তাপস বিশ্বাস
বিংশ শতাব্দীর বিশ্বচলচ্চিত্রের মানচিত্রে বাঙালির পরিচয়কে যিনি হিমালয়সম উচ্চতায় বসিয়েছিলেন, তিনি সত্যজিৎ রায়। কিন্তু কেবল 'ফিল্মমেকার' তকমাটি তাঁর বিশালত্বের সামনে অত্যন্ত সংকীর্ণ। তিনি ছিলেন এক রেনেসাঁ পুরুষ। আজ যখন আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা ও স্মরণে স্মরণ করি, তখন কেবল তাঁর সিনেমার দৃশ্যপট নয়, বরং তাঁর জীবনদর্শন, তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধ এবং সৃষ্টির প্রতি তাঁর যে অবিচল সততা— তাকে ফিরে দেখা জরুরি।
তুলি ও কলমের সখ্য:
সত্যজিতের সৃষ্টিশীল সফর শুরু হয়েছিল বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায়, ‘ডিজে কিমার’-এর আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে। সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল তাঁর অসাধারণ সব ক্যালিগ্রাফি এবং অলঙ্করণ। আজ আমরা যে 'রে রোমান' বা 'রে বিজার' ফন্টের কথা বলি, তা তাঁরই গ্রাফিক সেন্সিবিলিটির ফসল। তিনি যখন বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকতেন, তখন কেবল রঙের ব্যবহার করতেন না, বরং মলাটের ভেতর লুকিয়ে থাকা গল্পের আত্মাটিকে ফুটিয়ে তুলতেন।
তাঁর সাহিত্যকর্মের কথা বললে প্রথমেই আসে 'ফেলুদা' এবং 'প্রফেসর শঙ্কু'-র নাম। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, তাঁর ছোটগল্পগুলোতে এক অদ্ভুত আধিভৌতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ছোঁয়া থাকত। মানুষের অবচেতন মন কীভাবে কাজ করে, তা তিনি খুব সহজ ভাষায় অথচ গম্ভীর আবহে পরিবেশন করতেন। তাঁর লেখায় এক ধরণের গাণিতিক পরিমিতিবোধ ছিল— একটি শব্দও অতিরিক্ত নয়, আবার কোনো বর্ণনাই অসম্পূর্ণ নয়।
সুরের জাদুকর সত্যজিৎ:
সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে সংগীত কেবল আবহ হিসেবে আসেনি, বরং এসেছে একটি স্বতন্ত্র চরিত্র হিসেবে। ‘পথের পাঁচালী’তে রবিশঙ্করের সেতারের সুর যখন বৃষ্টির ফোটার সাথে মিলে মিশে যায়, তখন তা দৃশ্যকে এক অন্য মাত্রা দেয়। পরবর্তীতে যখন তিনি নিজেই নিজের ছবির সুরকার হয়ে উঠলেন, তখন আমরা দেখলাম এক অন্য সত্যজিৎকে। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল এবং ইন্ডিয়ান রাগের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটাতেন তিনি। 'গুপী গাইন বাঘা বাইন'-এর কথা ধরা যাক— সেখানে সংগীত কেবল বিনোদন নয়, বরং শোষণের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী অস্ত্র।
তাঁর সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম ছিল এক একটি স্কেচ। শ্যুটিংয়ে যাওয়ার আগে তিনি তাঁর বিখ্যাত 'লাল খাতা'য় পুরো ছবির শট-ডিভিশন এবং দৃশ্যবিন্যাস এঁকে ফেলতেন। একেই হয়তো বলা যায় একজন সত্যিকারের 'অটোয়ার' (Auteur)-এর পরিচয়, যেখানে শিল্পের প্রতিটি বিভাগ তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকত।
🍂
মানুষ হিসাবে সত্যজিৎ:
আমরা প্রায়ই তাঁর কাজের প্রশংসা করি, কিন্তু মানুষ হিসেবে তাঁর সেই ঋজু ব্যক্তিত্ব এবং শৃঙ্খলার বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। সত্যজিৎ ছিলেন আপাদমস্তক একজন 'অ্যানালিটিক্যাল' মানুষ। তিনি আবেগের বন্যায় ভাসতেন না, বরং আবেগকে নিয়ন্ত্রিত ভাবে প্রকাশ করতেন। ‘অপুর সংসার’-এ অপর্ণার মৃত্যুর পর অপুর সেই ভাঙন কিংবা ‘চারুলতা’র সেই একা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা— এই দৃশ্যগুলোতে যে নিস্তব্ধতা আছে, তা হাজারটা সংলাপের চেয়েও শক্তিশালী।
তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল 'হিউম্যানিজম' বা মানবতাবাদ। কোনো মানুষই তাঁর কাছে কেবল সাদা বা কালো ছিল না। তিনি চরিত্রের ধূসর এলাকাগুলোকে খুব যত্ন করে আঁকতেন। 'নায়ক' ছবিতে অরিন্দম মুখার্জির সেই অন্তর্দহন কিংবা 'জনঅরণ্য'র সোমনাথের নৈতিক অবক্ষয়— সত্যজিৎ প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমাজের আয়না হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
প্রযুক্তির যুগে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা:
আজকের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ভিএফএক্স-এর যুগে সত্যজিতের প্রাসঙ্গিকতা কি ফুরিয়ে গেছে? উত্তরটি হলো— না। বরং আজ তাঁর প্রয়োজন আরও বেশি। আজকের সিনেমা যখন চটকদার ভিজ্যুয়ালের ওপর নির্ভরশীল, তখন সত্যজিৎ আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে গল্পে এবং চরিত্রের সত্যতায়।
একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন।
"আমি এমন ছবি বানাতে চাই সহজ কিন্তু অগভীর নয়।"
এই সহজ অথচ গভীর হওয়ার শিল্পটিই আজকের সৃজনশীল মানুষেরা শিখতে পারেন তাঁর কাছ থেকে। তাঁর চলচ্চিত্রে যে পরিমিতিবোধ (Restraint) ছিল, তা আজকের কোলাহলপূর্ণ সময়ে এক পরম শান্তি।
সত্যজিৎ অমরত্বের পথে:
১৯৯২ সালে অস্কারের জীবনকৃতি সম্মান পাওয়ার সময় হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও তাঁর সেই ম্লান অথচ দীপ্তিময় হাসিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়— শিল্পী হয়তো চলে যান, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি অমর। সত্যজিৎ রায় কোনো বিশেষ কাল বা ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ নন। তিনি প্রতিটি বাঙালির ড্রয়িং রুমের ফেলুদা, তিনি প্রতিটি কিশোরের কল্পনার শঙ্কু, আর বিশ্বের প্রতিটি চলচ্চিত্র প্রেমীর কাছে এক জীবন্ত পাঠ্যবই।
আজকের এই বিশেষ ক্ষণে তাঁকে কেবল ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোই যথেষ্ট নয়; বরং তাঁর সৃষ্টির সেই সততা, শৃঙ্খল এবং আধুনিকতাকে যদি আমরা নিজেদের জীবনে কিছুটা হলেও প্রতিফলিত করতে পারি, তবেই তাঁর প্রতি আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। বিষাদ নয়, বরং তাঁর রেখে যাওয়া অসামান্য সৃষ্টির উদযাপনেই বেঁচে থাকুক 'মানিক দা'।
তাঁর বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ দেয়:
সিনেমা: ৩৩টি কাহিনিচিত্র ও তথ্যচিত্রের নির্দেশনা।
সাহিত্য: ফেলুদা, প্রফেসর শঙ্কু এবং একাধিক ছোটগল্প।
সঙ্গীত: নিজ চলচ্চিত্রের সুরারোপ ও লোকজ সুরের ব্যবহার।
শিল্পকলা: বইয়ের অলঙ্করণ, লোগো ডিজাইন ও ক্যালিগ্রাফি।
পুরস্কার: অস্কার (জীবনকৃতি), ভারতরত্ন, লিজিয়ন অফ অনার ইত্যাদি।
শতবর্ষ পেরিয়েও সত্যজিৎ রায় আজও আমাদের ধ্রুবতারা হয়ে আছেন এবং থাকবেন। তাঁর প্রতিটি ফ্রেমের নিস্তব্ধতা আজও আমাদের কানে কানে বলে যায়— "সৃজনশীলতা হলো সত্যের একমাত্র অনুসন্ধান।"
0 Comments