দূর দেশের লোকগল্প— ২৮৭
বিড়াল আর ইঁদুরের সমবায়
জার্মানি (ইউরোপ)
চিন্ময় দাশ
(কত অবাক করা ঘটনাই তো ঘটে দুনিয়ায়। শুনলে প্রথমে বিশ্বাস হতে চায় না। এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল একবার জার্মানিতে। বুড়ো-বুড়িদের মুখে সেই ঘটনা গল্প হিসেবে শোনে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। সেই গল্পটা আজ আমরা এখানে শুনব।)
এক গৃহস্থ বাড়ি। এক বুড়ো আর বুড়ি থাকে বাড়িটাতে। আর থাকে একটা বিড়াল আর একটা ইঁদুর।যীশুর কৃপায়, বেশ ভাবসাব দুজনের। ইঁদুর দেখলে, বিড়াল ঝাঁপিয়ে পড়ে না। ইঁদুরও দৌড় লাগায় না, বিড়ালকে সামনে দেখলে। একই বাড়িতে থাকে দুজনে। মিলমিশ করেই থাকে তারা।
সামনে শীতকাল। ভারী দুঃসহ সেইসব দিন। বাইরে বেরোনো দায় হয়ে যায়। সেজন্য খাবার জোগাড় করে রাখতে হবে আগে থেকে। দুজনে মিলে একদিন হাটে গিয়েছে। অনেক ঘোরাঘুরির পর, এক গোয়ালাকে পেয়ে গেল। হাটের একেবারে একটেরে বসে ছিল লোকটা। অনেকক্ষণ দেখে শুনে, ভালো মতন পরখ করে, এক ভাঁড় মাখন কিনেছে দুজনে।
মাখন কেনা তো হল। কিন্তু একে রাখা হবে কোথায়? বাড়িতে বুড়োবুড়ি থাকে। সেখানে মাখন লুকিয়ে রাখবার মতো কোনো জায়গা নেই। মালকিনের চোখে পড়ে যাবে ঠিক। অনেক ভেবে চিন্তে ইঁদুর বলল-- বিড়াল দাদা। আমি একটা পরামর্শ দিতে পারি।
বিড়াল বলল—পারো তো, বলে ফেল। বলো, কোথায় এমন জায়গা আছে?
ইঁদুর বলল-- আমাদের গির্জাঘরটা আছে না? ভেতরে যেখানে বাবা যীশুর ছবিখানা রাখা আছে, সেই কাঠের বাক্সের তলায় সুন্দর রাখা যাবে। কেউ কোনদিন ওখানে হাত দেবে না। ভয়ের কিচ্ছুটি নাই।
বিড়াল ভালই জানে, ইঁদুরের সর্বত্র যাতায়াত। গলিঘুঁজি ফাঁকফোকর সবই তার জানা। জবাব শুনে বিড়াল ভাবল, জায়গাটা মন্দ হবে না। এর চেয়ে নিরাপদ কিছু মিলবে না। সে রাজি হয়ে গেল।
গির্জাটা গ্রামের একেবারে এক মাথায়। বহুকালের পুরনো। রবিবার প্রার্থনা করতে আসা ছাড়া, বড় একটা কেউ আসে না এদিকে। জায়গাটা বেশ মনে ধরেছে বিড়ালের। দুজনে মিলে কাঠের বাক্সের পেছনে মাখনের ভাঁড়টা রেখে, ফিরে এলো।
রেখে তো এসেছে, কিন্তু শীতকাল তো এখনই চলে আসছে না। বিড়ালের মন রয়ে গেছে সেই মাখনের ভাঁড়ে। মনে পড়লেই, জিভ দিয়ে লালা ঝরতে থাকে। কিছুতেই সামাল দিতে পারছে না নিজেকে।
মাথায় একটা ফন্দি এসে গেল বিড়ালের। ইঁদুরকে বলল—শোন, ভাই। একটা ডাক এসেছে। আমার মামাতো ভাই থাকে শহরে। একটা বাচ্চা হয়েছে তার। চার্চে নিয়ে যেতে হবে। সেই ভার আমার উপর পড়েছে। তুমি যদি একটা দিন বাড়ির কাজকর্ম সামলে নিতে পারো, তাহলে আমি ঘুরে আসতে পারি আমি।
ইঁদুর বলল—কী যে তুমি বলো দাদা? এমন একটা শুভ কাজ। আর, আমি রাজি হবো না? অবশ্যই যাবে তুমি।
বিড়াল তো ভারি খুশি-- তাহলে আসি, বন্ধু।
ইঁদুর বলল—হ্যাঁ, এসো। তবে, আমার একটা অনুরোধ রেখো।
--বলো, কী তোমার অনুরোধ।
--ভাল কিছু খাবারদাবার জুটলে, আমার কথা ভুলে যেও না। আমার আবার রঙিন পানীয়ের উপরে বহুকালের লোভ। এই কথাটা একটু মাথায় রেখো।
বিড়ালের কোন মামাতো ভাইই নেই। আর, সে ভাইয়ের বাচ্চাও হয়নি একটা। ঘর থেকে বেরিয়ে টুকটুক করে গির্জাঘরে গিয়ে হাজির হয়েছে বিড়াল। ভাঁড় খুলে প্রায় অর্ধেকটা মাখন সাবাড় করতে পেট টইটুম্বুর। ফির্জা ছেড়ে, বেড়াতে বের হলে বিড়াল। এক্ষুনি তো বাড়ি ফিরে যাওয়া যায় না। তাহলে ইঁদুর সন্দেহ করবে। এত তাড়াতাড়ি সব কাজ সেরে, ফিরল কী করে? গ্রামের থেকে বাইরে বেরিয়ে, সারাদিন ঘুরে বেড়াল বিড়াল। যখন সন্ধ্যে হয় হয়, বাসায় ফিরে এলো।
ইঁদুর চোখ টেরা করে দেখে নিল, বিড়ালের হাতে কিছু নেই। খালি হাতেই ফিরেছে তার বন্ধু। কী আর করে। লাজলজ্জার মাথা খেয়ে জিজ্ঞেস তো করা যায় না। সে বেচারা চুপ করে রইল। কেবল জিজ্ঞেস করল-- বাচ্চাটার কী নাম রাখা হলো, দাদা?
বিড়াল গম্ভীর গলায় বলল-- উপরাংশ।
ইঁদুর শুনল বটে, মাথায় কিছু ঢুকলো না তার। উপরাংশ? এমন নাম আবার কারো হয় নাকি? বাপের জন্মে তো শুনিনি কখনো। সে বলল-- এমন নাম তো শুনিনি আগে।
বিড়াল কোন জবাব দিল না।
দিন কয় যেতে না যেতে, আবার মাখনের লোভ চেপেছে বিড়ালের মাথায়। ইঁদুরকে ডেকে বলল-- আবার আমার ডাক এসেছে, বন্ধু। নামকরণের অনুষ্ঠান হবে বাচ্চাটার। আমাকে ধর্মপিতা হওয়ার জন্য খুব জোরাজুরি করছে তারা। তুমি যদি রাজি থাকো, তাহলে আমি আর একবার যেতে পারি।
ইঁদুর সরল জীব। অত মার প্যাঁচ নেই তার মাথায়। সে শুনে বলল-- এ তো ভারি আনন্দের সংবাদ, দাদা। অন্যের বাচ্চার ধর্মপিতা হতে পারবে তুমি। কত গৌরবের ব্যাপার তোমার পক্ষে। অবশ্যই যাবে। এখানের কথা তোমাকে মাথায় রাখতে হবে না। আমি আছি। ঠিক চালিয়ে নেব। তুমি নিশ্চিন্তে যেতে পারো।
সেদিনও বেরিয়েছে বিড়াল। হেলতে দুলতে এ পথ ও পথ ঘুরে, গির্জায় এসে হাজির। ভাঁড়ের ঢাকনা খুলে, বাকি মাখনের অনেকটাই সাবাড় করে দিল সেদিন। মাখন খেয়ে মনটা বেশ ফুরফুরে। এ শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াবো বিড়াল। সন্ধ্যা নামতে তবে ঘরে ফিরে এলো।
ইঁদুর জানতে চাইল—এবার কী নাম হলো তাহলে বাচ্চাটার?
বিড়াল বলল-- আজও একটা মজার নাম হয়েছে, জানো। ছেলেটার নাম রাখা হয়েছে-- অর্ধগত।
ইঁদুর আবার অবাক। বলল—অর্ধগত? এ আবার কেমন নাম? এই নামও তো শুনিনি কখনো।
বিড়াল বলল-- সেদিনই তোমাকে বলেছিলাম, এই দুনিয়ার সব কিছুই কি আর আমাদের জানা আছে, বন্ধু? কত কিছুই এখন নতুন করে শিখতে হবে, জানতে হবে আমাদের। তবেই না জীবন।
দিন কেটে গিয়েছে। শীতের ভাব বাতাসে। বিড়াল বুঝতে পারল, বরফ পড়তে খুব একটা দেরি নেই। বাকি কাজটা তার আগেই সেরে ফেলতে হবে।
ইঁদুরকে ডেকে বলল-- আবার ডাক এসেছে আমার।
ইঁদুর বলল-- নামকরণ তো হয়ে গেছে বাচ্চাটার। আজ আবার কি?
ভারী মজার ব্যাপার হয়েছে। বিড়াল উত্তর দিল-- বাচ্চাটার গায়ের রং কালো। কিন্তু একটা পায়ের থাবা ধবধবে সাদা হয়ে রয়েছে। কিন্তু সারা গায়ে তার একটাও সাদা চুল তুমি খুঁজে পাবে না। এই নিয়ে বাচ্চাটার বাবা-মা একটু চিন্তিত। ডেকে পাঠিয়েছে আমাকে। আমিও ভাবছি, যাই একটু ঘুরে আসি। অবশ্য তোমার অনুমতি পেলে।
--অবশ্যই যাবে। অন্যের দরকারের সময় সাহায্য করা তো কর্তব্যের কাজ। তবে, একটা কথা কি জানো, দাদা? এই উপরাংশ বা অর্ধগত-- এসব নামগুলি আমার কেমন গোলমেলে মনে হয়। কোথাও যেন কিছু একটা রহস্য আছে। সে যাই হোক, ঘুরে এসো তুমি।
সেদিন গির্জাঘরে ঢুকে, ভাঁড়ে যা টুকু মাখন অবশিষ্ট ছিল, চেটেপুটে সব শেষ করে দিল বিড়াল। সারা দিন ঘুরে বেড়ালো নদীর ধারে, শহরের অলিতে গলিতে। সন্ধ্যা যখন নামলো, ঘরে ফিরে এল।
ইঁদুর জানতে চাইল-- কী আলোচনা হলো তোমাদের? এমন নামের কারণ কিছু বোঝা গেল?
বিড়াল বলল—না হে, কিছুই বোঝা গেল না। তাই বাচ্চাটার নাম বদল করে দেওয়া হয়েছে।
--নাম বদল করা হয়েছে? কী নাম রেখেছে নতুন করে ?
বিড়াল জবাব দিল-- এবার নাম রাখা হয়েছে-- সর্বনাশ।
ইঁদুর তো আকাশ থেকে পড়ল। সর্বনাশ আবার কারও নাম হয় না কি? কোনও বাবা মা এমন নাম রাখতে পারে? তবে, সেদিন আর কথা বাড়াল না।
দেখতে দেখতে শীত পড়ে গেল। ভয়াণক ঠাণ্ডা। খাবার দাবারের অভাব শুরু হয়েছে। একদিন ইঁদুর বলল—দাদা, চলো, গিয়ে ভাঁড়টা নিয়ে আসি।
দুজনে গির্জা ঘরে এসে হাজির হয়েছে। ভাঁড় শূন্য দেখে, ইঁদুরের তো চোখ উঠে গেছে কপালে। পুরো এক ভাঁড় মাখন ছিল। সে কি বাতাসে উড়ে গেল না কি?
মনে ভারি সন্দেহ হলো ইঁদুরের। তার মনই বলে দিল-- মাখনের ভাঁড় রেখে যাওয়ার আগে, কোনদিন কোনও মামাতো ভাইয়ের কথা শোনা যায়নি বিড়ালের মুখে। রেখে যাওয়ার পর থেকে, পর পর তিন বার বিড়াল ঘর থেকে বেরিয়েছিল। ভাঁড়ের মাখন নিশ্চয় সে-ই খেয়েছে।
ইঁদুর বিড়ালকে বলল-- তুমি মিথ্যে কথা বলেছিলে আমাকে। বেশ বুঝতে পারছি, তুমি মামাতো ভাইয়ের বাড়িতে নেমন্তন্নের নাম করে, এইখানে আসতে। ভাঁড়ের মাখনের কথা আমরা দু’জন ছাড়া, এই দুনিয়ায় আর কেউ জানে না। জানার মধ্যে আছো তুমি, আর আছি আমি। এটা নিশ্চয়ই তোমার কাজ।
বিড়াল বলল-- কী বললি, হতচ্ছাড়া?ইঁদুর জবাব দিল-- বলবো আবার কী? নেমন্তন্নের নাম করে বেরোতে বাড়ি থেকে। চলে আসতে গির্জায়। নেমন্তন্ন বাড়ি যাওনি। মাখন সাবাড় করে ঘরে ফিরতে। আর, সৃষ্টিছাড়া সব নাম শোনাতে। উপরাংশ, অর্ধগত, সর্বনাশ। সর্বনাশ কোনওবাচ্চার নাম হতে পারে।
বিড়াল গোঁফ নাচিয়ে বলল-- নাম কেন হতে যাবে রে, হতভাগা? সর্বনাশ তো তোর। সেটা কেমন জিনিষ, এখনই দেখতে পাবি।
--সে না হয় দেখালে। কিন্তু এখন পেটে কী দেবে সেটা ভেবেছ? বিড়ালের কথা শেষ হতে পেল না। বিড়াল বলল—ভেবেই রেখেছি।
বলেই এক লাফ দিয়েছে বিড়াল। বিড়ালের কামড় বলে কথা। ইঁদুরের টুঁটিটাই কামড়ে ধরেছে। একটা শব্দও বেরল না ইঁদুরের গলা থেকে। কেবল বিড়াল কচ-কচ করে ইঁদুর খাচ্ছে, সে শব্দটুকুই শোনা যেতে লাগল।
0 Comments