজে পাব না। ইস্কুল ফিস্কুল সেই বোঝার দরজাটা খুলে দেয়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই বইটি ভারতের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়া উচিত। কারণ এর আলোচ্য বিষয় কেবল বাংলা মাধ্যম বা পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমগ্র ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার এক গভীর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগীরা যদি এই বইটি পড়েন, তাহলে হয়তো একটি বৃহত্তর সামাজিক আলোচনার সূচনা হতে পারে।
সবশেষে বলব, ইস্কুল ফিস্কুল শুধু একটি বই নয়—এটি এই সময়ের শিক্ষা সংকট নিয়ে লেখা এক সৎ দলিল। এই বই আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে, প্রশ্ন করতে শেখায়, ভাবতে বাধ্য করে। আর যে বই মানুষকে ভাবায়, সে বই কখনও অবহেলায় পড়ে থাকার নয়।
লেখক সৌমেন রায় কে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।
7 Comments
কমলিকা ভট্টাচার্যের লেখা আলোচনাটি পড়ে খুব ভালো লাগলো। যে মানুষটির লেখা বইটি নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন সেই মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয়, সখ্যতা আছে। জ্বলদর্চিতে যখন ধারাবাহিক ভাবে লেখাগুলো প্রকাশিত হচ্ছিল তখন থেকেই এই আশ্চর্য জবানবন্দির সঙ্গে আমার পরিচয়। দুই মলাটের মধ্যে সব লেখাগুলোকে বেঁধে ফেলার পর তার বক্তব্য এবং ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ অনেকটাই বেড়ে গেল। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে,তার অভিমুখ, দর্শন, প্রয়োজনীয় প্রায়োগিক দক্ষতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা ও অনুরাগ না থাকলে এই নিবন্ধগুলো লেখা সম্ভব হতো না। শিক্ষার্থীদের মনোজমিনে সামান্য আঁচড় না কেটেই আমরা সব ঠিক হ্যায় বলে ঝুটা মন্তব্য করি । সৌমেন এর সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলোচনা হয়। আমি সমৃদ্ধ হই, ঋদ্ধ হই। নতুন নতুন পথে ছেলেপিলেদের চাগিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়ে দেখেছি সৌমেন খুব মন দিয়ে সেগুলো আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছে, বুড়ো মানুষের বাতিল বুদ্ধি বলে এককথায় খারিজ করে দেয় নি। কমলিকা দেবী ঠিক কথা বলেছেন -- সৌমেন দুচ্ছাই বলে সমস্যাকে এড়িয়ে যাননি,বরং চক্রব্যুহে আটকে পড়েও নিরন্তর তার সঙ্গে যুঝবার সদর্থক প্রয়াস করে গেছেন। ইস্কুল ফিস্কুল তাই নিছক একটি বই নয়,এক দরদী সংবেদনশীল মানুষের সৃজন ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ReplyDeleteকমলিকা দেবীর প্রতি রইলো অনেক কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা। ভালো থাকুন, ভাবনায় থাকুন।মন্থন জারি থাকুক
আমার শ্রদ্ধা নেবেন । আপনাদের মত গুণীজনের সঙ্গে ঘটনাচক্রে আলাপ হওয়া আমার পরম সৌভাগ্য।🙏
Deleteপ্রণাম নেবেন।🙏
Deleteলেখিকাকে অনেক ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা জানাই।প্রকৃত পাঠক পাওয়াও কম কথা নয়।
ReplyDeleteবইটি কেউ নিতে চাইলে মেদিনীপুরের মল্লিক পুস্তকালয় ও গ্রন্থসাথী বই দোকানে পাওয়া যাবে। তাছাড়া বইবন্ধু পাবলিশার্স এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেও নেওয়া যাবে।
স্যার আপনিও আমার প্রণাম নেবেন।🙏
Deleteনতুন করে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসছে জাতীয় শিক্ষানীতির আনুপূর্বিক রূপায়ণের মধ্য দিয়ে। এই সময় নিবিড় মন্থনের প্রয়োজন,নচেৎ যেমন চলছিল তেমনই হয়তো চলবে। বইটা নতুন দিকনির্দেশনা করুক।
ReplyDelete🙏🙏
Delete