কোয়েলিয়া বিশ্বাস
৩০শে মে, ২০১৩। আনুমানিক সকাল ৭:৩০ হবে। অকালে ঝরে পড়ল এক নিঃসঙ্গ প্রাণ, ঋতুপর্ণ ঘোষ। সত্যজিৎ রায়ের পরবর্তী সময়ে যিনি ভারতীয় সিনেমায় এক আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়েছিলেন। বহু মানুষ ভিড় জমিয়েছে তাঁর সাধের “তাসের ঘর”-এর সামনে। টলিপাড়া ভেঙে পড়েছে কান্নায়। তাঁরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না যে তাঁদের প্রিয় “ঋতুদা” আর নেই। মিডিয়া, শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক এবং ভক্তদের ঢল বাড়ি থেকে রাস্তায় এসে নেমেছে। চারিদিক লোকেলোকারণ্য, তবুও কেমন যেন এক অদ্ভুত গুমোট ভাব কাজ করছে চারপাশে।
ক্লিক করে দেখুন👇
নির্জনতা এবং নিঃসঙ্গতার মধ্যে একচিলতে ফারাকটা বুঝিয়েছিলেন যে মানুষটি, আজ সবকিছুকে ফাঁকি দিয়ে তিনি নিজেই পাড়ি দিয়েছেন আর এক নিঃসঙ্গতার দেশে। স্নেহ এবং সান্নিধ্যের আলোয় ঘেরা থাকলেও কোথাও যেন তাঁর হৃদয়ে শূন্যতা জমে উঠেছিল। আর তাই বুঝি একরাশ অভিমান নিয়ে হারিয়ে গেলেন চিরতরে। যাওয়ার আগে রেখে গেলেন একগুচ্ছ শিল্পকর্ম, যেগুলোর মাধ্যমে তাঁর হৃদয়ের অনেক না-বলা কথা, অনেক শূন্যতা, অনেক রিক্ততা প্রকাশ পায়। বাংলা সিনেমায় নিঃসঙ্গতার সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে গভীর ভাষা তৈরি করেছিলেন এই মানুষটি। তাঁর অঙ্কিত চরিত্রগুলো দুঃখে কাতর হয়ে পড়ে না, বরং তাদের মৌনতা নিঃশব্দে জন্ম দেয় বিষাদের।
প্রসঙ্গ যখন নিঃসঙ্গতার, তখন সবচেয়ে প্রথম যে ছবিটির কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে, তা হল “বাড়িওয়ালি”। একটা নিস্তব্ধ বাড়ি, কয়েকটা নির্জন দুপুর এবং এক অসহায় নারীর চিরন্তন অপেক্ষার গল্প “বাড়িওয়ালি”। বাড়ির প্রতিটি কোণায় কান পাতলে শোনা যায় জমে থাকা একদলা কষ্ট এবং দীর্ঘশ্বাস। সিনেমার নায়িকা বনলতার বিবাহের দু’দিন পূর্বে তাঁর বাগদত্তের আকস্মিক মৃত্যুতে যে শূন্যতা তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল, তা বুঝি ছড়িয়ে পড়েছিল বাড়ির উঠোন থেকে ছাদ, পুব থেকে পশ্চিমে। কিন্তু হঠাৎই তাঁর একঘেয়ে জীবনে দেখা দিল চঞ্চলতা। ঘটনাক্রমে তাঁর আলাপ হয় কলকাতার স্বনামধন্য পরিচালক দীপঙ্করের সঙ্গে। প্রথম দেখাতেই তাঁকে ভালো লেগে যায় বনলতা দেবীর। আর সেই ভালো লাগা থেকেই দীপঙ্করবাবুর একটি ছবির শুটিংয়ের জন্য তাঁর বাড়ির একটি অংশ ভাড়া দিতে রাজি হন বনলতা। বনলতার জীবনে, তাঁর শরীরের অন্তরে ও বহিরঙ্গে, দীপঙ্করবাবু যেন এনে দিয়েছিলেন এক সুপ্ত প্রাণের স্পন্দন। তাঁর জীবনে ঘন ধূসর মেঘ সরে দেখা দিয়েছিল সূর্যোদয়ের কোমল আলো। কিন্তু সেই সুখও বেশি দিন সইল না তাঁর ভাগ্যে। যেমন উড়ো ঝড়ের মতো এসেছিল, তেমনই হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেল দীপঙ্করবাবু, বনলতাকে আরও তীব্রভাবে একা করে দিয়ে। যেন এক দমকা হাওয়া এসে তাঁর জীবনের কটা দিন ওলটপালট করে দিয়ে তাঁকে মাতাল করে আবার চলে যায় নিজের গন্তব্যে। পড়ে রয়ে যায় কেবল বনলতা, তাঁর শূন্য ঘর এবং চোখভর্তি অপেক্ষা। উত্তর কলকাতার পুরোনো বিস্তীর্ণ জমিদারবাড়ি, ধুলো জমা বারান্দা, অন্ধকার সিঁড়ি, দীর্ঘ ছাদ এবং শূন্য ঘর— সবকিছুই সিনেমার মূল বিষয়বস্তুর সঙ্গে ভীষণ প্রাসঙ্গিক। ছবিটিতে যা বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা হলো বনলতার প্রতীকী স্বপ্ন। টুকরো টুকরো ভাঙা স্বপ্নগুলো ইঙ্গিত করে তাঁর একলা, ভালোবাসাহীন জীবনে তাঁর মনের অস্থিরতা এবং না-পাওয়া সুখগুলোর জন্য কাতরতা। শেষে সেই জনমানবহীন প্রাসাদই বনলতার অপূর্ণ স্বপ্নগুলোর সাক্ষী হয়ে থেকে যায়।
ঋতুপর্ণ ঘোষ বিভিন্ন সম্পর্কের সমীকরণের মধ্যে দিয়ে নিঃসঙ্গতার অনুভূতি তুলে ধরেছিলেন। যেমন, মা-মেয়ের সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্প “উনিশে এপ্রিল” ছবিটিতে স্তব্ধতা অনেক না-বলা কথার ইঙ্গিত দেয়। একই বাড়ির দুই মানুষ, অথচ তাদের মাঝে বিস্তৃত এক অদৃশ্য দূরত্ব এবং একাকিত্ব। শহরের স্বনামধন্য নৃত্যশিল্পী সরোজিনীর চারপাশে নাম, যশ, আলো, খ্যাতি ও মানুষের ভিড় থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ভীষণ একা। তাঁর এবং তাঁর মেয়ে অদিতির মধ্যে যে দেয়াল গড়ে উঠেছে, তা তাঁকে বড়ই বিচলিত করে। অন্যদিকে অদিতির শৈশব জুড়ে তাঁর মায়ের অনুপস্থিতি এবং বাবার আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে আরও নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়। বাবাকে হারিয়ে অদিতির মনে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, তার জন্য অদিতি নিজেকে আরও গুটিয়ে নেয়। এই শূন্যতা আরও গভীর হয়ে ওঠে, যখন অদিতির প্রেমিক তাঁকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে। সে দীর্ঘদিনের মানসিক অবসাদ, অবহেলা এবং কাছের মানুষের সঙ্গে দূরত্বের ভারে ধীরে ধীরে হতাশায় ডুবে যায়। তাঁর একাকিত্ব এতটাই অসহনীয় হয়ে ওঠে যে এক নিঝুম রাতে সে ঘুমের ওষুধ খেয়ে তাঁর এই কষ্ট চিরতরে নিবারণ করার চেষ্টা করে। এই দৃশ্যটি পরিচালক নাটকীয়ভাবে নয়, বরং খুব নিস্তব্ধতায় নির্মাণ করেছেন। এই নিঃসঙ্গতা শেষ পর্যন্ত মুখোমুখি কথোপকথনের মাধ্যমে কমতে থাকে। সেই রাতের দীর্ঘ মান-অভিমানের পর্ব চলার পর বহু বছর পরে সরোজিনী এবং অদিতি তাঁদের সম্পর্কের মানে খুঁজে পায়। “উনিশে এপ্রিল” শুধুমাত্র তিক্ত সম্পর্কের গল্প নয়, বরং ভালোবাসা পেলে এই তিক্ত সম্পর্কগুলোই কত সুন্দরভাবে ধরা দিতে পারে, তা বোঝায়।
একাকিত্বের প্রসঙ্গে বলতে গেলে “Raincoat”-এর অবদান অনস্বীকার্য। ঐশ্বর্য রাই এবং অজয় দেবগন অভিনীত এই ছবিটি দেখলে বোঝা যায় যে নিঃসঙ্গতার মধ্যেও কী অদ্ভুত এক রোমান্টিসিজম লুকিয়ে আছে! ছবিটির প্রতিটি বৃষ্টিভেজা মুহূর্তে ঋতুপর্ণ ঘোষ নিঃসঙ্গতার এক বিষণ্ন ছবি এঁকেছেন। ছবিতে একাকিত্ব যেন বৃষ্টির মতোই ধূসর, অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং প্রাণহীন। ছবির প্রধান দুই চরিত্র, নিরু এবং মনুর মধ্যে অগাধ ভালোবাসা বেঁচে থাকলেও তাদের মেলামেশায় আছে নিষেধাজ্ঞা। তাই তাদের কথোপকথনের ফাঁকেও চোখে পড়ে অপূর্ণতা এবং একরাশ অভিমান। বহু বছর পর এক বর্ষার দিনে মনু কাজের সন্ধানে কলকাতায় আসে এবং নিরুর বাড়ি যায়। নিরু তাঁকে দেখে প্রথমে অবাক হলেও ধীরে ধীরে সেও পুরোনো স্মৃতিতে ডুবে যায়। কিন্তু এই কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় যে দু’জনেই তাঁদের জীবনের এক অমোঘ সত্য লুকিয়ে রেখেছে। আসলে নিরু তাঁর বিয়ের পরই বুঝতে পারে যে তাঁর স্বামী আসলে ঠক এবং মাতাল। সংসারের অভাব, ঋণ ও অনিশ্চয়তার স্তুপে হারিয়ে যায় সে। অন্যদিকে মনুও নিজের ব্যর্থতা ও দারিদ্র্যের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। দু’জনেই একে অপরের সামনে মিথ্যে সুখের মুখোশ পরে থাকে। নিরুর জৌলুসহীন ঘর যেন তাঁর মনেরই প্রতিচ্ছবি। তাঁর ঠোঁটের ম্লান হাসি এবং ক্লান্ত চোখ তাঁর মানসিক বিধ্বস্ততার প্রমাণ। ছবির অবিরত বৃষ্টি শুধুই আবহাওয়া নয়, বরং বিষণ্নতার লক্ষণ। পুরোনো স্মৃতি, হারানো প্রেম এবং জীবনের দায়বদ্ধতায় আটকে থাকা দু’টি মানুষের নির্ভেজাল ও নিঃস্বার্থ প্রেম দেখলে মনে হয় যে অপেক্ষার মধ্যেও অদ্ভুত মাধুর্য থাকে।
অনেকের মতে, ঋতুপর্ণ ঘোষের সবচেয়ে নান্দনিক ও আবেগঘন কাজগুলোর মধ্যে একটি হলো “চোখের বালি”। রবীন্দ্রনাথের শব্দচয়ন ও ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেম্যাটিক নৈপুণ্য— দুই মিলিয়ে “চোখের বালি” হয়ে উঠেছে দুই একাকী নারীর অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার গল্প। চলচ্চিত্রের খাতিরে পরিচালক কোথাও কোথাও সংযোজন বা বিয়োজন করলেও তা মূল উপন্যাসের সাহিত্যরসে ব্যাঘাত ঘটায়নি বিন্দুমাত্র। বরং তা আরও বেশি করে ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেয় দর্শকদের কাছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাসে উনিশ শতকের বঙ্গসমাজের বাস্তবতার ওপরে বেশি জোর দিলেও ঋতুপর্ণের চোখে যা বেশি করে ধরা দিয়েছে, তা হল নারীর নিঃসঙ্গতা ও দমিত মনোবাসনা। তিনি বিনোদিনীর চরিত্রের মধ্যে দিয়ে দেখিয়েছেন নারীদের জীবনে সুখ-শান্তি, ভালো-মন্দ সবটাই পুরুষদের উপর নির্ভরশীল। যখন যে পুরুষের কাছে তাঁকে মোহময়ী মনে হয়েছে, তখন সে তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছে। আবার যখন ইচ্ছে হয়েছে, বিনোদিনীকে তারা দূরে সরিয়ে দিয়েছে সমাজের ভয়ে, কারণ সে বিধবা। সেই সময়ের বিধবাদের কীভাবে নির্বাসন দেওয়া হতো, তা ছবির সব বিধবা নারীদের কঠোর জীবনযাপন দেখলেই বোঝা যায়। সামাজিক নিয়ম-আচার, বারব্রত, নিরামিষ আহার এবং আরও কষ্টসাধ্য রীতির ভিড়ে চাপা পড়ে যায় এক অসহায় নারীর আশা এবং স্বপ্ন। বিধবাই যার একমাত্র পরিচয়, তার নিঃসঙ্গতা বহুস্তরীয়। সে শুধু সমাজের কাছে নয়, নিজের ইচ্ছের কাছেও নির্বাসিত। মহেন্দ্রর প্রতি আকর্ষণ, আশালতার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং বিহারীর প্রতি টান— সবকিছুর মধ্যেই বিনোদিনী খোঁজে নিজের অস্তিত্ব। অন্যদিকে পরিচালক আশালতার চরিত্রটি খুবই শান্ত এবং সংযতভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর নীরব দৃষ্টিতে মহেন্দ্রর জন্য অপেক্ষা এবং ভাঙা বিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে আশালতার একাকিত্ব। বাহ্যিকভাবে আশার দাম্পত্য জীবন উষ্ণতা এবং প্রেমে মোড়া হলেও তা এতটাই ঠুনকো যে বিনোদিনীর মতো এক অবলা নারীর দরুন তা তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়ে। মহেন্দ্রর অবহেলা, অন্য নারীর প্রতি আসক্তি এবং বিনোদিনীর সঙ্গে বন্ধুত্বের জটিলতায় সহজ-সরল আশাকে গৃহত্যাগ করতে হয়। একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, “চোখের বালি” চলচ্চিত্রে একাকিত্ব প্রায় সব চরিত্রের মধ্যেই বাস করে।
ঋতুপর্ণের চরিত্রেরা সম্পর্কের ভিড়ে থেকেও ভীষণ একা— কখনও অভিমানে, কখনও অপূর্ণতায়, কখনও না-পাওয়া ভালোবাসার ভারে। অথচ এই নিঃসঙ্গতার মধ্যেও তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন রোমান্টিসিজম, যেখানে অপূর্ণতার মধ্যেও থাকে সৌন্দর্য। তাই তাঁর সিনেমাগুলো কেবল দেখা নয়, বরং অনুভব করার মতো। এই জন্যই হয়তো তাঁর কাজগুলো এখনো এত জীবন্ত, কারণ সেগুলো সাধারণ মানুষের কথা সাধারণভাবেই বলে। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে বলতে বারংবার কানে ভেসে উঠছে তাঁর কণ্ঠে Rossetti-র সেই বিখ্যাত লাইনগুলো—
“Remember me when I am gone away, Gone far away into the silent land; When you can no more hold me by the hand, Nor I half turn to go yet turning stay.”
🍂
1 Comments
খুব ভালো লাগলো।
ReplyDelete