প্রথম পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
ছোট্টবেলা থেকে পড়ে এসেছি 'জীবন'-এর বিপরীত শব্দ হলো মৃত্যু, 'সুখ'-এর বিপরীত শব্দ হলো দুঃখ। কিন্তু জীবনের পথে চলতে চলতে শিক্ষার আঙিনায় এসে উপলব্ধি করলাম, এরা ঠিক বিপরীত নয়। এদের সম্পর্ক মোটেই আদায়- কাঁচকলায় নয়। এরা এক আশ্চর্য সম্পর্কে পরস্পর সম্পর্কিত।
একটা জীবনের জন্য কত অপেক্ষা! কিন্তু জীবন এগিয়ে যায়, এক পা এক পা করে সেই মৃত্যুর দিকে। আর মৃত্যু- যা এখনো দেখিনি কিন্তু শুনেছি- যার অস্তিত্ব কিছুটা উপলব্ধি করেছি, তা এগিয়ে নিয়ে যায় নতুন জীবনের দিকে। সুখ যা দুষ্প্রাপ্য নয়,পাওয়া যায় কিন্তু একইভাবে ধরে রাখা যায় না। আর ধরে রাখার প্রচেষ্টায় দুঃখ চুম্বকের মতো টানা হয়ে চলে আসে। এ সবই খুব আশ্চর্যের ব্যাপার নয় কী!
বিস্তীর্ণ মৃত্যু উপত্যকায় জীবনের অবাধ আনাগোনা। আবার জীবনের বেলাভূমিতে মৃত্যুর নিঃশব্দ নিশ্চিত পদচারণা। এর মাঝে বেঁচে থাকার গল্প। কত না অনুভব, কত না ভয়, কতই না অভিযোগ, আর কতই না চেনা- অচেনা আবেগ!
🍂
সেই কোন এক শাব্দজ্ঞানলব্ধ ক্ষণে জীবনের সূত্রপাত।তারপর একটু একটু করে অবোধ থেকে বোধলব্ধ জীবনের অধ্যায়গুলোর আরম্ভ । আড়ষ্ট জিভের জড়তা কাটিয়ে বলতে শেখা কথামালা। বাধো-বাধো পায়ে চলার সীমা ছাড়িয়ে দৌড়োতে শিখে যাওয়া জীবনের বেলাভূমিতে।সহজ অভিজ্ঞতায়, সহজ জীবন- সহজ কথা- ভারহীন বিশ্রাম। কিন্তু তার সাথে থাকে বড় হওয়ার তাগিদ। একদিন পূর্ণতা পায়ও সেই তাগিদ। কিন্তু সেই সহজ জীবন- সহজ অভিজ্ঞতা তখন আর তত সহজ থাকে না।অভিজ্ঞতার ভারে বিশ্রামগুলোও তখন হয়ে যায় ক্লান্তি নিরসনের ক্ষণ।
যে মন একসময় মৃত্যুকে ভয় পেতো, সেই মনও বুঝে যায় মৃত্যুতে জীবনের শেষ নয়। অনেকটা ক্লান্ত জীবনের পুনর্নবীকরণ। অভিজ্ঞতার অনুভূতি শেখায়- ভয় নয়, ভেসে বাঁচতে শেখাই হল আসল জিয়নকাঠি। এড়িয়ে বা পালিয়ে যাওয়া নয়,জেনে- বুঝে সমস্যার অন্তর্নিহিত অসারতাকে উপলব্ধি করাই হলো সমস্যার প্রকৃত সমাধানের সূত্র।
সুখের খোঁজে সুখ পাওয়া যায় না- দুঃখের ভয়ে সুখকে উপভোগও করা যায় না। অনুভূতিগুলোকে সুখ-দুঃখ বা অন্য কোন নামে নামাঙ্কিত না করে, অনুভূতিগুলোকে শুধু অনুভূতির মাঝেই রাখা ভালো।
পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলে না পাওয়ার সংখ্যা বেড়ে যায়। আর আকাঙ্ক্ষা না থাকলে যেকোন পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়া সহজ হয়।
জীবনের ভবিষ্যৎ অজানা- অজানার চিন্তায় জানা সময় তথা বর্তমান অনেকটাই অবহেলিত হয়। এই বর্তমানের উপরেই অনেকাংশে নির্ভরশীল থাকে ওই ভবিষ্যৎ,তবে বর্তমান কিন্তু ভবিষ্যতের উপর নির্ভরশীল নয়।'কি হবে?'-এই চিন্তায় অভিজ্ঞতাপক্ব অর্বাচীন মন হয় ব্যাগ্র। ধীরে ধীরে অবশ্য একদিন পথ চলার স্রোতে আপনমনে পথ চলার কৌশল শিখে যায় ওই মন। একদিন ওই অস্থির মন ঝরে পড়া দু'চোখের জলের স্রোতে নীরবে সব অস্থিরতাকে বইয়ে দিতেও শিখে যায়। হয়তো এটাকেই তখন বলা হয় পরিণতমনস্কতা।
0 Comments