জ্বলদর্চি

চাবিকাঠি:/জয়িতা চট্টোপাধ্যায়

চাবিকাঠি

জয়িতা চট্টোপাধ্যায় 



নাদুস নুদুস কুকুরগুলো বাজার যাওয়ার সময় রোজ পায়ে পায়ে চলে আসে।আদুরে লোমোশ, জীবন থেকে ওদের চাওয়া কত কম!
আর,আমাদের আজ ডাল- ভাত হলে,কাল মাছ- ভাত পরশু বিরিয়ানি- মোগলাই,আর ওরা...

এই সব ভাবতে ভাবতেই পেছন থেকে একটা গলা ডেকে উঠলো,অমল দা!
অমল বাবু,ঘুরেই দেখেন সুবোধ,সুবোধ নাম হলেও বালক তিনি নন মোটেও,গোটা চল্লিশ তো হবেই।
সে যাই হোক-
অমল বাবু:
বলো ভায়া কি খবর!

সুবোধ: দাদা চলছে,
কিচ্ছুক্ষণ চুপ থেকে, সুবোধ জিজ্ঞেস করলো-
আচ্ছা আপনার কি সুন্দর হাসি-খুশি সংসার গানে গল্পে ভরপুর কত শান্তি,দেখলেও ভালো লাগে রহস্যটা কি ,আমাকেও বলুন?অফিস আর মায়ের মাঝে পড়ে আমার তো রুটির  মতো অবস্হা,বন বন করে ঘুরছি ব্রহ্মাণ্ডের চেয়েও জোড়ে।

অমল বাবু: কেন ভায়া বিয়ে বুঝি?
সুবোধ: হ্যাঁ, আগামী অঘ্রাণে।
অমলবাবু:তাই ভাবছি ,এমন বিরল প্রশ্ন কেন?
চল,কালুর চায়ের দোকানে যাই

দুকাপ চা নিয়ে শুরু হল সেই আলোচনা
সুসজ্জিত সংসারের গোপন রহস্য উন্মোচন...

অমল বাবু:খুবই সহজ ভায়া, বাড়িতে ঢুকে নিজেকে কর্তাটি ভাবলে চলবে না,ওইখানে বাড়ির মালকিনটিই হল কিনা কর্তা-ধর্তা-বিধাতা।

অতএব,আজ যদি বলেন,'চারাপোনা খাবোনা পাবদা আনবে',উত্তরে হ্যাঁ হুজুর,'বিকেলে চায়ের সাথে চিকেন চপ চাই', হ্যাঁ হুজুর,নিজেকে সম্ভ্রান্ত কাজের বাবুটি হতে হবে,না হলেই বিনা মেঘে বজ্রপাত,আর সেখানেই বেঘোরে প্রাণ যাওয়ার ভয়।

তো যেমন কাল 'মন্তু মাসির ছেলের বিয়ে সেখানে চলে যাবে',আজ্ঞে হ্যাঁ!
🍂
তো এখন অফিস থেকে লরঝরে স্কুটার নিয়ে ফেরার পথে মেয়েকে কচিনে দিয়ে বাড়ি ফিরে,রেডি হয়ে লিলুয়া থেকে দমদম পার্ক যেতে তোমার যতই নড়বড়ে হাড় গড়গড়ে হয়ে যাক,তবু ঝকঝকে হয়েই যেতে হবে,বুঝলে ভায়া!

এখন রাজিতার এক্সাম,তাই ডিনারে শর্টকাট জলমুড়ি, নুন নেই মিষ্টি নেই আর আমার মাথা ব্যথাও নেই যা জুটছে তাই সোনা মুখ করে খেয়ে নিতে হবে।কাল আবার কুমড়োর ঘ্যাট চচ্চড়ি আর রুটি, সেটাও খেয়ে নাও হাসি মুখে,তবুও বলতে পারবে না,মেয়ের এক্সাম বলে ওয়েব সিরিজ দেখা বা কিটি পার্টি তো বন্ধ হয়নি ? তাহলে অবিচারটা শুধু আমার ওপর কেন? তাহলেই গিন্নির ফ্যাচফ্যাচে কান্নার প্যাচপ্যাচে কাঁদায় তোমাকেই আছাড় খেতে হবে,তারচেয়ে নীরবতাই শ্রেষ্ঠ আত্মরক্ষার অস্ত্র।

'আজ মেয়ের ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট,অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরবে,আজ্ঞে হ্যাঁ,রাতে পিৎজা খাবো রুটি হবে না,'জি তাই হবে।

বিষয়টা হল,অফিসে বসের সাথে রসোগোল্লার রস মুখে ঝরিয়ে নাই বা কথা বললে, কিন্তু বাড়িতে ঘুম থেকে উঠে এক গ্যালন ভার্চুয়াল মধু গিলে নিতে হবে,যাতে তোমার,মন, মস্তিষ্ক,স্নায়ু জুড়ে মিষ্টির স্রোত বয়ে যায়,যার ফলস্বরূপ...

রোব্বারের পাতে পড়বে মাছ ভাজার বদলে ফিস ফ্রাই,ভাত ভাজার বদলে ফ্রাইড রাইস,পান্তার বদলে পোলাও,আর রুটি তরকারি ও কন্টিনেন্টাল মনে হবে।

পলেস্তারা খসা দেওয়ালে রামধনু উঠবে,চারপাশে মনে হবে সুগন্ধি মেখে অপ্সরা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ভায়া,রোব্বার বলে,আবার ভেবে বোসো না ছুটি আরামের দিন, তাহলেই গ্যাঁড়াকলে পড়বে, সেদিন থাকে কাজের মধ্যে ফ্যানের ব্লেড পরিস্কার করা,ঝুল ঝারা, জামাকাপড় শুকুর দেওয়া, ইত্যাদি ও অনেক।আর এরপরে যদি ভাবো দুপুরে টেনে একটা ভাত ঘুম দেবে তাহলে কিন্তু ঘরের তাপমাত্রায় উষ্ণতার প্রাবল্য বাড়বে , আগেই বলে দিলুম।
তদস্বরূপ শীতকাল হলে, পিঠের মেলা, খাদ্য মেলা,বই মেলা, সুভাষ মেলায় যেতে হবে, যদিও মেলায় বুক খুন হয়ে গেলেও মুখ চুন করে থাকা চলে না,উল্টে চোখে মুখে চিকন হাসিটি ঝরিয়ে দিতে হয়,এমন অবস্হায় দেবানন্দ জি বেঁচে থাকলে হয়তো তিনিও আমাকে দেখে ফাস্ট্রু খেয়ে যেতেন।

মোদ্দাকথা হলো, সংসারটি হল একটি আস্ত থিয়েটার, যেখানে কখনো তুমি দর্শক,কখনো বা অভিনেতা,আর তাই,তোমার বেস্ট পারফরম্যান্সের ক্ল্যাপটাও তোমাকেই দিতে হবে! বুঝলে ভায়া!

Post a Comment

0 Comments