জ্বলদর্চি

গোলক ধাঁধা/কমলিকা ভট্টাচার্য

গোলক ধাঁধা
কমলিকা ভট্টাচার্য

দুপুরের শান্তি অঞ্জনার কাছে বরাবরই আশ্রয়। দুপুরে ভাত খেয়ে জানলার পাশে সোফায় শুয়ে বই পড়তে পড়তে সে প্রায়ই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আজও তাই হলো। বইটা বুকের উপর উল্টে, চোখ আধো বুজে এলো।
হঠাৎ—
মনে হল শরীরের উপর দিয়ে যেন একটা বরফ-শীতল, ভেজা দড়ি বয়ে গেল।
চোখ খুলতেই দেখল বুকের উপর চেপে আছে একটা কালো সাপ। তার অর্ধেক শরীর ইতিমধ্যেই জানলা দিয়ে সরে যাচ্ছে, আর লম্বা, আঁশটে লেজটা এখনও তার বুকের উপর কিলবিল করছে।
অঞ্জনার মনে হলো, বরফের কারেন্ট পুরো শরীর বেয়ে ছুটে গেল। গলা শুকিয়ে কাঠ। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা থেকে কোনো আওয়াজই বেরোলো না। শুধু বুকের ভেতর হাপরের মতো শ্বাস ওঠা-নামা করছে।
সে বুঝল, হঠাৎ উঠে বসলে সাপটা শরীর ঘিরে ধরবে। তাই ধীরে ধীরে একটা পা সোফা থেকে মাটিতে নামালো।
আর তখনই সে বুঝল—
এটা তার ঘর নয়।
চারদিকে ছায়া-ঢাকা ভাঙা দেয়াল। দেওয়ালের ফাটল দিয়ে শেকড় ঢুকে গেছে। ছাদ ভাঙা, জানলায় শেকড় ঝুলছে, যেন অন্ধকার হাত। বাতাসে স্যাঁতসেঁতে, পচা গন্ধ।
“আমি কোথায় এলাম?”—মনে মনে ফিসফিস করে উঠল অঞ্জনা।
এক মুহূর্ত আগেই তো বই পড়ছিল সে!
ঠিক তখনই সাপটা ফোঁস করে তার দিকে ফিরল। লাল জিভ বার করে সরসরিয়ে এগিয়ে আসছে।
ভয় পেয়ে অঞ্জনা দৌড় দিল।
ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে এল জঙ্গলের মধ্যে। চারপাশে কেবল গাছ, ঘন অন্ধকার, গাঢ় কুয়াশা। প্রতিটি শব্দে বুক কেঁপে ওঠে।
হঠাৎ সামনে চোখে পড়ল—
একটা শুকনো মৃতদেহ গাছের ডালে ঝুলছে।
চোখের কোটর ফাঁকা, কেবল শুকনো মাংসের সাথে হাড় ঝুলছে। তবুও মাথাটা দুলে দুলে যেন ফিসফিস করছে—
“তুইও এভাবেই মরবি…”
অঞ্জনার মনে হলো পা মাটিতে গেঁথে গেছে। বুকের ভেতর চিৎকার জমে আছে, কিন্তু মুখ দিয়ে বেরোচ্ছে না। এক ঝটকায় চোখ ফিরিয়ে নিয়ে দৌড় দিল।
দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ সে শুনতে পেল ক্ষীণ গলায় কেউ কাঁদছে।
🍂
“বাঁচাও… প্লিজ… আমাকে বাঁচাও…”
কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে এক লোক। ছেঁড়া জামা, মুখে যন্ত্রণার ছাপ। বুকের কাছে হাত চেপে ধরে কাঁপছে।
অঞ্জনার মনে হলো, অন্তত একজন জীবিত মানুষ!
সে সাবধানে এগিয়ে গেল।
“আপনি কে? কী হয়েছে আপনার?”
লোকটা ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
আর অঞ্জনার বুকের রক্ত যেন জমে গেল।
লোকটার ঠোঁটের দুপাশ থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। দুটো লম্বা ধারালো দাঁত অন্ধকারে চকচক করছে। তার চোখদুটো একেবারে ফ্যাকাশে সাদা।
লোকটা হঠাৎ বিকৃত হাসিতে ফেটে পড়ল।
“ড্রাকুলা… ড্রাকুলা…” —নিজেই ফিসফিস করে বলে উঠল সে।
তারপর গর্জে উঠল—
“হ্যাঁ… আমি ড্রাকুলা। তবে রক্ত চুষি একটু অন্যভাবে…”
বলেই তার শরীরটা গলতে শুরু করল।
চামড়া, মাংস সব যেন কালো কাদার মতো ঝরে পড়তে লাগল। আর সেই গলা শরীরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল হাজার হাজার রক্তচোষা জোঁক।
মাটির উপর ছড়িয়ে পড়েই তারা কিলবিল করে অঞ্জনার দিকে ছুটে এল।
এক মুহূর্তের মধ্যে কয়েকটা জোঁক তার পায়ের পাতায় লেগে গেল।
তারপর হাঁটু… উরু…
অঞ্জনা আতঙ্কে পাগলের মতো সেগুলো ছিঁড়ে ফেলতে লাগল। কিন্তু যত সরাচ্ছে, ততই যেন নতুন নতুন জোঁক উঠে আসছে। ছোট ছোট মুখ খুলে তারা মাংসে কামড়ে ধরছে।
সে অনুভব করল—চামড়ার নিচে কিছু নড়ছে।
একটা জোঁক তার পায়ের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে!
অঞ্জনা বিকট চিৎকার করে ছুটতে শুরু করল।
ছুটতে ছুটতে সামনে দেখতে পেল পাহাড়ি নদী। জল কম, কিন্তু অদ্ভুত কাদায় ভরা, গন্ধে গা ঘিনঘিন করছে।
অঞ্জনা ভাবলো নদী পেরিয়ে পালালে হয়তো মুক্তি মিলবে। কিন্তু নামতেই—
জল ছিটকে উঠল, আর এক মুহূর্তে তার পা শক্ত করে কামড়ে ধরল কুমীর।
যন্ত্রণায় শরীর অবশ হয়ে এলো। সে চিৎকার করল, আর দেখল নদীর জল রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে। দাঁতগুলো হাড়ে গেঁথে গেছে।
অস্ফুটে কাঁদতে কাঁদতে হাতের কাছে পাওয়া পাথর দিয়ে বারবার কুমিরের মাথায় মারল। অবশেষে কুমির ছেড়ে দিল। রক্ত ঝরতে ঝরতে কোনোমতে নদীর ওপারে পৌঁছল অঞ্জনা।
তার শরীর কাঁপছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তার মনে হলো—সে যেন বাঁচবে না আর…
ওপারে কোনোমতে সে উঠে দাঁড়ালো, হঠাৎ শুনল অদ্ভুত শব্দ। কান পাততেই বোঝা গেল, অনেকগুলো মানুষ একসাথে হাসছে আর গুনগুন করছে।
সামনে গিয়ে দেখে—
গাছের নিচে আগুন জ্বলছে। চারপাশে বসে আছে কয়েকটা কুঁজো বুড়ি। তাদের চুল মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। মুখের চামড়া ঝুলে আছে, চোখদুটো কোটরের গভীরে ঢুকে গেছে।
তারা একটা বিশাল কালো হাঁড়িতে কী যেন ফুটিয়ে খাচ্ছে।
গন্ধ এত ভয়ংকর যে অঞ্জনার বমি উঠে এলো।
হঠাৎ আগুনের আলোয় সে দেখতে পেল—
হাঁড়ির ভেতরে মানুষের একটা হাত ভেসে উঠেছে।
এক বুড়ি সেটা তুলে দাঁত বসিয়ে চিবোতে লাগল।
খচর… খচর…
তারপর বুড়িটা ধীরে ধীরে মুখ তুলে অঞ্জনার দিকে তাকাল।
তার ঠোঁটের কোণ বেয়ে কালো রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
সে কর্কশ গলায় বলল—
“এদিকে আয় মা…
তোকে নিয়েও ঝোল বানাব…”
বাকি বুড়িরা একসাথে খিলখিল করে হেসে উঠল।
ঠিক তখনই অঞ্জনা অনুভব করল—তার পায়ের উপর কিছু নড়ছে।
নিচে তাকিয়ে দেখে অসংখ্য কালো মাকড়সা তার পা বেয়ে ওপরে উঠছে।
ছোট ছোট লোমশ পা দিয়ে তারা শরীর আঁকড়ে ধরছে। একটা মাকড়সা ধীরে ধীরে তার গলার কাছে উঠে এলো।
অঞ্জনা আতঙ্কে ঝাঁকিয়ে সেগুলো ফেলতে ফেলতে ছুটে পালাল।
কিছুদূর যেতেই সামনে দেখতে পেল একটা কবরখানা।
চারদিকে ভাঙা সমাধি। কুয়াশার মধ্যে বেঁকে থাকা ক্রসগুলো যেন অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ।
হঠাৎ—
মাটির নিচ থেকে একটা হাত বেরিয়ে এলো।
তারপর আরেকটা।
পচা, কাদা-মাখা হাতগুলো ধীরে ধীরে মাটি ফুঁড়ে উঠতে লাগল।
একটা কবর ফেটে বেরিয়ে এলো আধপচা মুখ। চোখ নেই, শুধু কালো গর্ত।
সে ফিসফিস করে বলল—
“নিচে আয়… এখানে খুব ঠান্ডা…”
আরও কয়েকটা মৃতদেহ ধীরে ধীরে কবর থেকে উঠে বসতে লাগল।
অঞ্জনা আতঙ্কে পিছিয়ে যেতে লাগল।
ঠিক তখনই সে শুনতে পেল ক্ষীণ গলায় কেউ গান গাইছে।
ঘুরে দেখে, একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে কবরের উপর বসে আছে। সাদা ফ্রক পরে, হাতে একটা পুরনো পুতুল। মেয়েটার চুল মুখ ঢেকে রেখেছে।
সে ধীরে ধীরে পুতুলটার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল—
“ও খুব দুষ্টু ছিল…”
তারপর হঠাৎ—
কটাস!
সে পুতুলটার ঘাড় মুচড়ে দিল।
একই মুহূর্তে অঞ্জনার নিজের ঘাড়ে অসহ্য একটা টান লাগল। যেন কেউ পিছন থেকে তার ঘাড় ভেঙে দিতে চাইছে।
অঞ্জনা যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল।
ছোট মেয়েটা ধীরে ধীরে মুখ তুলল।
তার চোখ দুটো লাল জ্বল জ্বল করছে।
সে মুচকি হেসে বলল—
“এসো আমার সাথে পুতুল খেলবে …”
ঠিক তখনই
পিঠে এক বরফ-শীতল হাত।
চমকে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল—
সামনেই দাঁড়িয়ে  অর্ধেক শরীরের একজন!
তার ঠোঁট নেই, দাঁত বের করা হাসি। গলার কাটা অংশ ফাঁকা, তবুও সেখান থেকে শোনা যাচ্ছে ফিসফিস—
“এবার তোর পালা।”
অঞ্জনা ভয়ে হাওমাও করে ছুটতে লাগলো।
ছুটতে ছুটতে পৌঁছে গেল এক ভাঙা মন্দিরে। ভেতরটা অন্ধকারে ঢাকা। বাদুড় ডানা ঝাপটাচ্ছে, গন্ধ আরও ভারী।
মন্দিরের কেন্দ্রে একটাই মূর্তি—দেবী না রাক্ষসী বোঝা যায় না।
তার চোখদুটো যেন সত্যিই নড়ছে।
অঞ্জনার বুক ধুকপুক করছে। সে এক পা পিছোতে চাইছিল, কিন্তু পারল না।
হঠাৎ সে বুঝতে পারল—মন্দিরের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা কালো চুলগুলো নড়ছে।
সেগুলো ধীরে ধীরে তার পায়ের দিকে এগিয়ে আসছে।
এক মুহূর্তে চুলগুলো সাপের মতো তার পা জড়িয়ে ধরল। ঠান্ডা, ভেজা অনুভূতি।
মূর্তির পাথরের ঠোঁট ধীরে ধীরে খুলে গেল।
কর্কশ গলায় শব্দ ভেসে এলো—
“আয়… আয়… তোকে চেখে দেখি…”
মূর্তির চোখের কোটর থেকে হঠাৎ টপটপ করে কাঁচা রক্ত পড়তে লাগল।
অঞ্জনার গলা থেকে অসহায় চিৎকার বেরোল। সে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ল।
চোখ থেকে খুলে পড়ল একটা চশমা।
চোখ খুলে দেখে—সে নিজের সোফায় বসে আছে।
চারপাশে আলো, টেবিল, বই—সবই আগের মতো।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে আদিত্য, হাতে একটা রিমোট।
অঞ্জনা ঘামে ভিজে গেছে, বুক ওঠানামা করছে। মাথায় যেন কুয়াশা। সে বুঝতে পারল—সবটাই এক ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গেম!
আদিত্য হেসে উঠল—
“কেমন লাগল আমার নতুন হরর সিমুলেশন? একদম বাস্তব মনে হচ্ছিল, তাই না?”
অঞ্জনা কাঁপা গলায় বলল—
“তুমি জানো না, আমি সত্যিই ভয়ে মরতে বসেছিলাম… তুমি!”
সে রাগে-ভয়ে আদিত্যর দিকে ছুটে গেল।
কিন্তু আদিত্য তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট অঞ্জনার ঠোঁটে চেপে বসল।
এবার আর কোনো ভার্চুয়াল নয়—
এবার সত্যিকারের ভালোবাসার জগতে হারিয়ে গেল তারা।

Post a Comment

2 Comments

  1. AnonymousMay 26, 2026

    টান টান গল্প

    ReplyDelete
  2. অমিতাভ ব্যানার্জিMay 26, 2026

    দুর্দান্ত, রোমহর্ষক।😟

    ReplyDelete