দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ১২ই জুন, বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। শিশুশ্রম কোনভাবেই কাম্য নয়,কিন্তু সারা পৃথিবীতে প্রচুর শিশু শ্রমিক আছে। শিশুশ্রম কি এবং এর প্রতিরোধ করা কেন প্রয়োজন, আসুন সবকিছুই আমরা বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
শিশুশ্রম প্রতিরোধ হলো, শিশুদের এমন সব কাজ থেকে বিরত রাখা এবং রক্ষা করা, যা তাদের শৈশব, সম্ভাবনা ও সম্মানকেড়ে নেয় এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে
প্রতি বছর ১২ই জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। ২০০২ সালে International Labour Organization এই দিবসের সূচনা করে, যাতে শিশুশ্রমের ভয়াবহতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা যায় এবং শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার উদ্যোগ জোরদার করা যায়। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রতিটি শিশুর অধিকার রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও আনন্দময় শৈশব লাভের।
🍂
শিশুশ্রম এমন কাজকে বোঝায়, যা শিশুদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক কিংবা শিক্ষাগত বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা এমন পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয় যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেয়। কারখানা, নির্মাণক্ষেত্র, কৃষিকাজ, গৃহস্থালি শ্রম, হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এখনও বিশ্বের বহু শিশু নিয়োজিত রয়েছে।
শিশুশ্রমের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য অন্যতম। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর পরিবর্তে কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়। এছাড়া শিক্ষার সুযোগের অভাব, সামাজিক বৈষম্য, অজ্ঞতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সংঘাত এবং শ্রম আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ না হওয়াও শিশুশ্রম বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক সময় পরিবারগুলো মনে করে যে, শিশুর আয় পরিবারের জন্য অপরিহার্য, ফলে শিশুরা অল্প বয়সেই শ্রমবাজারে প্রবেশ করে।
শিশুশ্রমের ফলে শিশুদের জীবন নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। কঠোর পরিশ্রম ও অনিরাপদ পরিবেশ তাদের শারীরিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক শিশু অপুষ্টি, দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তারা দক্ষতা অর্জন করতে পারে না এবং ভবিষ্যতে ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ হারায়,ফলে, দারিদ্র্যের চক্র এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলতেই থাকে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশুশ্রম বন্ধে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলো শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন এবং শ্রম আইন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে। অনেক দেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং শিশু সুরক্ষা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে।
শিশুশ্রম প্রতিরোধে সমাজের প্রতিটি মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে যে শিশুর প্রকৃত কর্মক্ষেত্র হলো বিদ্যালয়, কোনো শ্রমক্ষেত্র নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে, একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও নিয়োগদাতাদেরও শিশুশ্রমমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদেরও উচিত শিশুশ্রমিক দেখলেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং শিশুদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া।
বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস, কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, এটি শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি বৈশ্বিক অঙ্গীকার। একটি শিশুর হাতে বই, খাতা ও স্বপ্ন থাকা উচিত,কাজের ভার নয়। শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ, তাই তাদের নিরাপদ, শিক্ষিত ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
0 Comments