মৌমিতা চ্যাটার্জী
তাঁর সম্পর্কে লিখতে বসলে কাগজ কলমের ভাঁড়ারে টান পড়বে। আপামর বাঙালির মননে, চিন্তনে, সাধনায় রবি ঠাকুরের পরই যে নামটি ধ্বনিত হয় তা সত্যজিৎ রায়। আমি তখন সম্ভবত ক্লাস থ্রি, ফোর। নব্বইয়ের দশকে কেবল্ কানেকশনের অত রমরমা ছিল না। বিনোদন বলতে ঐ দূরদর্শনের দুটো চ্যানেল ডিডি বাংলা আর ডিডি মেট্রোকেই যা বুঝতাম।
আবছা আবছা মনে আছে সেবার গরমের ছুটিতে নানারকম দ্বিপ্রাহরিক অনুষ্ঠানের সাথে দেখেছিলাম গুপী বাঘা ফিরে এল, হীরক রাজার দেশে, গুপী গাইন বাঘা বাইন। গভীরে তল খুঁজে না পেলেও ঐ বয়সেই একটা অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি হয়ে গেছিল যা আজও বর্তমান। সত্যজিৎবাবুর সঙ্গে ঐ আমার প্রথম আলাপ ছিল। তারপর এল একে একে জয়বাবা ফেলুনাথ,
সোনার কেল্লা, আগন্তুক, শাখাপ্রশাখা, নায়ক। প্রত্যেকটা ছবির রেশ আমার ছেলেবেলার বহুলাংশকে কতটা কল্পনার উড়ানে ভাসিয়েছিল তা এই মধ্যগগনেও অনুভব করি।
🍂
বেশ খানিকটা পরিণত বয়সে এসে পথের পাঁচালীর অপু, দুর্গা,সর্বজয়া, হরিণ ও শেষে কাজলের সঙ্গে পরিচয়ের পর কঠিন বাস্তবের শিকড়ে অনুভূতিগুলো আস্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেল। বাংলার সাধারণ মাঠঘাট, কাশ, খাল, বিলের অভ্যন্তরের লুকানো শৈল্পিকতাকে যে কোন অদ্ভুত মন্ত্রবলে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন তা কেবল উনিই জানেন! জীবনের ছোটো ছোটো আনন্দ, বিষণ্ণতা, কঠোরতা, অস্থিরতা উৎকৃষ্ট শিল্প হয়ে ধরা দিয়েছিল তাঁর মেধাপ্রসূত যাদুতে। বলা যায় শান্তিনিকেতনে শিল্পী নন্দলাল বসু ও বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্য ও শিক্ষাই এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথকে আরো প্রসারিত করেছিল। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য, কাহিনি, সংলাপ, উপস্থাপনা, সংগীত পরিচালনাসহ প্রতিটি বিভাগে তাঁর অবাধ সুদক্ষ বিচরণ শৈল্পিক উৎকর্ষতার সর্বোচ্চ স্থানে আরোহণ করেছে। ঐ উদাত্ত কন্ঠের বাচণভঙ্গীতে মুগ্ধ সংস্কৃতি জগৎ। অশনি সংকেত, জনঅরণ্য, শতরঞ্জ কে খিলাড়ি, অরণ্যের দিনরাত্রি চলচ্চিত্র জগতের একেকটি মাইলস্টোন। ‘হীরক রাজার দেশে’ বুঝিয়ে দিয়েছে তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা যা আজকের দিনেও কতখানি প্রাসঙ্গিক আমরা অনুভব করি প্রতি পদক্ষেপে। পরবর্তীতে উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্র, ঋত্বিক ঘটক বা প্রায় সমসাময়িক মৃণাল সেন এর মত প্রতিভারা সংস্কৃতি জগতকে স্বতন্ত্রতার আলোকে আলোকিত করেছেন ঠিকই, তবুও একথা অনস্বীকার্য সত্যজিৎ রায় এক মহীরুহ যার ছায়াতলে নিশ্চিন্তে আশ্রয় নিতে পারে নাট্য, চলচ্চিত্রের আগামী প্রজন্মের চারাগাছের দল।
কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি। সাহিত্যের দিকে কিছুটা মোড় ঘোরাই। ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু, তারিণীখুড়োরা অনায়াসেই গোল দিয়ে দিতে পারে আধুনিক হ্যারিপটারদের। সময় পেলেই মাঝেমাঝে হাতে তুলে নিই লিমেরিক ‘ তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ ,বা অনুবাদ গল্প ‘ব্রাজিলের কালো বাঘ।’ বয়স ও অভিজ্ঞতার ভারে ভারাক্রান্ত মনকে নির্মেদ হাস্যরসে দোলা দিয়ে যায় সেই ছেলেবেলার “মোল্লা নাসিরুদ্দীনের” গল্পগুলো। মূলতঃ কিশোর ও তরুণ পাঠকের কথা মাথায় রেখেই তিনি তাঁর লেখনশৈলী ও সাহিত্যের বেশ অনেকখানি অংশই উৎসর্গ করেছিলেন।
সত্যজিৎ রায় ছিলেন সুদক্ষ চিত্রশিল্পী। ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কুর চিত্রায়ণ এরই সাক্ষ্যপ্রমাণ। তাঁর অঙ্কিত চরিত্রগুলি তাঁরই মত সুস্পষ্ট বাস্তববাদী।
ব্যক্তিগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব, আনন্দ, দুঃখের দৈনন্দিন যাপনকেও দিয়েছেন নান্দনিক রূপ। সত্যি, একই অঙ্গে এমন বিরল বহুমুখী প্রতিভার সমাবেশ…বোধহয় বাঙালি বলেই সম্ভব!
0 Comments