মধুবাবুর রেলসফর
কমলিকা ভট্টাচার্য
সকাল সকাল নিমন্ত্রণের কার্ডটি হাতে পেয়ে মধুবাবু দারুণ খুশি, খুব প্রিয় বন্ধুর মেয়ের বিয়ে চেন্নাইতে।
মধুবাবু কল্যানী দেবীকে ডেকে বললেন, “চল, চেন্নাই ঘুরে আসা যাক, অনেকদিন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি।”
কল্যানী দেবী খুবই উৎসাহিত হয়ে বললেন, “তাহলে বাবুকে বলে দিচ্ছি ফ্লাইটের টিকিট করে দিতে। বিয়ে বাড়ি মিটে গেলে ,আমরা রামেশ্বরম, কন্যাকুমারী একটু ঘুরেও নেব।”
মধুবাবু বললেন, “দেখো কল্যানী, ঘুরতে গেলে ট্রেনে করে যাওয়ার আনন্দই আলাদা।”
কল্যানী দেবী বললেন, “তোমার পরের ডায়ালগটা বলো না—আসল ইন্ডিয়া কে জানতে গেলে ট্রেনে যেতে হয়। আজ প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর ধরে তোমার আসল ইন্ডিয়া দেখতে দেখতে আমি নকল হয়ে গেছি। আসলে তুমি কঞ্জুস, পয়সা বাঁচাতেই ...।”
মধুবাবু বললেন, “এই তো সেদিন প্লেনে করে ঘুরে এলে, তাও, তোমাদের একচুয়ালি বদনাম করা স্বভাব। যাই হোক, আমি ট্রেনেই যাব।”
কল্যানী দেবী বললেন, “বিয়ের আর পনেরো দিন আছে, এখন কনফার্ম টিকিট পাওয়া যাবে? আমি আগেই বলে দিচ্ছি, RAC থাকলে আমি বসে বসে যেতে পারব না।”
মধুবাবু বললেন, “কেনো তোমার সেই বন্ধুটি, তোমার একটা ফোনের অপেক্ষা, তাহলেই কনফার্ম।”
কল্যানী দেবী রেগে বললেন, “তোমার খালি লোকের সাথে দরকারে যোগাযোগ।”
মধুবাবু বললেন, “শুধু আমার দরকার? ওনার কি কোনো দরকার মিটবে না? তুমি বললে উনি সাইকেলে করেও পৌঁছে দেবেন, তুমি সামনে বসে যেও, আমি পিছনে ক্যারিয়ারেই বসব। As usual, I am always your 2nd priority।”
কল্যানী দেবী বললেন, “এইভাবে লোককে টিকিট কনফার্ম করার কথা বারবার বলা ঠিক নয়, সেও সেখানে কাজ করে।”
মধুবাবু নিরাশ হয়ে বললেন, “হুঁ।”
🍂
ভগবানের কৃপায় আর কাউকে বলার দরকার হলো না, টিকিট কনফার্ম হয়ে গেল।
যাবার দিন সকাল থেকেই নানা ব্যঞ্জন তৈরি হলো, কারণ তিরিশ ঘণ্টার জার্নিতে মধুবাবু একটুও বাইরের ট্রেনের খাবার খাবেন না—সেটা ঠিক কীরকম তা ক্রমশ প্রকাশ্য।
দুপুর তিনটের সময় ট্রেন। মধুবাবু চলছেন হেলেদুলে, কল্যানী দেবী বলছেন, “তাড়াতাড়ি।” মধুবাবুর কোনো হেলদোল নেই।
তাই প্রতিবারের মতো এবারেরও প্রায় ছুটে ছুটে এসে ট্রেন ধরতে হলো।
নিজের সিটে বসে কল্যানী দেবী রেগে বললেন, “বয়স তো আর কম হচ্ছে না, একটা বিপদ না ঘটিয়ে তুমি ছাড়বে না।”
মধুবাবু কপালের ঘাম মুছে বললেন, “আরে, আমি না আসলে ট্রেন ছাড়তই না।”
কামরার সবাই ঘুরে একবার মধুবাবুকে দেখলেন।
মধুবাবু হাঁক দিলেন, “এই এসি বালা, এদিকে এসো, এসিটা বাড়াও দেখি।”
অ্যাটেনডেন্ট বলল, “স্যার, একদম ফুল আছে।”
“তাহলে কি বলতে চাইছ, আমি ফুল?”
ওপর থেকে একটি ইয়ং ছেলে বলল, “কুল আংকেল, কুল।”
সামনের সিটে একদল ফ্যামিলি, সঙ্গে ৭–৮ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে, সেও উপরের সিটে বসে।
কিছুক্ষণ পরেই সেই ফ্যামিলির মহিলা বার করলেন একটি রীতিমতো মুড়ির বস্তা, তেল, শসা, বোতলের ভিতর ভেজানো ছোলা। তারপর সব কেটে বেশ মশলা মুড়ি মেখে কামরায় ছড়ানো তাদের বিশ-পঁচিশ জনের দলের মধ্যে ভাগ করে নিলেন।
মধুবাবু এতক্ষণ হাঁ করে সব দেখছিলেন। এরপর কল্যানী দেবীর উদ্দেশ্যে বললেন, “নেক্সট টাইম তুমি খানিকটা মুড়ি নিয়ে এসো।”
সামনের মহিলাটি বললেন, “কাকু, খাবেন নাকি?”
মধুবাবু একবার কল্যানী দেবীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “দু গাল শুকনো মুড়ি দাও।” তারপর কল্যানী দেবীর উদ্দেশ্যে বললেন, “বাচ্চা মেয়ে বলছে কাকু করে ,না করা কি যায়?”
ঠিক তখনই হাঁক এলো, “গরম গরম সামোসা!”
মধুবাবু বললেন, “বাহ, একদম ঠিক সময়। মুড়ি কি আর শুধু খাওয়া যায়!”
এরপর চিকেন পাকোড়া, পনির পাকোড়া, চিপস, জল, মুড়ি, ছোলা—কিছুই বাদ গেল না। তার উপর লেবু চা, আদা চা, মশলা চা, এলাচি চা—কতবার যে চলল তার হিসাব নেই।
রাতে ডিনারে সামনে লোকেদের সেই মুড়ি আর সাথে চিকেন কষা।
মুড়ি-বিরিয়ানিটি চেখে দেখার খুব শখ হলেও কল্যানী দেবীর বিরক্তি বুঝে নিজের লোভ দমন করলেন, কিন্তু মনে মনে আফশোস থেকেই গেল।
অগত্যা বাড়ি থেকে রেঁধে আনা পটলভাজা আর শুকনো রুটি।
এরপর সবাই চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তবে বন্ধ এসি কামরা,সবাই মড়ার মতো সাদা চাদরে, বাতকর্মে দুর্গন্ধময়, কামরা মর্গের মতো লাগতে লাগল।
কল্যানী দেবী উঠে গিয়ে অ্যাটেনডেন্টকে বললেন, “ভাই, বড় মশা আর দুর্গন্ধে যে শোয়া যাচ্ছে না, কিছু স্প্রে করে দাও।”
সবে একটু চোখ লেগেছিল, হঠাৎ চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। কিছু বোঝার আগেই কল্যাণিদেবী দেখলেন, একটি ছেলে দু’টো মোটা মোটা টিটিকে খুব পিটছে।
মধুবাবু এইসব ব্যাপারে খুবই ভীতু, আর সবাই নিজের নিজের জায়গায় শুয়ে মজা দেখছে।
কল্যানী দেবী দেখলেন, এটি সেই ছেলেটি যে নিজেকে এয়ারফোর্সের জওয়ান বলেছিল এবং আগের টিটিকে নিজের আইডি কার্ড দেখিয়েছিল। নরমাল টিকিট দেখিয়ে বলেছিল ডিউটি জয়েন করতে যাবে। সেই টিটি কিছু ফাইন করে দিয়েছিল আর বলেছিল সিট হবে না, এনারা যদি আপত্তি না করে এখানে বসতে পারে।
ছেলেটি বেশ হেল্পফুল—কিছু লেবার ছেলেপুলে চেন্নাই কাজে যাচ্ছে, সঙ্গে টিকিট থাকলেও আইডি কার্ড ছিল না। টিটি ওদের নামিয়ে দেবে বলছিল। তখন ছেলেটি ওদের ফোনে ডিজি লকার ডাউনলোড করে আধার কার্ড বের করে সাহায্য করেছিল।
কল্যানী দেবী এবার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ওনাকে ছেড়ে দিন।”
টিটি বলল, “ওনার টিকিট নেই, এসি কামরায় বসে আছে।”
এইবার মধুবাবু কাঁপা গলায় বললেন, “ওনারা আছেন বলেই আমরা শান্তিতে দেশের ভিতর বসে আছি।”
আরেক টিটি বলল, “ও যেই হোক, আমাদের গায়ে হাত তুলেছে।”
জওয়ান ছেলেটি বলল, “আমার কাছ থেকে আরও ২০০০ টাকা চাইছে। আমি আগের টিটি ইস্যু করা টিকিট দেখাতে গেলে বলছে—‘তুঝে চল ট্রেন সে বাহার ফেকতে হ্যায়।’ ম্যায় ক্যা কোহি সামান হুঁ কি উঠাকে বাহার ফেক দেগা?”
এরপর কল্যানী দেবী টিটিদের বললেন, “আগের টিটি ওনাকে ফাইন করে টিকিট দিয়েছেন। উনি একজন জওয়ান। আমরাই ওনাকে এখানে বসতে বলেছি। কামরায় উনি কাউকে ডিস্টার্ব না করে পায়ের কাছে বসে আছে। বিশাখাপত্তনম এলে নেমে যাবেন। আপনারা এখন আসুন, যাত্রীদের শুতে দিন। না হলে আমি আপনাদের নামে কমপ্লেইন করতে বাধ্য হব।”
একটা বড় সমস্যা মিটল বটে।
এদিকে ভোর ৫টা থেকেই “চা, চা” শুরু। মধুবাবুরও শুরু চা। তারপর টয়লেটে গিয়ে আক্কেল গুড়ুম—চারিদিকেই নোংরা ,গুময়, এমনকি হাত ধোয়ার বেসিনেও।
চিৎকার জুড়লেন।
অ্যাটেনডেন্ট এসে সব শুনে বললেন, “এক্ষুনি পরিষ্কার করিয়ে দিচ্ছি, স্যার।”
মধুবাবু বললেন, “কতক্ষণে পরিষ্কার হবে? ততক্ষণ আমি ইয়ে চেপে রাখব? তুমি জলদি দেখে এসো কোন বগিতে খালি আর পরিষ্কার আছে।”
ততক্ষণে একগাল হাসি নিয়ে হাউসকিপিং ছেলেটি বলল, “কি হয়েছে স্যার?”
মধুবাবু বললেন, “কোথায় থাকো? পুরো টয়লেট নোংরা!”
ছেলেটি বলল, “সেকি স্যার! আমিতো একটু আগেই পরিষ্কার করে গেলাম। কাকিমাকে জিজ্ঞাসা করুন, যেই বললেন মশা কামড়াচ্ছে, তক্ষুনি স্প্রে করে গেলাম। কাকিমা, আর মশা কামড়ায়নি তো?”
কল্যানী দেবী রেগে আগুন। মুখ ঘুরিয়ে জানলার দিকে তাকালেন।
অ্যাটেনডেন্ট ফিরে এসে বলল, “দুটো বগি পেরিয়ে বাঁদিকে খালি… না না, ডানদিকে।”
মধুবাবু বললেন, “তোর নিকুজি করেছে! আমি যাচ্ছি, না হলে এখানেই হয়ে যাবে।”
ফিরে এসে একগাল হেসে বললেন, “তুমি যাবে তো দু’ বগি পেরিয়ে ডানদিকেরটা ভালো পরিষ্কার, জল আছে।”
কল্যানী দেবী বললেন, “আমার যাওয়ার দরকার নেই।”
এরপর মধুবাবু সকাল সাড়ে ছ’টায় ডিমের ওমলেট, ব্রেড, উকমা, চা খেয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার লম্বা ঘুম দিলেন।
কল্যানীদেবী অগত্যা বসেই রইলেন।
মাঝে মাঝে জেগে উঠে মধুবাবু বলেন, “কোন স্টেশন এটা?” আবার চাদর মুড়ে ঘুম।
কল্যানী দেবীর সবে একটু চোখ লেগেছে, হঠাৎ ওপর থেকে ঝরঝর করে কিছু পড়ছে। জেগে দেখেন, উপরের বাচ্চাটি বমি করছে সোজা মধুবাবুর মুখের উপর।
মধুবাবু প্রাণপণে জানলার পর্দাটাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বাঁচার চেষ্টা করছেন।
যুদ্ধের সমাপ্তিতে মধুবাবু সামনের মহিলার উপর চিৎকার করতে লাগলেন, “ছোট বাচ্চাকে কেউ ট্রেনে পেটপুরে মাংস-মুড়ি খাওয়ায়!”
কল্যানী দেবী বললেন, “যাও, হাতমুখ ধুয়ে এসো। আমি ব্যাগ খুলে অন্য জামা-প্যান্ট বার করে দিচ্ছি। হাউসকিপিং পর্দাটা খুলে নিয়ে যাক, জায়গাটা ভালো করে পরিষ্কার করুক।”
পরিষ্কার হয়ে ফিরে মধুবাবু বললেন, “আর নয় এইভাবে ট্রেনে।”
কল্যানী দেবী বললেন, “না, তোমার তো দেশ দেখার শখ, দেখো আরো।”
তারপর বললেন, “নিজে অনেক ঘুমিয়েছ, এবার তুমি বসে থাকো, আমি একটু শুচ্ছি।”
কিন্তু শোবেন কী করে! এত আলো, রোদ্দুর, গজগজ করছে।
একটু চোখ লাগে তো—“চা, পানি, খাবার”—ডাক আসতেই থাকে।
কল্যানী দেবী দেখেন, সামনের মহিলাটি মিটি মিটি হাসছে।
—“কি হয়েছে, হাসছ কেন?”
—“কাকু কিন্তু আপনার খুব খেয়াল করে। আপনি শোবেন বলে, আপনার মুখে যাতে রোদ না পড়ে তাই জানলার কাচে হাত রেখে রোদ আটকাচ্ছেন।”
কল্যানী দেবী বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে দেখলেন, মধুবাবু হাত দিয়ে জানলার রোদ আটকাচ্ছে।
চোখাচোখি হতেই তিনি হেসে বললেন, “কভি ধুপ, কভি ছাঁও…”
0 Comments