বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২১শে মে বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবস, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কি, আমাদের সমাজে এর তাৎপর্য কি, আসুন এই সব কিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য হলো, কোনো সমাজ, অঞ্চল বা পৃথিবীতে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, শিল্পকলা এবং জীবনযাপনের রীতিনীতির সংমিশ্রণ। সহজ কথায়, এটি মানুষের অভিজ্ঞতার ও সংস্কৃতির বহুরূপী প্রকাশ, যা বিশ্বকে সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত করে তোলে।
বিশ্বে নানা ভাষা, ধর্ম, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, শিল্প, সাহিত্য ও জীবনধারার মানুষের বসবাস। এই ভিন্নতাই পৃথিবীকে করেছে সুন্দর ও সমৃদ্ধ। মানুষে মানুষে সংস্কৃতির পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব। এই ভাবনাকে সামনে রেখে প্রতি বছর ২১শে মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবস। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা UNESCO এবং United Nations এই দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
🍂
২০০১ সালে UNESCO “Universal Declaration on Cultural Diversity” ঘোষণা করে। এরপর ২০০২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২১শে মে কে “World Day for Cultural Diversity for Dialogue and Development” হিসেবে ঘোষণা করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বলতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষা, ধর্ম, ঐতিহ্য, শিল্প, সংগীত, রীতি-নীতি, উৎসব, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ভিন্নতাকে বোঝায়। পৃথিবীর প্রতিটি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। যেমন, বাঙালির আছে বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রসংগীত, পয়লা বৈশাখ, নকশিকাঁথা ও লোকসংস্কৃতি। আবার অন্যান্য দেশের মানুষেরও নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রয়েছে। এই ভিন্নতা মানবসভ্যতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবসের গুরুত্ব অনেক। প্রথমত, এটি মানুষকে অন্য সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাচ্ছে, বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশছে। তাই পারস্পরিক সহনশীলতা ও সম্মান অত্যন্ত প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক। যখন মানুষ অন্যের সংস্কৃতিকে সম্মান করে, তখন বিভেদ, বিদ্বেষ ও সংঘাত কমে যায়। এর ফলে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয়ত, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যটন, হস্তশিল্প, সংগীত, চলচ্চিত্র ও সাহিত্য বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে। সংস্কৃতিভিত্তিক শিল্প বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
বর্তমানে প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের কারণে পৃথিবী অনেক ছোট হয়ে এসেছে। এর ইতিবাচক দিক থাকলেও কিছু নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। শক্তিশালী সংস্কৃতির প্রভাবে অনেক ছোট জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক মানুষ নিজের সংস্কৃতি ভুলে বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি অতিরিক্ত আকৃষ্ট হচ্ছে,ফলে, সাংস্কৃতিক পরিচয় সংকটের মুখে পড়ছে।
বিশেষ করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই প্রতিটি দেশের উচিত নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষা করা এবং নতুন প্রজন্মকে এ বিষয়ে সচেতন করা।
ভারতবর্ষ একটি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর দেশ। এখানে বাঙালি, বিহারী, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, কাশ্মীরি, তামিল, তেলেগু, অসমী ও মনিপুরী ইত্যাদি ২৯ টি রাজ্যের সংস্কৃতির পাশাপাশি চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারোসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলা নববর্ষ, নবান্ন, পিঠা উৎসব, বাউল গান, জারি-সারি গান আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে যেমন, ঠিক তেমনি বিভিন্ন রাজ্যের সংস্কৃতির বৈচিত্র্য আমাদের গর্বিত করেছে।
তরুণ সমাজ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, সংগীত ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিশ্বে তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে। বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। এতে বৈষম্য ও কুসংস্কার কমে যায়।
বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবস আমাদের শেখায় যে, ভিন্নতা কোনো বিভেদ নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার শক্তি। বিভিন্ন সংস্কৃতির সমন্বয়ে পৃথিবী আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ হয়েছে। তাই আমাদের উচিত নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসা এবং অন্যের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহনশীলতা ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বিশ্ব গড়ে তুলতে পারি। বিশ্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দিবস সেই চেতনাকেই বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে।
0 Comments