জ্বলদর্চি

রবীন্দ্রনাথ - আমার অনুভবে/মলয় সরকার


রবীন্দ্রনাথ - আমার অনুভবে

মলয় সরকার

রবীন্দ্রনাথ যে কখন আমার অনুভূতিতে প্রবেশ করেছিলেন আমার ঠিক মনে পড়ে না।এটা ঠিক,  একটা শিশু যেমন জন্মের পরে নিজের চারিপাশ আত্মীয়স্বজন দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, সেই রকম। তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়,কবে থেকে তুমি তোমার মাকে বা বাবাকে চেনো, সে যেমন বলতে পারবে না, আমার অবস্থাটাও অনেকটা সেরকমই। আসলে রবীন্দ্রনাথ আমার ভিতরে প্রবেশ করেছেন এমন সময়ে, যখন আমার মন তাঁকে বিরাট বড় মানুষ বা কবি  বা অন্য কিছু এই সব নিয়ে ভাবতে শেখে নি।আর পাঁচটা সাধারণ আত্মীয় পরিজনের বা প্রয়োজনীয় জিনিসের মতই মনের সঙ্গে তিনি ধীরে ধীরে পাকে পাকে জড়িয়েছেন।  
যদি আরও একটু কাটা ছেঁড়া করি, তখন আমার যেন মনে হয়, সেই ছোটবেলায় রবিবারের সকালে ইন্দিরাদির পরিচালনায় ছোটদের জন্য ‘শিশুমহল’ অনুষ্ঠান হত রেডিওতে।  এই আসরের আমরা ছিলাম একনিষ্ঠ এবং নিয়মিত শ্রোতা। এই আসরের ঠিক আগেই হত, পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গীত শিক্ষার আসর। সেখানে উনি শেখাতেন রবীন্দ্রসঙ্গীত। কোন একদিন ভুল করে শিশুমহলের আগে রেডিওটি খোলা হয়ে যায় এবং আমার কানে তখন পঙ্কজ মল্লিকের সঙ্গীত শিক্ষার আসরের আওয়াজ কানে আসে।সেই অল্প সময়েই ওনার শেখানোর ঢঙে আর সঙ্গীতটির সুরের যাদুতে আমি এমনই মুগ্ধ হয়ে যাই, যে তার পর থেকে আর, ভুল করে নয়,  ইচ্ছা করেই সঙ্গীতশিক্ষার আসরের আগেই রেডিও খোলা হতে শুরু হয়।পর পর দুটি অনুষ্ঠান একসঙ্গেই শুনতাম। তখন আমি খুবই ছোট, হয়ত ছয় সাত বছর বয়স হবে। তখন এই রেডিও সকলের বাড়িতে থাকতও না।
🍂
যাই হোক, সেই সময় থেকেই তাঁর সঙ্গে বিশেষ পরিচিতি না থাকা সত্বেও এই সুর আর গানের সঙ্গে কেমন করে যেন মনের গভীরের একটা যোগসূত্র তৈরী হয়ে গিয়েছিল। তার পরে পরে অল্প অল্প করে নানা ভাবেই রবীন্দ্রনাথ ঢুকতে থাকেন আমার ভিতরে, ঠিক যেমন করে একটা চারাগাছ, ধীরে ধীরে তার শিকড় ছড়িয়ে দেয় ধরিত্রীর বুকের ভিতরে এবং আহরণ করে তার রস নিজেকে পুষ্ট করার জন্য। 
ধীরে ধীরে যত দিন গেছে আমিও সর্বান্তকরণে জড়িয়ে ধরেছি তাঁকে,  আমার নিত্যদিনের কাজে কর্মে ভাবনা- চিন্তায়। তবে এর পরের ধরা একটু অন্যভাবে। চেষ্টা চলে নিরন্তর তাঁর বিভিন্ন প্রতিভা গুণ বোধ সৃষ্টি চিন্তা, নানা বিষয়ে ও নানাদিকে যেভাবে ব্যাপ্ত ছিল তার আত্তীকরণ করতে।
সমস্যা হচ্ছে এটাই, আমি যে দিকটাই ধরতে যাই, দেখি যে, সেদিকেই তিনি দাঁড়িয়ে আছেন উত্তুঙ্গ হিমালয়ের মত, যাতে আরোহণ কেন, পূর্ণদৃষ্টি দেওয়াও আমার পক্ষে অসম্ভব বলে মনে হয়েছে। 

খুব সাধারণ একটা ব্যাপার;  যখন ভাবি,  আজ থেকে একশ বছর আগে  একজন পরাধীন নিপীড়িত অখ্যাত দেশের কবি তৎকালীন সময়ে ভ্রমণ করেছেন পাঁচটি মহাদেশের প্রায় ত্রিশ বা পঁয়ত্রিশটি দেশ, এবং সেগুলিও যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গে, হয় সরকারী নিমন্ত্রণে কিংবা বিশিষ্টজনের আমন্ত্রণে, মনটা ভাবনায় ডুবে যায়। কোথায় পৃথিবীর শেষপ্রান্তে আর্জেন্টিনা,  সেখানেও ছিলেন তাঁর গুণগ্রাহীরা। যখন প্রযুক্তি এত উন্নত হয় নি, কি করে তা সম্ভব ছিল! কি করে সম্ভব ছিল তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ছেড়ে বিশ্বের জ্ঞানীগুণীদের আগমন! আজকের, আমাদের দেশের কোন মানুষের পক্ষে কি এগুলো কল্পনাতেও সম্ভব? 
একটা মানুষের কতগুলো গুণ থাকা সম্ভব জানি না। তাঁর মধ্যে চিত্রাঙ্কণ, ভাস্কর্য, সাহিত্য, সঙ্গীত, নাটক, ছাড়াও কৃষি, রাজনীতি, অর্থব্যবস্থা, সমাজউন্নয়ন ইত্যাদি কত বিষয়ের পারদর্শিতা যে একসঙ্গে কি করে জায়গা নিয়েছিল, তা বোঝা খুবই মুস্কিল। 
সেদিন পড়ছিলাম সদ্যপ্রয়াতা সনজিদা খাতুনের রবীন্দ্রসঙ্গীতের উপর লেখা। যদিও এ ব্যাপারটি আগেও পড়েছি, তবু যতবার পড়ি ততবারই ভাবনার বৃত্তে ঘুরপাক খাই। ব্যাপারটি হল, একটি গান যখন উনি লিখছেন, তখন কোন শব্দ সঠিক কোন খানে বসা উচিত সে তো কাটাকুটি করে ঠিক হল ( সে না হয় সব কবিই করেন),  এবার সুর দিতে গিয়ে কোন শব্দকে ফোটাতে হবে, তার জন্য কোন স্বর লাগা উচিত, তাই নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে হয়ত রাগের প্রয়োগের কিছু পরিবর্তন করলেন,  বা সেই শব্দকে আবার পাল্টালেন, এই ভাবে বহু গবেষণার ফসল হত একটি গান। ফলে একটা গানের সুর হয়ে বেরোতে তার উপর চলত অনেক গবেষণা কাটাছেঁড়া। সেই কাটা ছেঁড়াই যে একটা চিত্রকল্পের জন্ম দিতে পারে তাই বা কে জানত।
ভাবি, তাহলে আজ যাঁরা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে অন্য ভাবে গাওয়ার চেষ্টা করছেন, তা কি করে সম্ভব হতে পারে! তিনি আবার এরকম গান কবিতা প্রবন্ধ গল্প কত অনর্গল লিখে গেছেন যার হিসাব দুঃসাধ্য।
এত চিঠিই লিখে গেছেন যে,  আজও পত্রিকারা তাঁর অপ্রকাশিত চিঠি প্রকাশ করে যাচ্ছেন। তাঁকে চিঠি লিখে উত্তর পান নি এমন বোধ হয় উদাহরণ নেই।তার মধ্যে অনেকের আবার নানা বায়নাও থাকত। যেমন ছোট্ট সত্যজিতকে লিখে দিয়েছিলেন, “ বহুদেশ ঘুরি–” কবিতাটি। এভাবেও রচিত হয়েছে কত গান, কবিতা। ভাবা যায় কি, পরিণত বয়সে এসে চিত্রশিল্পে নিয়ে চেষ্টা শুরু করে এক নতুন ধারারই জন্ম দিয়ে ফেললেন।

আবার যদি ভাবি, তাঁর বিশ্বভারতীতে এত সঠিক মানুষকে সারা পৃথিবী খুঁজে জোগাড় করা,যাঁরা প্রত্যেকেই দিকপাল, এ- ই বা সম্ভব হল কি করে! তাঁর ছাত্ররাও সে মুজতবা আলি, কিংবা প্রমথ নাথ বিশী বা যে-ই হোন অনেকেই দেশ কালের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন নানা ক্ষেত্রে। 
বদনাম পেয়েছেন প্রচুর, দেশে বিদেশেও। তবু অটল থেকেছেন নিজস্ব কর্তব্যে নিষ্ঠায়।তাঁর নোবেল প্রাপ্তিতে তো বাঙালীসুলভ অসূয়াবাক্যবাণে জর্জরিত হতে হয়েছে ভীষণভাবে। এ ছাড়া তাঁকে আরও অনেক জায়গাতেই অনেক ভাবে অপমানে বিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ তিনি যেন নীলকণ্ঠ, স্থিতপ্রজ্ঞ, এক ঋষি। 
জাতীয় চেতনার ডাকে তিনিই প্রথম শহীদমিনারের পাদদেশকে বক্তৃতামঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। এক কথায় জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নাইট উপাধি ত্যাগ করলেন। আর কেউ কি পেরেছেন এরকম মনের জোর দেখাতে? আজ সব বিদ্বজ্জনেরা বা অনেকেই একটা খেতাবের জন্য লালায়িত হয়ে যা খুশী করেন, সেখানে তাঁর এই ঘটনার মান কত উচ্চতায় তা পরিমাপযোগ্য কি?
আমি নিজে অনেকবার গিয়েছি, যাই, তাঁর বাড়ি জোড়াসাঁকোতে কিংবা শান্তিনিকেতনে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ঋতুতে। এটা কেবল আর কোন কারণে নয়, তাঁকে অনুভব করতে, তাঁর বিশালত্বকে আত্মস্থ করতে।
তিনি এমন সাহিত্য এমন সঙ্গীত রচনা করলেন, সারা পৃথিবীতে শুধু আদৃত নয় অনুদিত হল বিভিন্ন ভাষায়। আজ এমন সভ্য দেশ খুঁজে পাওয়া মুস্কিল যেখানে তাঁর লেখা কোন না কোন বই পাওয়া যাবে না। 
সব থেকে বড় কথা, মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শুয়েই জীবনের শেষে ওই রকম একটি কবিতা শুধু মুখে মুখে রচনা করে ফেললেন।
এমন মানুষকে আমার মত ক্ষুদ্র মানুষ অনুভব করবে কি করে!
আমি দেখেছি, আমার চেয়েও বড় যে সমস্ত পণ্ডিতেরা তাঁকে বিশ্লেষণ করতে চেয়েছেন বা চেষ্টা করেছেন, অনেকেই যথেষ্ট হিমসিম খেয়েছেন তাঁর সম্বন্ধে ধারণা তৈরি করতে। 
রবীন্দ্রসঙ্গীতকে অনেকেই দেবমন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেন, এবং সেই হিসাবে,  ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে তাঁকে দেবতার আসনে বসান। আমরা অনেকেই লক্ষ্য করেছি, সাধারণতঃ মানুষের মনে এমন কোন অবস্থার সৃষ্টি হয় না যেখানে কোন না কোন রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রযোজ্য নয়। তখনই রজনীকান্তের কথা মনে হয়,
‘তুমি আমার অন্তঃস্থলের খবর জানো,  ভাবতে প্রভু আমি লাজে মরি’।কিংবা তাঁর কথাতেই মনে হয়
‘কে গো অন্তরতর সে
    আমার চেতনা আমার বেদনা তারি সুগভীর পরশে॥’

তাই, তাঁর বিশালত্বের কাছে অবনত হয়ে তাঁর রচনা, তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি বা চরিত্রসৃষ্টি,( যা বহু লৌকিক জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের ফসল,) সেগুলোর ব্যাপারে,  তাঁর কাছেই প্রার্থনা করি,  সেই শক্তি যেন লাভ করি, যাতে তাঁর সৃষ্টির মর্মার্থ কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারি।

Post a Comment

0 Comments