সত্যজিৎ পড়্যা
আমার ভেতরে যে এক অদৃশ্য সুর বেজে চলে, তার উৎসে দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—এক অনন্ত আলোকবর্তিকা হয়ে।এ যেন আমার চিন্তার অন্তর্লীন মহাসমুদ্রে ঢেউ তোলা এক চিরন্তন জাগরণ। আমি যখন নিজের ভেতরে প্রবেশ করি, তখন অনুভব করি—আমার ভাষা, আমার বোধ, আমার অনুভব—সবকিছুর গভীরে কোথাও যেন রবীন্দ্রনাথের অমোঘ স্পর্শ রয়ে গেছে।
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”—এই পঙ্ক্তিটি যেন আমার চিন্তার মেরুদণ্ড।ভয়শূন্য চিত্তের যে দীক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা শুধু কবিতার অলংকার নয়; এটি এক জীবনদর্শন, এক দার্শনিক উচ্চারণ। আজকের এই জটিল, বিভ্রান্ত, অস্তিত্বসংকটময় সময়ে দাঁড়িয়ে আমি যখন নিজের পথ খুঁজে পাই না, তখন রবীন্দ্রনাথের শব্দরাশি আমার অন্তর্গত দিশারী হয়ে ওঠে।আমার ভেতরের অনুভূতিগুলো অনেক সময় ভাষাহীন হয়ে পড়ে, যেন এক নির্বাক ব্যাকুলতা। তখনই তাঁর কবিতার শব্দেরা এসে আমার নীরবতার অনুবাদ করে। “আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ”—এই সহজ অথচ গভীর উচ্চারণ যেন আমাকে শেখায়, প্রতীক্ষার মধ্যেও এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। আমি বুঝতে শিখি, জীবন শুধু প্রাপ্তির নয়,অপূর্ণতার মধ্যেও এক অনন্ত সৃষ্টির সম্ভাবনা নিহিত।রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে কোনো দূরবর্তী ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নন; তিনি আমার অন্তর্লীন চেতনার সহযাত্রী। যখন প্রকৃতির দিকে তাকাই—ঝরা পাতার শব্দ, বৃষ্টির ছন্দ, কিংবা সন্ধ্যার রক্তিম আকাশ—সবকিছুতেই তাঁর কবিতার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই।মনে হয়, প্রকৃতি যেন তাঁরই এক বিস্তৃত কাব্যগ্রন্থ, যার প্রতিটি পৃষ্ঠা জীবনের গভীরতম সত্যকে উন্মোচন করে।
🍂
“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে”
—এই আহ্বান আমার অস্তিত্বকে সাহসী করে তোলে। একাকীত্ব আর তখন ভয়ের নয়, বরং এক অন্তর্গত শক্তির উন্মেষ। আমি অনুভব করি,মানুষের প্রকৃত যাত্রা একাকী, কিন্তু সেই একাকীত্বেই রয়েছে আত্ম-আবিষ্কারের মহত্তম সম্ভাবনা।আমার চিন্তার ভেতরে যে দোলাচল, যে দ্বন্দ্ব, যে অস্থিরতা—সবকিছুর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ এক সুসমন্বয়ের দর্শন স্থাপন করেন। তাঁর সাহিত্য আমাকে শিখিয়েছে-বিরোধই শেষ কথা নয়; বরং বিরোধের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় সমন্বয়ের সুর। তাঁর শব্দবন্ধগুলো যেন একেকটি দার্শনিক সূত্র, যা আমার অন্তর্জগৎকে ক্রমাগত পরিশীলিত করে।কঠিন শব্দবন্ধে যদি বলি-রবীন্দ্রচেতনা আমার মানসলোকে এক প্রজ্ঞাপ্রদীপ্ত অনুরণন, এক আত্মদর্শী অভিজ্ঞান। তাঁর কাব্যধারা আমার অনুভবের অন্তঃসলিলায় প্রবাহিত এক অদৃশ্য স্রোত, যা আমার অস্তিত্বকে ক্রমাগত নবীকৃত করে। আমি যেন তাঁর ভাষার মাধ্যমে নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করি—এক অনন্ত আত্মপ্রত্যয়ের অভিযাত্রায়।২৫ শে বৈশাখ আমার কাছে তাই এক অন্তর্দীপ জ্বালানোর দিন। এই দিনে আমি শুধু তাঁকে স্মরণ করি না, বরং নিজের ভেতরের রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাই।আমার প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি অনুভব, প্রতিটি শব্দে তিনি যেন পুনর্জন্ম লাভ করেন।
“বহু দিনের পিরিত গো, বহু দিনের পিরিত”
—এই পঙ্ক্তির মতোই, আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোনো ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি নয়; এটি এক দীর্ঘস্থায়ী, গভীর, এবং আত্মিক বন্ধন। এই বন্ধন আমাকে প্রতিনিয়ত শুদ্ধ করে, নির্মল করে, এবং জীবনের প্রতি এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে।শেষ পর্যন্ত বলতে পারি—আমি যখন লিখি, তখন শুধু আমার কলম চলে না; আমার ভেতরে রবীন্দ্রনাথের সুর বেজে ওঠে।আমার চিন্তার প্রতিটি অনুরণনে, প্রতিটি শব্দের আড়ালে, তিনি এক নীরব সহচর হয়ে থাকেন। তাই ২৫ শে বৈশাখে আমি কোনো বাহ্যিক উদ্যাপনে নয়, বরং নিজের অন্তর্জগতে তাঁকে ধারণ করি-এক অনন্ত সাহিত্যসৃষ্টি, এক চিরন্তন আলোকধারা হিসেবে।
0 Comments