জ্বলদর্চি

রবীন্দ্রনাথের বাড়ি/কমলিকা ভট্টাচার্য


রবীন্দ্রনাথের বাড়ি

কমলিকা ভট্টাচার্য

পাড়ায় নতুন ভাড়াটে এসেছে। বহুদিন খালি পড়ে থাকা রমেশবাবুর বাড়িটা যেন আবার শ্বাস নিতে শুরু করেছে। রমেশবাবু স্ত্রীর মৃত্যুর পর বিদেশে ছেলের কাছে চলে গেছেন, কিন্তু যোগমায়ার স্মৃতি-ভেজা এই বাড়ি বিক্রি করতে পারেননি। যোগমায়া ছিলেন গানের মানুষ। পাড়ার ছেলেমেয়েদের নিয়ে অনুষ্ঠান, রেওয়াজ, রবীন্দ্রজয়ন্তীর মহড়া—এই বাড়িটা একসময় ছিল সুরের আসর।
তারপর সব স্তব্ধ হয়ে যায়।
নতুন ভাড়াটে আসার পর ভোরবেলা হঠাৎ আবার শোনা যেতে লাগল গান—
“আজি এ প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল প্রাণের পর …”
সূর্যের আলো আর কণ্ঠস্বর একসাথে পাড়া জাগায়। কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত কোমলতা, স্নিগ্ধতা যা পাড়ার প্রতিটি মানুষকে এক অদৃষ্ট আকর্ষণে টানত। জানলায় অনেকেই কান পাতত।
কৌতূহল বাড়ত—এই গলা কার? এত সুন্দর, মায়াবী।
বেলা বাড়লে শোনা যেত—
“আকাশ ভরা সূর্য তারা…”
দুপুরের নিস্তব্ধতায় সুর ভেসে আসত—
“আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে…”
বিকেলের আলো নরম হলে—
“বাজে করুণ সুরে…”
সন্ধ্যা নামলে—
“তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম…”
আর গভীর রাতে, প্রায় ফিসফিসে স্বরে—
“আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে…”
পাড়ার মানুষ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠল।
ভাড়াটে বাড়ির কেউই পাড়ার কারও সঙ্গে মেশেন না। ভদ্রলোক একা বাজারে যান, একা ফেরেন। কেউ কথা বলতে গেলে কেবল ভদ্র হাসি। অচিরেই বাড়িটার নাম হয়ে গেল—“গাইয়ে বাড়ি”।
🍂
কিন্তু কৌতূহল ছিল—কাকিমা কেমন? এত সুন্দর গান গায়।
রবীন্দ্রজয়ন্তী আসন্ন। পাড়ার ছেলেমেয়েরা ঠিক করল, এইবার তাঁকে অনুরোধ করতেই হবে। সবাই একসাথে গেল।
দরজা খুললেন ভদ্রলোক। শান্ত, গম্ভীর মুখ। সবাই অনুরোধ করল—“কাকিমাকে একবার ডাকবেন? উনি যদি আমাদের অনুষ্ঠানে গান করেন!”
ভদ্রলোক নীরবে হাত জোড় করলেন। যেন কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
ক্লাবের সেক্রেটারি বলল, “উনি যদি পেশাদার শিল্পী হন, পারিশ্রমিকের দরকার হলে আমরা ব্যবস্থা করব।”
ঠিক তখন লালু চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল—“কাকিমা! কাকিমা!”
ভদ্রলোক এবার থামালেন—“দাঁড়াও, কোথায় যাচ্ছ?”
সেই প্রথম তাঁর গলা সবাই শুনল—আর সেই গলা শুনেই সবাই অবাক। উঠোনে যেন শ্মশানের নীরবতা নেমে এলো। এত কোমল, এত মধুর—যেন নারীকণ্ঠ!
লালু হেসে বলল, “কাকু, এক ঝলক দেখে বলুন তো আমি মেয়ে না ছেলে? আমার নাম ললিতা। সবাই লালু বলে ডাকে।” তারপর বলল, “কাকু, আমরা করব চিত্রাঙ্গদা। আপনি না গাইলে চলবে না।”
ভদ্রলোক চুপ।
ললিতা বলল, “আপনি কি লজ্জা পান? আপনার গলাটা খুব আলাদা—সেই জন্য? কিন্তু আপনিই গান গাইবেন আমাদের অনুষ্ঠানে। অসুবিধা কী! আমরা করব চিত্রাঙ্গদা। আমি করব কুরূপার চরিত্র।”
ভদ্রলোকের চোখ ভিজে উঠল। ধীরে বললেন—
“আমার গলাটা পুরুষের মতো নয়। ছোটবেলা থেকে এই নিয়ে অনেক ঠাট্টা, অপমান সহ্য করেছি। তাই মানুষের সঙ্গে মিশি না। কিন্তু গান ছাড়তে পারিনি। গানেই আশ্রয় পেয়েছি।”
সবাই চুপ।
ললিতা এগিয়ে এসে বলল, “তাই তো আপনাকেই আমাদের দরকার, কাকু! আপনি না থাকলে চিত্রাঙ্গদা অসম্পূর্ণ।”
ললিতা জিজ্ঞেস করল, “কাকু, আপনার নাম?”
ভদ্রলোক বললেন—“রবীন্দ্রনাথ।”
অনুষ্ঠানের দিন ভোরে আবার ভেসে এলো—
“ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল…”
মঞ্চসজ্জা, আলোর ব্যবস্থা, মহড়া—সবকিছু যেন এক অদৃশ্য শক্তিতে মসৃণ হয়ে চলল।
অনুষ্ঠান শুরু হলো—
“মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো…”
তারপর চিত্রাঙ্গদা প্রবেশ করল। ললিতা যেন নিজের সত্তাকে খুঁজে পেল সংলাপে—
“আমি চিত্রাঙ্গদা, আমি রাজেন্দ্রনন্দিনী…”
ভদ্রলোকের কণ্ঠে উঠল—
“আমি নারী, আমি নারী—ক্ষমা দিয়ে করোনা অসম্মান, যুদ্ধে করো আহ্বান…”
সেই কণ্ঠে ছিল না লজ্জা, ছিল স্বীকৃতি। দর্শক নিঃশব্দ।
এরপর তিনি গাইলেন—
“আমার মুক্তি আলোয় আলোয়…”
মনে হলো, তিনি নিজের জীবনকেই গেয়ে উঠছেন।
একসময় ধ্বনিত হলো—
“পুরানো সেই দিনের কথা…”
যোগমায়ার স্মৃতি যেন ফিরে এলো বাড়ির দেওয়ালে।
শেষ পর্বে তিনি দাঁড়িয়ে গাইলেন—
“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে…”
এই গানে ছিল তাঁর জীবনের সারাংশ।
অনুষ্ঠান শেষে কেউ হাততালি দিতে ভুলল না, কিন্তু কারও চোখ শুকনো রইল না।
রাত গভীর হলে আবার ভেসে এলো—
“ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে, ও বন্ধু আমার…”
সেই রাতে পাড়ার মানুষ বুঝল—রবীন্দ্রনাথ শুধু কবি নন, তিনি মানুষের আত্মপরিচয়ের ভাষা।
যে মানুষটি নিজের কণ্ঠের জন্য সমাজ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, সেই কণ্ঠই তাঁকে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনল।
সেই বাড়িটা আর “গাইয়ে বাড়ি” নয়।
ওটা হয়ে উঠল—রবীন্দ্রনাথের অনুভবের বাড়ি।
কারণ সেখানে নামের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নন—
অনুভবের রবীন্দ্রনাথ বাস করেন।

Post a Comment

6 Comments

  1. AnonymousMay 09, 2026

    অনুভবের লেখা অনুভাবের লেখা রবীন্দ্রনাথকে কি ভোলার দিন এসে গেল? এইরকম লেখা মনে করিয়ে দেয় তিনি আমাদের আত্মার সাথী আত্মাকে বিচ্ছিন্ন করবে কে? 🙏🙏🙏

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMay 09, 2026

      খুব ভালো লাগে,কেউ তো একজন আছেন,যিনি আমার লেখা নিয়মিত পড়েন ও কমেন্ট দেন।অনেক অনুপ্রেরণা পাই।ভালো থাকবেন ,প্রণাম নেবেন।🙏

      Delete
  2. মুকুল মুখার্জীMay 10, 2026

    খুব সুন্দর লেখা, মন কে নাড়া দিয়ে যায়। তোমার গল্পের রবীন্দ্রনাথের অনুভূতি আর আমাদের অর্থাৎ আপামর বাঙালির অনুভূতিতে, ও আবেগে থাকা রবীন্দ্রনাথ - এ দুয়ের খুব সুন্দর মেলবন্ধন ঘটিয়েছে তোমার লেখা। রবীন্দ্রনাথের গলার স্বর কিন্তু সত্যি খুব কোমল ধরনের ছিল।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMay 10, 2026

      অনেক ধন্যবাদ।🙏

      Delete
  3. AnonymousMay 10, 2026

    😍😍😍😍😍😍 দারুন রবীন্দ্রনাথ

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMay 11, 2026

      Thank you.😍

      Delete