জ্বলদর্চি

সত্যজিৎ রায় প্রসঙ্গে/পারমিতা রায়


সত্যজিৎ রায় প্রসঙ্গে

পারমিতা রায়

তিনি শুধু পরিচালক ছিলেন না,  অসাধারণ ইলাস্ট্রেটরও ছিলেন।'সন্দেশ' পত্রিকার জন্য অজস্র ছবি এঁকেছেন, নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ, সিনেমার পোস্টার, সব নিজের হাতে করতেন। এই কালি-কলমের কাজ, ডট আর হ্যাচিং-এর স্টাইলটা তাঁরই সিগনেচার।
ডানদিকের ওই প্যাঁচানো সইটা তাঁর অটোগ্রাফ। রায়বাবু বাংলা হরফ নিয়ে প্রচুর এক্সপেরিমেন্ট করেছেন- 'Ray Roman', 'Ray Bizarre' নামে তাঁর ডিজাইন করা ফন্টও আছে। সিনেমার টাইটেল কার্ডের জন্য নিজেই হাতে লিখতেন।
মানুষটা একাই একটা ইন্সটিটিউশন ছিলেন গল্প লেখা, ছবি আঁকা, সুর দেওয়া, ফন্ট বানানো, পরিচালনা। জলদর্চির প্রচ্ছদে তাই তাঁর আঁকা আর সই দিয়েই তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।


২ মে ২০২৬ এর এই বিশেষ সংখ্যাটা তাই শুধু লেখায় নয়, রেখায়ও মানিকদাকে ধরেছে। মানিকদার আঁকা অনুকরণ করা সহজ নয়, রেখার ভেতরেই ওঁর জাদু লুকিয়ে থাকে। তিনি একাধারে লেখক, চিত্রকর, সুরকার, গ্রাফিক ডিজাইনার। বাংলা সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। জন্ম ও পরিবার জন্ম ২ মে ১৯২১, কলকাতা পরিবার উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর নাতি, সুকুমার রায়ের ছেলে। ছোট থেকেই শিল্প-সাহিত্যের আবহে বড় হয়েছেন।
🍂
প্রথম ছবিপথের পাঁচালী 1955, অপু ট্রিলজির প্রথম পর্ব। এই ছবি দিয়েই বাংলা সিনেমা বিশ্বের দরবারে পৌঁছায়। অপু ট্রিলজি, পথের পাঁচালী, অপরাজিত 1956, অপুর সংসার_ 1959, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে। অন্য বিখ্যাত ছবি জলসাঘর, দেবী, চারুলতা, নায়ক, গুপী গাইন বাঘা বাইন, অরণ্যের দিনরাত্রি, সোনার কেল্লা, হীরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে, শাখা প্রশাখা।
সুরকার সত্যজিৎ 1961 সালের তিন কন্যা থেকে নিজের ছবিতে নিজেই সুর দিতে শুরু করেন। তার আগে পথের পাঁচালীতে সঙ্গীত করেছিলেন রবিশঙ্কর। সত্যজিতের সুর মানেই ছবির সাথে মিশে যাওয়া। পশ্চিমি ক্লাসিকাল আর ভারতীয় রাগের মিশেল আনতেন। গুপী গাইন বাঘা বাইন এর গানগুলো তো ছোটবেলার নস্টালজিয়া। নিজে গান লিখতেন, সুর করতেন।

সাহিত্য ফেলুদা, প্রোফেসর শঙ্কু, তারিণী খুড়ো সৃষ্টি করেছেন। সন্দেশ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। অলংকরণ বইয়ের প্রচ্ছদ, ক্যালিগ্রাফি, টাইপফেস ডিজাইন করতেন। Ray Roman, Ray Bizarre নামে ফন্টও আছে। সম্মান, অস্কার 1992 সালে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টের জন্য সম্মানসূচক অস্কার, ভারতরত্ন 1992, লিজিওঁ দ'নর ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান 1987
শেষ কথা, সত্যজিৎ রায় মানে শুধু একজন পরিচালক নয়, একটা প্রতিষ্ঠান। ২৩ এপ্রিল ১৯৯২ সালে তিনি প্রয়াত হন। কিন্তু ফেলুদার মগজাস্ত্র, গুপী-বাঘার জুতো, আর অপুর চোখ দিয়ে দেখা পৃথিবীটা আজও আমাদের সঙ্গেই আছে। 

সত্যজিৎ রায় মূলত গদ্যের মানুষ। ফেলুদা, শঙ্কু, ছোটগল্প লিখেছেন প্রচুর। কিন্তু কবিতা খুব কম লিখেছেন। তবুও কয়েকটা দারুণ ছড়া-কবিতা আছে, বিশেষ করে গুপী গাইন বাঘা বাইন আর হীরক রাজার দেশে-র গানগুলো তো কবিতাই।

রিলস, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের এই স্রোতে সত্যিই আমরা ভেসে যাচ্ছি। স্ক্রল করতে কখন যে ঘণ্টা পেরিয়ে যায়, টেরই পাই না। এই সময়ে দাঁড়িয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলা, বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরা এটা একটা দরকারি প্রতিবাদ। জলদর্চি অ্যাপের হাত ধরে এই চেষ্টাটা দারুণ। আর সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে লিখতে পারা তো সত্যিই সৌভাগ্যের। উনি শুধু বাংলার না, গোটা ভারতের, গোটা পৃথিবীর সম্পদ। 'পথের পাঁচালী' থেকে 'ফেলুদা', 'প্রফেসর শঙ্কু' থেকে তাঁর আঁকা প্রচ্ছদ-প্রতিটা কাজে বাঙালির মনন আর রুচির ছাপ।

 

Post a Comment

1 Comments