জ্বলদর্চি

কেন লিখি?/পৌলোমী সেনগুপ্ত


কেন লিখি?

পৌলোমী সেনগুপ্ত 

কেন লিখি?
  এই প্রশ্নের কোনও নির্দিষ্ট উত্তর নেই আমার কাছে। আর লিখিই বা কোথায়? যতটা চাই, যা চাই, যেমন লিখতে পারলে খুশি হতাম, তেমনটা মোটেই লিখতে পারি না। আসলে আমার মনে-মনে যতটা লেখা জমে, ততটা আঙুলে আসে না। মাথার মধ্যে জন্ম নেয় যে লেখা, একটা তিরতিরে সরু পাহাড়ি ঝোরার মতো, নেমে এসে কাগজে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই কেন যেন শুকিয়ে যায় তার স্রোত। যেভাবে দিন কাটে হাজার-হাজার টুকরো হতে হতে, যেভাবে রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যেও ক্রান্তির ঘুম এসে ভাগ বসায়, যেভাবে দিগন্তের ভগ্নাংশ মনের চোখে ভেসে উঠলেও তাকে হারিয়ে যেতে দিতে হয় চাপা নীল আলোর বেদনার মধ্যে, তাতে লেখা যে সত্যিই নিজে-নিজে আসবে, তা হয় না। হওয়ার কথা নয়, কিন্তু হয়। ঘুম আর জাগরণের মধ্যে যে ভাসমান চেতনায় মগ্ন মন, যে রহস্যময় সময়, তখনই যেন কিছু কিছু লাইন এসে হানা দেয় মাথার ভেতরে। ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মাথার চারপাশে লেখা কিলবিল করে আমার। সাঁতার জানি না, কিন্তু যদি ডুবুরি হতাম, তাহলে হয়তো কালচে জলের দ্রবতার মধ্যে এভাবেই এসে হানা দিত মাছের দল। তাদের এক-এক রকম রূপ, এক-এক ধরনের পাখনা। লেজের ঝাপটা মারত তারা আমাকে। ডুবে যেতে-যেতে, ঘুমের মধ্যে ডুবে যেতে-যেতে আমি ভাবি, কাল সকালেই এগুলো লিখে ফেলতে হবে। তাড়াতাড়ি, ভুলে যাওয়ার আগে। মনে থাকবে? মনে থাকবে আমার এসব নতুন নতুন কবিতা? নিজেই উত্তর দিই, নিশ্চয়ই থাকবে। এই তো আমার হাতের মুঠোয় বিশাল মাছটা। রুপোলি আঁশ চকচক করছে গায়ে। এমন মাছ এর আগে দেখেছে কেউ? সাদা কাগজে ফুটে উঠবে যখন এর ছবি, তখন কেমন চমক লাগবে তোমাদের? তোমাদের, মানে, এই পাঠকদের? ভাসমান জিনিসগুলোকে মুঠোয় ধরে আমি আরো গভীরে ডুব দিই... ঘুমের মধ্যে মিশে যাই। সকালে উঠে মুঠো খুলে দেখি সব ভোঁ ভ্যাঁ। চিহ্নবিহীনভাবে মিটে গিয়েছে কবিতার শেষ রুপোটুকু। হাতড়াই, মনের ভেতর হাতড়াই, জালের ভেতর হাতড়াই, জলের ভেতর হাত ডুবিয়ে বসে থাকি অনেকক্ষণ। পাই না। সে মিলিয়ে যায় অন্য কোনও গভীরতর জলে।

আমার লেখার বিবরণ এমনই এক পাওয়া আর হারানোর বিবরণ। ডুব দেওয়ার গল্প দিয়ে তার শুরু, আর বাতাসের সংস্পর্শে আসা দিয়ে তার শেষ। হাত দিলেই হাজার শব্দ লিখে ফেলার আশা আমার একেবারেই নেই। কিন্তু লিখি তো আমিও। থেমে থেমে হলেও, অল্প করে হলেও, অনেক দিন ধরে একটু-একটু করে হলেও, আমি তো কিছু লিখেছি। কেন লিখলাম?

যদি বলি, আর কিছু পারি না বলেই লিখি, তাহলে তা নেহাতই মিথ্যে বলা হবে। আরও বেশ কিছু কাজ ভালভাবে পারি। সম্ভবত লেখার মতোই ভাল ভাবে পারি। তবুও লিখি। আমার জীবনে কবিতার জয় সেখানেই। একমাত্র অবলম্বন বলে নয়, অন্য অনেক অবলম্বন থাকা সত্ত্বেও লেখা আমি ছাড়তে পারি না।

আবার যদি বলি, কেউ কেউ লেখা চান বলেই লিখি, কোনও কোনও সম্পাদক বারবার ফোনও করেন তাই লিখতে হয়, তাহলে ছিছিকারে ভুবন ভরে যাবে নিশ্চয়ই। এসব কথা সত্যি হলেও কখনও প্রকাশ্যে স্বীকার করতে নেই। তবু বলি, আমার বেশির ভাগ লেখা কিন্তু সেই কারণেই। কেউ চান, কেউ চিঠি দেন, কেউ ফোন করেন। আমি বলছি না যে তাঁদের সকলকে আমি লেখা দিতে পারি। তা পারি না মোটেই। কিন্তু কোনও কোনও সম্পাদককে তো দিই। জাগতিক জগতে তাই আমার লেখার তাগিদ সম্পাদকের বার্তাই।

আবার বলি, সেটা জাগতিক জগতে। আর অবচেতনে? সেখানে আমাকে তাড়া করে বেড়ায় চেনা-অচেনা অনেক কিছুই। নীল নির্জনে ভুল-ঠিক-ক্লান্তি-পরিশ্রম-দুঃখ-পুলক সব মিলিয়ে মনটা নিশপিশ করে ওঠে যখন, আর সেই ঢেউয়ের মতো নিশপিশ করে ওঠা যখন নেমে আসে আঙুল বেয়ে, তখন আমি লিখি। কাটি, লিখি, আবার কাটি। লিখি। দেখি। কাটি। ভাবি। ভাবতে পারি না। আবার আজেবাজে লিখি। তারপর মুঠোদু'টো চোখের কাছে তুলে বলি, 'ভ্যানিশ'।

এর পরও যদি মুঠোয় কিছু লেগে থাকে, সেটাই আমার লেখা।

সেপ্টেম্বর ২০১২ 
(কেন লিখি বিশেষ সংখ্যা)

🍂

Post a Comment

0 Comments