গোবিন্দনাথ শৌণ্ড (ছোটগল্পকার, সাংবাদিক, রামনগর)
ভাস্করব্রত পতি
সেটা ছিল ১৯৬৯ সাল। প্রতি বছরের মতো মৎস্যজীবীরা চলেছে সমুদ্রে। দীঘা থেকেও অনেক মৎস্যজীবী পাড়ি দিয়েছেন মাঝ দরিয়ায়। সমুদ্রগামী সেইসব মৎস্যজীবীরা হঠাৎ পড়লেন বিপদে। ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক ঝড় এবং প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত মৎস্যজীবীরা। সকলেই তখন সর্বসান্ত। সাগরের বুকে সব হারিয়ে তাঁরা তখন নিঃস্ব। এমতবস্থায় আসরে হাজির গোবিন্দনাথ শৌণ্ড।
দীঘার রামনগরের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এই মানুষটি ছিলেন সেসময় ঐসব বিপর্যস্ত মৎস্যজীবীদের ত্রাতা। তিনি স্থানীয় ড. গুণধর বর্মণের সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে বিপন্ন সেই মৎস্যজীবী পরিবারগুলির পাশে দাঁড়ালেন অযাচিতভাবে। তাঁদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে সংগঠিত করেন লাগাতর আন্দোলন। সেদিন যেভাবে লড়াই করেছিলেন এই মানুষটি, তা আজও চিরস্মরণীয়।
দক্ষিণ শিমুলিয়া গ্রামে ১৯৩৮ এর ২০ শে সেপ্টেম্বর (১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) জন্মগ্রহণ করেন গোবিন্দনাথ শৌণ্ড। যৌবন থেকেই লেখাযোখা শুরু। আমৃত্যু লিখে গিয়েছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে। সীমান্তবর্তী মেদিনীপুরের রামনগরের এই বাস্তুকার হয়ে উঠেছিলেন জীবনের গল্পকার। এখানকার দুই গবেষক তপন কুমার রণজিৎ ও প্রদীপকুমার জানার বিশ্লেষণে গোবিন্দনাথ শৌণ্ড সম্পর্কে লেখা হয়েছে, "জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা, রাজনৈতিক উত্থান পতন, পারিবারিক জীবনের সঙ্গে সামাজিক জীবনের দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, প্রেম ভালোবাসা হতাশা এবং এই অঞ্চলের আঞ্চলিক লোকভাষার ব্যবহার, চরিত্র চিত্রণে তাঁর ছোটোগল্পগুলিতে সার্থকভাবে পরিস্ফুট।"
পেশায় তিনি ছিলেন সরকারি বাস্তুকার। কিন্তু ছোট গল্পকার হিসেবেই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে জেলা জুড়ে। বাস্তুকার হওয়ায় তাঁর লেখায় মেলে সেই বিষয়ের ছাপ। গৃহনির্মাণ বিষয়ে তিনি লেখেন 'বাড়ি করার ভাবনা' নামক বই। ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় তা।
অসংখ্য পত্র পত্রিকাতে তিনি লিখেছেন। এগুলির মধ্যে 'দুধভাত', 'ছায়াতরু', 'দীপিকা', 'সৈকতে সোনালী রোদ' ইত্যাদি সমধিক উল্লেখযোগ্য। ১৩৮২ সালে 'দীপিকা' পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় তিনি লিখেছিলেন ছোটগল্প 'মন্ত্রসিদ্ধ ঠাকুর্দা'। রামনগরের আঞ্চলিক ভাষা মালঝিটাকে বসিয়েছিলেন ১৩৮৩ তে প্রকাশিত শারদীয়া দীপিকাতে 'উপলব্ধ' এবং ১৩৮৬ সালে প্রকাশিত শারদীয়া দীপিকা পত্রিকায় 'পাগল' গল্পের চরিত্রচিত্রনে। একাজে তাঁর মুন্সিয়ানা ছিল চোখে পড়ার মতো।
দরিদ্র গ্রামবাসীদের আর্থিক সহায়তার জন্য তিনি গড়ে তুলেছিলেন 'সীমান্ত গ্রাম কল্যাণ ভাণ্ডার'। যা ছিল এক অভিনব উদ্যোগ। বিভিন্ন সমাজসেবা কাজে বহু মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে একজন সত্যিকারের উপকারী বন্ধু হিসাবে তিনি পেয়েছিলেন ব্যাপক স্বীকৃতি। বিভিন্ন সাহিত্যবাসর এবং সাহিত্য আড্ডায় তাঁকে পাওয়া যেত সবসময়। আসলে সেসময় জেলাজুড়ে গল্পসাহিত্য ও গদ্যসাহিত্য ক্ষেত্রে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। দলিত সাহিত্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় আজীবন সংগ্রাম করে গিয়েছেন এই মানুষটি।
ছোটগল্পকার হিসেবে গোবিন্দনাথ শৌণ্ডের পরিচিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। সার্বিক খ্যাতির অধিকারী হতে পেরেছিলেন সাহিত্যের আঙিনায়। তাঁর একমাত্র প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ 'অনাদৃতা' যুগান্তর সহ কয়েকটি পত্রিকায় দারুণ প্রশংসা পেয়েছিল। 'সন্ধানীর দৃষ্টি' পত্রিকায় 'ধূর্জটি' ছদ্মনামে সাংবাদিকতা করেছেন বেশ কিছু সময়। 'আত্মনিরীক্ষণ' নামক একটি পত্রিকার সম্পাদনাও করেছেন একসময়। ১৯৯৭ এর ১২ ই ফেব্রুয়ারি সীমান্তবর্তী মেদিনীপুরের এই মানুষটির মৃত্যু হয়।
🍂
1 Comments
ভালো লাগলো। আমার পরিচিত কথাশিল্পী গোবিন্দ শৌন্ড সম্বন্ধে সুন্দর স্মৃতিচারণা ।
ReplyDelete