জ্বলদর্চি

দর্শনের আলোকে :অষ্টাদশ পর্ব /স্বাতী ভৌমিক

দর্শনের আলোকে
অষ্টাদশ পর্ব 

স্বাতী ভৌমিক 

             
(দর্শনের আলোকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

 কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধুমাত্র বিশ্বকবি নন, ওনার চেতনা বিশ্ব চেতনার সাথে সম্পর্কিত। চেতনার বিস্তারে তিনি বিশ্বচেতনার সাথে যুক্ত হয়েছেন। 

 কবিগুরুর জন্ম পরিচয়, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবনের সাথে অল্পবিস্তর সবাই সুপরিচিত। তাই বাঙালির ঘরের মানুষের ঘরের পরিচয় না দিয়ে সরাসরি চলে যাই- দর্শনের আলোকে রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত রূপের অপ্রকাশিত অনুভূতিপূর্ণ কিছু কথার আলোচনায়।

 মুক্তচিন্তার প্রবহমানতায় প্রাচ্যের সাহিত্যসংস্কৃতি ও দার্শনিক চেতনার সঙ্গে পাশ্চাত্যের ধারণা- চেতনার অভিনব মেলবন্ধনের পরিচয় পাওয়া যায়- রবীন্দ্রদর্শনে। শাস্ত্রীয় ব্যাখাকে আপন উপলব্ধির আলোকে নব রূপ দিয়েছেন। আধ্যাত্মিকতা ও আধিভৌতিকতার সামঞ্জস্যপূর্ণ তাত্ত্বিক মেলবন্ধন আমরা পাই- রবীন্দ্র আলোচনায়। 
🍂
 'ধর্ম' বলতে মানুষের সেবার প্রতি -মানুষের অসীম সত্তার প্রতি তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন-
" দেবতা নেই ঘরে,/ তিনি গেছেন যেথায় করছে চাষা চাষ......... খাটছে বারোমাস।"
কবিগুরুর মতে, মানবতাবাদ মানে মানব কল্যাণ। পরিপূর্ণ গৃহী এই মানুষটি একটি বিশেষ ধর্মীয় পরিমণ্ডলের মধ্যে লালিত পালিত হলেও ওনার কাছে মানবতাই ছিল প্রকৃত ধর্ম। কবিগুরুর গান, বহু কবিতার বিষয়বস্তু মানুষের হৃদয়ের দুঃখ-আনন্দ, মানবতা ইত্যাদি নানা অনুভূতি। ওনার রচনা উদ্যমহীন সংকুচিত মনে সাহস জোগায়, দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যেতে উদ্যম জোগায় - 
"উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
 ভয় নাই,ওরে ভয় নাই।
 নিঃশেষ প্রাণ যে করিবে দান,
 ক্ষয় নাই, তার ক্ষয় নাই।"
 তিনি যেখানেই মানুষ ও মনুষ্যত্বের অবমাননা দেখেছেন সেখানেই তিনি প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন।

 মানবতাকে মানুষের ধর্মরূপে উল্লেখ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ দুটি সত্তার কথা উল্লেখ করেছেন-জীব সত্তা ও মানব সত্তা। জীব সত্তা থেকে  জীবভাব ও মানবসত্তা থেকে মানব ভাব উৎসারিত হয়। স্বার্থযুক্ত মানুষের চিন্তাই হল জীবভাব কিন্তু স্বার্থযুক্ত চিন্তা অতিক্রম করে মানুষের সামগ্রিকভাবে চিন্তার মধ্যেই ফুটে ওঠে তার বিশ্বভাব- তথা মানবভাব। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন যে, মানুষ জীবরূপে বাঁচতে চায় তার বিভিন্ন প্রকার জৈবিক কামনা বাসনা নিয়ে, যা তার ক্ষুদ্রস্বার্থের সাথে জড়িত। কিন্তু জীবসত্তা মানুষের একমাত্র পরিচায়ক নয়।এর বাইরে মানুষের একটা দুর্লভ পরিচয় আছে-তা হল মানবসত্তা, সে বাঁচতে চায় মহান পরিচয় নিয়ে মানবতার মাধ্যমে। এই মানবসত্তাই মানুষের স্বার্থের বন্ধন শিথিল করে এবং আত্মত্যাগ ও আত্ম উপলব্ধিতে উদ্বুদ্ধ করে।

 তবে জীবভাবও কিন্তু অবহেলার নয়। মানুষের মধ্যে জীবভাব আছে বলেই তার মধ্যে বিশ্বভাবের আকাঙ্ক্ষা জাগে। আগে আসে ব্যক্তি মানুষের ধারণা, তারপর আসে বিশ্বমানুষের ধারণা। নিজেকে না বুঝলে কি অন্যকে বোঝা যায়!বিশ্ব মানবের চেতনার প্রেরণাতেই মানব তার ক্ষুদ্র স্বার্থের সীমা অতিক্রম করে আত্মার পরিপূর্ণতার দিকে অগ্রসর হয়। এই বোধ মানবের মধ্যে মহামানবের আবির্ভাব ঘটায়- রবীন্দ্রনাথ এই ভাবেরই প্রকাশ ঘটিয়েছেন ওনার গানের মধ্য দিয়ে - 
"সীমার মাঝে অসীম তুমি,বাজাও আপন সুর,
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।"

 রবীন্দ্রনাথ ওনার "Religion of Man"নামক গ্রন্থে মানুষের দুটি প্রকৃতির উল্লেখ করেছেন - দৈহিক প্রকৃতি যা বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষ লাভ করে, অপরটি হল আধ্যাত্মিক প্রকৃতি- যা আসে বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যমে। এই বুদ্ধিমত্তাই আধ্যাত্মিক উত্তরণের পথ সুগম করে। 

 প্রাথমিকভাবে মানুষ নিজেকে নিয়েই মত্ত থাকে। ক্রমে সে চায় তার সসীমতার সীমা অতিক্রম করে অসীমের দিকে এগিয়ে যেতে। যা মানুষের জন্য মানুষের চিন্তা করার মত ক্ষমতা প্রদান করে। রবীন্দ্রনাথ তাই ওনার "মানুষের ধর্ম" প্রবন্ধে বলেছেন-  "মানুষের দায় হল মহামানবের দায়, কোথাও তার সীমা নেই। " সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণাকে বিসর্জন দিয়ে কবিগুরুর দর্শন মহামানবের মিলন মঞ্চ গড়ার দিকে মানুষকে উৎসাহিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ মানুষকে ডাক দিয়ে বলেছেন -
" আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।"

 কবিগুরুর সৃষ্টি মানব অন্তরে দুঃখ- আনন্দ- হতাশা- সংকোচ-  সকল প্রকার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার শক্তি জোগায়। কবির লেখনী কখনো প্রতিবাদী সত্তা সৃষ্টির, কখনো বা শান্তির প্রলেপ প্রদানের উপাদান হয়ে ওঠে।

 কবিগুরু যখন বলেন -
" আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,/ চুনি উঠল রাঙা হয়ে।/ আমি চোখ মেললুম আকাশে,/ জ্বলে উঠলো আলো পুবে পশ্চিমে। "- তখন তিনি চেতনার কি অভূতপূর্ব দিকের কথাই না মানবহৃদয়ে জাগিয়ে তোলেন! মানবের মন স্পর্শ না করলে বাহ্যবিষয় শূন্যতারই নামান্তর হয়ে যায়। কী অপূর্ব দর্শন! মানব চেতনার সংস্পর্শেই বিষয়ের দৃশ্যময়তা।

 অনন্য চেতনার বহিঃপ্রকাশ হল- রবীন্দ্র চেতনা। মানবের সাথে মহামানবের অনুভূতির এক মহান সেতু হল- রবীন্দ্র রচনা। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, মানব হৃদয়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতি কোন কিছুই বোধ হয় বাদ যায়নি কবি গুরুর মানবসত্তার উপলব্ধি থেকে। তাই তো তিনি বিশ্বকবি-বিশ্বমানবের হৃদয়ের কবি- প্রাণের কবি। ভাবের বিহ্বলতায় কবিত্বের অনন্য এক চেনা মানুষ- সকলের কবিগুরু- আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।।

 ক্রমশঃ....

Post a Comment

0 Comments