জ্বলদর্চি

অনুভূতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর /দীপশ্রী সেনগুপ্ত



অনুভূতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

দীপশ্রী সেনগুপ্ত 


 এই রিমলি, তোর  পঁচিশে বৈশাখের ফাংশানের নাচ প্র্যাকটিস হয়ে গেছে ?
'রোজ ই তো করছি মা,  সময় পেলে ই করছি'।
'দেখো, পড়াশোনা র  ক্ষতি কোরোনা যেন,  এসো হে বৈশাখ নাচটা  দিদি মণি যেমন তুলিয়েছেন তেমন করেই কোরো।'
রিমলি ক্লাস টু তে পড়ে,  পাড়ার রবীন্দ্র -জন্মোৎসবে  ওকে নাচতে হবে। ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি দেখেছে, একটু একটু জানে ওঁর কথা। খুব ছোট বেলায় বাড়িতে আরো অনেক মহাপুরুষের ছবি র সাথে রবীন্দ্রনাথ কে ও  চিনিয়েছিলেন মা 'এই দেখ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর '।
'বেশ! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!  তবে ওনার পোশাক এরকম কেন ? এরকম পোশাক তো কাউকে পরতে দেখেনি রিমলি! আর  বৈশাখ মাস কে আসার জন্য এত সাধাসাধি করার ই বা কি আছে ?'
  ক্রমশঃ বড় হতে হতে রিমলি দেখে পড়াশোনা, নাচ, আবৃত্তি সবেতেই রবি ঠাকুরের মহা সমারোহ ; তখন বোঝা না বোঝার আলো-আধারি তে  কেটে গেছে কত দিন, কত রাত। আজ , এখন, ও ওর নিজের অনুভূতি তে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে লিখতে বসেছে,  লিখতে গিয়ে ওর মনে হচ্ছে কবে, কোন শুভ দিনে অথবা কত দিন ধরে সেই  ছায়া ছায়া আলো মিলিয়ে গেছে, হয়েছে চেনা, দেখা হয়েছে নতুন করে, সেই সব দিন ক্ষণ মনে নেই; মনে নেই প্রথমে ঠিক কেমন লেগেছিল অনাস্বাদিত উন্মোচনের আশাতীত মূহুর্ত ! তবে  মনে আছে  তখন  যেন 'ঝলমল  করে চিত্ত ', ঠিক যেমন তিনি লিখে রেখে গেছেন,  ঠিক যেমন ভাবে বলেছেন '  কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখীর গান'_ তেমন করে নিজেকেই ওর নিজের কাছে আশ্চর্য, পরমাশ্চর্য লেগেছিল; আফশোস হয়েছিল কিছুটা  এতদিন দেরী হল কেন বুঝতে ?
রিমলির  খুব মজা লাগে, যখনই ওর  আনন্দ হয়, অমনি 'হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মত নাচেরে'। যেই  দু:খ, সঙ্গে সঙ্গে ' ও চাঁদ, চোখের জলে র লাগলো জোয়ার '। পরীক্ষা র রেজাল্ট ভাল হয়নি, বাবা র মুখ গম্ভীর, অমনি 'দীপ নিবে গেছে মম'। অসহ্য গরমে 'দারুণ অগ্নি বাণে রে', ঝুম বর্ষা রাতে  'নিশীথ রাতের বাদল ধারা '।পাড়ায় ওর এক ক্রাশ আছে, আসা যাওয়ার পথে তার  চোখে চোখ পড়লে 'এসো নীপবনে, ছায়াবীথি তলে '। একেবারে অনায়াসে ওর ভেতরে গান বাজে, রবি ঠাকুরের গান।
তবে শুধু কি গান ? কবিতার কথা ও তো বলতে হয়! ছোট বেলায় 'হাট' কবিতা মুখস্থ করতে বসে বারবার আবৃত্তি করেছে ' পাড়ার ছেলে স্নানের ঘাটে, জল ছিটিয়ে সাঁতার কাটে'- রিমলি যদি একবার  অমন করে স্নানের ঘাটে জল ছিটিয়ে সাঁতার কাটতে পারতো! স্কুলে, কলেজে, পাড়ায় ফাংশান এ আবেগমথিত গলায় কখনো 'প্রশ্ন', কখনো আফ্রিকা, কখনো দেবতার গ্রাস, কখনো পূজারিণী। 
🍂
আর নাটক? ডাকঘর, অচলায়তন,  রক্তকরবী - পড়া আর অভিনয়, দুই ই ছিল, পরতে পরতে খুলে  গেছে রহস্যাবৃত জগতে র আবরণ। কতবার কল্পনায় নিজেকে ডাকঘরের 'অমল' ভেবেছে, এখন ও ভাবতে ভাল লাগে ওর।
তবে বলতেই হয়, নৃত্যনাট্য, আবৃত্তি, নাটক, পড়াশোনা র চর্চা য় ক্রমশঃ রবীন্দ্রনাথ ওর কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছেন। বাড়ি র অনুকূল পরিবেশ ও উঁচু তারে মন কে  বেঁধে রাখতে সাহায্য করেছে,  তাই 'ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু,  আকাশ ভরা সূর্য তারা ', অথবা 'চিরসখা হে, ছেড়ো না মোরে '  কোনো টাই  দুরুহ, অবোধ্য মনে হয় নি, বরং সঠিক সংগত করেছে ওর মনে।
 উপন্যাসে র কথা তো বলা ই হয়নি। বাড়িতে বাবা, কাকা দের প্রশ্রয়ে স্কুলের নীচু ক্লাস থেকে ই একের পর এক 'বড়দের ব ই' শেষ!  যোগাযোগ, চোখের বালি, নৌকাডুবি , রাজর্ষি সব সব একেবারে গোগ্রাসে গেলা! প্রথম হোঁচট 'গোরা' পড়তে গিয়ে। তখন ক্লাস ফাইভ, বার দুয়েক 'গোরা' পড়বে বলে শুরু করেছে, আবার রেখে দিয়েছে। ফের ক্লাস নাইনে আবার 'গোরা'!  মাঝে মাঝে মনে হয়েছে রেখে দেওয়ার কথা, কিন্ত অধ্যবসায়ী রিমলি হাল ছাড়েনি -  পাতার পর পাতা ধৈর্য সহকারে পড়া যখন শেষ তখন পুণ্যস্নান!  তখন অন্তরে সব খোলস, সব আবরণ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে নির্মোহ, নিটোল মানবতা বাদ। ঐ বয়সে, ও সময়ে ওর ইচ্ছে হয়েছিল  গিরি চূড়ায় উঠে দু' হাত প্রসারিত করে সারা পৃথিবীকে ডাক দিয়ে যায় - দেখ, শোন,  তিনি কী লিখে রেখে গেছেন, তাঁর উপলব্ধি তে উপলব্ধ হ ও। 
কিন্তু  কোলকাতা শহরে  গিরি চূড়া কোথায় ? তাই বেশ কয়েক মাস, বছর ধরে 
'এ মোহ আবরণ খুলে দাও'।
  'ছুটি'   বার বার পড়ে  আশ মেটেনি কোনদিন।'দেনা পাওনা ' , গিন্নি, 'শাস্তি' 'মণিহারা',  মধ্যবর্তিনী,  অসংখ্য গল্পের সম্ভারে মনের উত্তরণ, ভাষার দক্ষতা, চিন্তা র সাবলীলতা, বহুমাত্রিক উদ্ভাসে পরিশীলিত হয়েছে  মেধা ও মনন।
  তাঁর শিক্ষা বিষয়ক প্রবন্ধ  পড়লে বোঝা যায়, তিনি  সময়ের থেকে কতটা এগিয়ে ছিলেন।  বিদ্যা গৃহের কারখানা য় তৈরি গতানুগতিক  শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্র, ছাত্রী  সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব কোথাও নিজের অবদান রাখতে পারে না, সবার জন্য এক ধারা র শিক্ষা ব্যবস্থা উপযুক্ত নয়, মেধা, আগ্রহ, ক্ষমতা অনুযায়ী  ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন ধারার শিক্ষা য় সমাজ উপকৃত হয়। সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিভিন্ন স্তরে র উপযোগী কাজে র প্রয়োজন,  এক ই কাঠামোয়, এক ধরনের শিক্ষা তাই সামগ্রিক অপচয়। আগ্রহ সহকারে  বারবার রিমলি পড়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অভিমত, সব সময়  হয়তো একমত হয়নি, কিন্তু  অবশ্যই  যৌক্তিকতা, ও উদ্ভাবনী র দিক দিয়ে এব্যাপারে ও মুগ্ধ। সমাজে তোতা দের কাহিনী  বন্ধ হবে কবে ?
 রিমলি কে আমি চিনি, সে বলেছে, সারাজীবন  রবীন্দ্রনাথের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে, তিনিই জানিয়েছেন,  মানবতা কে যদি জাতীয়তাবাদ  খর্ব করে, তবে সেই উগ্র জাতীয়তাবাদ  মানুষের জন্য বিপজ্জনক।  দেশ তো শুধু মাটি, জল,  পাহাড়, গাছপালা দিয়ে গড়া নয়; মানুষ ও আছে, মানবসম্পদ! সব দেশে সব কালে  ভূ-সম্পদ ও মানব সম্পদ দুই ই  উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রকোপে ধ্বংস হয়ে যায়; সেটি অকল্যাণ!
বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম, রাজনীতি, এমন কোন বিষয় নেই ,যে বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ  লেখেননি; তবে রিমলি কিন্তু  বুঝতে পেরেছে,  ও কিন্তু মর্মে মর্মে জানে  তাঁর সৃষ্টির মূল সুর মানবতা বাদ, মানুষ ! 'মানুষের ধর্ম ' বা ' 'Religion of Man' ব ই' তে সেটি সুস্পষ্ট। 'পিতা নোহসি' বলতে উপনিষদ যা বলতে চায়, তিনি মানুষের মধ্যে ই তাঁকে দেখেছেন; সবখানে তাঁর আসন পাতা', উপনিষদ ও ঠিক  সেটি ই বলে।
  অনুভূতি তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখতে গিয়ে  ও বলতে চায়, ও জানে  তিনি ই রিমলিকে পরিপূর্ণ ভাবে অনুভূত করেছেন, না হলে  তার  আনন্দে, দু:খে, সহমর্মিতা য়  তিনি গান বা কবিতা হয়ে বেজে ওঠেন কি করে? লিখতে গিয়ে  উদ্ধৃতি হয়ে তিনি ই  আসেন কেন ?   তিনি পিতা,  তিনি বন্ধু,  তিনি সখা, তিনি প্রাণের মানুষ।   তিনি ই জীবন -মরণের সীমানা ছাড়িয়ে  বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

 তবে আজ অনেক লিখে ফেলেছে   ও কুড়েমি ছেড়ে। আর লিখতে ইচ্ছে করছে না, এবার ওকে খাতা, পেন গুটিয়ে উঠে পড়তে হবে,  আরাম করে গল্পের বই নিয়ে বসতে হবে, এবার  রিমলি হাঁফ ছেড়ে মনে মনে বলবে, 
'আ:, বেঁচেছি এখন,  শর্মা ওদিকে আর নয়, গোলেমাল ফাঁক তালে পালিয়েছি  কেমন '(বাল্মীকি প্রতিভা)।

Post a Comment

0 Comments