জ্বলদর্চি

অনুভবে রবীন্দ্রনাথ /তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য

অনুভবে রবীন্দ্রনাথ 

তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য 

গীতাঞ্জলির জন্য নোবেল পেলেন‌ কবি । উপনিষদের গভীর জীবন  তত্বের কাব্যিক ভাষ্য গীতালি গীতিমাল্য গীতাঞ্জলি র উপজীব্য। পাশ্চাত্যে এই ধারণা  একেবারে নতুন। জড়বাদী ও  বস্তুবাদী মানুষকে ভাবের ঘরে পৌঁছে দিলেন কবি, পৌঁছে দিলেন  'মহাবিশ্বে মহাকাশে  মহাকালমাঝে'। বুঝিয়ে দিলেন এক বিশ্বেশ্বর আছেন , আছেন এক 'সুরপতি  অসীম রহস্যে
 নীরবে  একাকী তব আলয়ে'। আর মানুষকে সেই দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়, অন্বেষণ করতে হয়, আত্মশক্তি দিয়ে, আত্মঅনুভব দিয়ে  বুঝে নিতে হয় --- ',আমি চাহি তোমা পানে  / তুমি মোরে নিয়ত হেরিছ, নিমেষবিহীন নত নয়নে।' 
অর্থাৎ এক নীরব  ঐশী শক্তির সঙ্গে কোলাহলমুখর  পৃথিবীর মানুষ যোগাযোগ রাখতে পারে এবং সেটা তার প্রাত্যহিকতার জীবনে, রোজনামচার মধ্যেই। এখানেই জড়বাদী জীবন হয়ে উঠতে পারে আনন্দঘন। জড়বাদী মানুষ বুঝল--- বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিহারো / সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো। আমি কে আর তুমি কে ----এই রহস্য যখন উন্মোচিত হোল গীতাঞ্জলিতে তখন সারা বিশ্বের মানুষই বুঝল  এটাই আসল জীবন । সাম্রাজ্যবাদ  আগ্রাসন,‌প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার দম্ভ অর্থের প্রাচুর্য জীবন নয়।  জাগতিক সুখ ক্ষণিকের মাত্র, এই ভাবসুখ ইন্দ্রিয় সুখের অতীত।  আর এই সুখই আনন্দ যা সেই পরম পিতা মানুষকে দেবার জন্য কখনো কখনো মাটিতে নেমে আসেন এবং তিনিও আনন্দিত হন  ---'তাই তোমার আনন্দ আমার 'পর / তুমি তাই এসেছো নীচে । শুধু নেমে আসা নয় ---নিজের প্রেম দিলেন সাধু জনকে আর তার প্রেম  নিলেন  ---'তাই তো প্রভু যেথায় এল নেমে / তোমারি প্রেম ভক্তপ্রাণের প্রেমে ,/ মূর্তি তোমার যুগল সম্মিলনে সেথায় পূর্ণ প্রকাশিছে।' এই 'যুগল সম্মিলন' যে সম্ভব , এর দ্বারাই পূর্ণতা আসে জীবনে,--- এই আনন্দবার্তা দিলেন  রবীন্দ্রনাথ।   ঐশী শক্তির সঙ্গে প্রেমের পূর্ণতার মতো  অপার্থিব অনুভূতিকে তিনি প্রকাশ করলেন পার্থিব হিসেবনিকেশ করা মানুষের কাছে এবং সেই মুহুর্তেই তিনি হয়ে উঠলেন অনন্য । 
🍂
       রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা আর একটি গান খুব ছোটো থেকে আমায় ধাক্কা দিত। কবি রবীন্দ্রনাথকে পড়তে গিয়ে তাঁকে  বিজ্ঞানী বা ভূগোলবিদ বা পুরাণবিদ মনে হোত। 'সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় ' কবিতাটি যেটি সঞ্চয়িতায় নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ  কবিতার ঠিক আগে রাখা হয়েছে। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের যে উচ্ছ্বাস  তাকে আমার মনে হয় যেন ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি  এবং তার পরবর্তী পৃথিবী গ্রহটির সজ্জা সৌন্দর্য গঠনের পরিপাটিময়তায়  কবি আকুল উৎফুল্লতা প্রকাশ করেছেন। সঙ্গে নিজের অন্তরের 'বাধা বন্ধনহারা' এক দৌড়, এক মুক্তি। প্রভাত সঙ্গীতের 'সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়' কবিতাটি যেন ঠাকুমার মুখে শোনা গল্পের কবিতা রূপ।  মহাবিশ্বে বা মহাশূন্য থেকে ব্রহ্মা  বিষ্ণু মহেশ্বরের ক্রিয়া কান্ডে পৃথিবী সৃষ্টির ধারাবিবরণী এই কবিতাটি।  কয়েকটি  পংক্তি উল্লেখ করতেই হয়--- 
দেশশূন্য কালশূন্য জ্যোতি:শূন্য  মহাশূন্য -'পরি 
চতুর্মুখ করিছেন ধ্যান। 
অর্থাৎ ব্রহ্মা র কথা বলছেন।
সমুদ্র মন্থনের কথা আছে পরবর্তীতে---
অতল মানসসরোবরে
বিষ্ণু দেব মেলিল নয়ন 
আলোককমলদল হতে
উঠিল অতুল রূপরাশি
ছড়ালো  লক্ষ্মীর হাসি খানি ---  

এর পরের স্তবকে  মহেশ্বরের ক্রিয়াকলাপ
জাগিয়া উঠিল মহেশ্বর 
তিনকাল ত্রিনয়ন মেলি 
হেরিলেন দিক্ দিগন্তর।

ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের ক্রিয়া কলাপ নিটোল  কবিতায় লিখলেন ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথ।  কিন্তু সেই কম বয়সের অনুভবে রবীন্দ্রনাথকে আমার  মনে হয়েছিল পুরাণবিদ রবীন্দ্রনাথ। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের  'বিশ্বপরিচয়'  গ্রন্থপড়ার পর বুঝলাম কবি রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানমনস্কতা। পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক গ্রহলোক, সৌরজগৎ  ভূলোক,   প্রভৃতি নিবন্ধের সঙ্গে পরিচিত হয়ে অনুভব হোল বিজ্ঞানের তত্ত্বও  আদিতত্ত্বর মধ্যে কবি কোনো পার্থক্য করেন নি। জীবনের শুরুর দিকে কৈশোরের উচ্ছ্বাসে  যা লিখলেন সহজ সরল ভাষায় জীবনের উপান্তে  এসে লিখলেন সেই রহস্যোমোড়া প্রশ্ন ---
'প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল  সত্তার নতুন আবির্ভাবে ---
কে তুমি । 
মেলেনি উত্তর ।

বৎসর বৎসর চলে গেল
দিবসের শেষ সূর্য 
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিম সাগর তীরে 
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়
কে তুমি
পেল না উত্তর।'

শ্যামলী কাব্যের 'আমি' কবিতা সেই চেতনা , ভাব ও বিজ্ঞান এর সম্মিলন।  বিশ্বপরিচয় গ্রন্থটি পড়লে রবীন্দ্র চেতনায় বিজ্ঞানের রূপটি বোঝা যায়। আবার 'রোগশয্যায় 'কাব্যগ্রন্থে মহা চৈতন্যের  মগ্নতা । লিখছেন ---
যে চৈতন্যজ্যোতি 
প্রদীপ্ত রয়েছে মোর অন্তরগগনে
নহে আকস্মিক বন্দী প্রাণের সীমানায়।


ঐ চৈতন্য বিরাজিত আকাশে আকাশে 
আনন্দ-অমৃত রূপে --- 

 উপনিষদের বাণী ---আনন্দরূপমমৃতম  যদ্ বিভাতি---।  তারই  কাব্যরূপ  পাই। অনুভবে পাই রবীন্দ্রনাথের বিশ্ব চেতনা তথা মহাবিশ্ব চেতনা। 

মন মোর মেঘের সঙ্গী /উড়ে চলে দিক দিগন্তের পারে  -- গান খানি তে কবি এক জায়গায় বলছেন 'বায়ূ বহে পূর্ব সমুদ্র হতে' নবম শ্রেণীর  অনুসন্ধিৎসু স্বভাব-বয়সের ছাত্রীর মনে  খটকা লেগে গেল রবীন্দ্রনাথ  কি ভাবে   জানলেন শ্রাবণের বর্ষায় পূর্ব দিক থেকেই বায়ূ বয়, পংক্তিটিতে এক অসাধারণ  আবহাওয়া বিজ্ঞানের কথা। আমার  অনুভব হোল এ কেবল কাব্য নয়, এ যে তথ্যও।  রবীন্দ্রনাথের এ তথ্যও জানা?

১২৮৫ থেকে ১৩০১ বঙ্গাব্দের মধ্যে ( সতেরো থেকে তেত্রিশ বছর বয়সে ) রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বিষয়ে নিবন্ধ 
 লিখেছিলেন ভারতী বালক সাধনা পত্রিকায় । সেখানে সামুদ্রিক জীব থেকে শুরু করে , দেবতায় মনুষ্যত্ব আরোপ, ইচ্ছামৃত্যু, থেকে ঈথর -- বিচিত্র বিষয়ে নিজের উপলব্ধি লিখেছেন।,  রবীন্দ্রনাথের  জানার আগ্রহ  যে কত বহুধা বিস্তৃত তার সার্বিক পরিচয় পাই এইসব নিবন্ধে। তিনি তো এক নিবিষ্ট পড়ুয়া। 
রবীন্দ্রনাথ কে ঘিরে এখন একটি নতুন অনুভবের সম্মুখীন হয়েছি --রবীন্দ্রনাথ কোন কোন বই পড়তেন। পড়ুয়া রবীন্দ্রনাথ কে জানার ইচ্ছা প্রবল।

Post a Comment

0 Comments