জ্বলদর্চি

চিন দেশের গল্প: ২ ( গপ্পোখুড়োর কেরামতি)/বাংলা ভাষান্তর : নিখিলেশ ঘোষ

চিন দেশের গল্প: ২ ( গপ্পোখুড়োর কেরামতি)
/বাংলা ভাষান্তর :  নিখিলেশ ঘোষ

(একটি হান লোককথা। মূল চিনা ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন : জন মিনফোর্ড)


চীন দেশের এক কোণে একটি ছোট্ট  গাঁ ছিল। 
সেই গাঁয়ে রাজত্ব করত এক হাড়কঞ্জুস মস্ত জমিদার। বাপের জন্মে কেউ এমন কৃপণ লোক দেখেনি! টাকার কুমির হলে কী হবে, বুকের ভেতরটা ছিল যেন শুঁটকি মাছ! নিজের চামড়া খসে গেলেও সে সইত, কিন্তু একটা কানাকড়িও বুক থেকে খসাতে রাজী ছিল না। একটা ফুটো পয়সাও তার চোখে  মস্ত বড় যাঁতার পাথর হয়ে ভাসত! ঘুম ভাঙা থেকে চোখ বোজা ইস্তক বুড়ো কেবল ফন্দি আঁটত, কার পকেট কেটে নিজের সিন্দুক ভারী করা যায়। আর মাঠের গতরখাটা চাষিদের তো সে কুকুরের চেয়েও অধম মনে করত। প্রজারা মুখের ওপর সেলাম ঠুকলেও, জমিদার পিঠ ফিরলেই তার নামে থুতু ফেলে বলত 'কিপটে  বুড়ো'।
   
 তবে গতর খাটা চাষীদের ছিল সুখের সংসার । গ্রামের মাটি ছিল যেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। হাত দিলেই সোনা ফলত। মা বসুন্ধরা কখনো তাদের খালি হাতে ফেরায় নি। মাটির ওপর এতটাই ভরসা ছিল যে, আপদ-বিপদের কথা ভেবে মরাইতে দুটো বাড়তি দানা জমিয়ে রাখার কথা কেউ কোনোদিন ভাবেনি। এই ভাবেই দিন যায় মাস যায় বছর যায়।

কিন্তু কপাল মন্দ! এক বছর রাক্ষুসে খরা এসে পেঁচিয়ে ধরল গাঁয়ের গলা। চাষিরা হা পিত্যেস করে চাতক পাখির মত আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। এক ফোঁটা বৃষ্টির দেখা মিলল না। তীব্র দাবদাহে মাঠের সবুজ ফসল জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে গেল। দেখতে দেখতে গোটা গাঁ খাঁ-খাঁ শ্মশান হয়ে গেল। পেটের জ্বালায় মানুষ তখন বনের পাতা আর গাছের শিকড়-বাকড় চিবিয়ে দিন কাটাতে লাগল। একসময় বনের সেই রসদও ফুরোল। যমদূতের মতো অনাহার এসে জাঁকিয়ে বসল প্রতি ঘরে। বাড়িতে কান্নার রোল উঠলো। উপায়ান্তর না দেখে গাঁয়ের লোক জড়ো হলো সেই হাড়কিপটে  জমিদারের দুয়ারে। জমিদার মশাই যেমন কঞ্জুস, তেমন তার দেমাক! জমিদারের খামারে তখন ছোট-বড় মরাইয়ের মেলা। শস্যে ছাদ ছুঁয়েছে এক-একটা মরাইয়ের। অনেকদিন ধরে পড়ে থাকায় গমের দানায় পোকা ধরেছে, ধান থেকে আঁকুড় গজিয়ে সবুজ হয়ে গেছে, তাও সে চাল-গমের একটি দানাও বাইরে হাতছাড়া করবে না- যদি একটা দানা কমে যায়। লোভ এমনই। মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়। চাষিরা হাতজোড় করে কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, "কত্তা, ধার হিসেবে গুটিকয়েক দানা দিন না? সুদে-আসলে শোধ দোব। নইলে পরিবারকে নিয়ে মরতে হবে।" 

কিন্তু জমিদার তো মানুষ নয়, যেন পাথর! একটা মরা দানাও সে কাঙালদের দিল না। মুখের ওপর সপাটে দরজা বন্ধ করে দিল। ক্ষুধার জ্বালা এবার রূপ নিল খ্যাপা আগুনের। প্রজাদের বুক ফেটে কান্না নয়, এবার ক্রোধের আগুনে চোখ রাঙা হয়ে উঠল।  গাঁয়ের জোয়ানরা একজোট হয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, "কিপটে বুড়োর বড্ড বাড় বেড়েছে। পোকায় দানা সাবাড় করে দিচ্ছে অথচ একটা দানাও দেবেনা? ওটা শয়তানের বাচ্চা । ওর পাপের উচিত শিক্ষা ওকে দিতেই হবে!"

তারা  একসঙ্গে বসে একটা দারুণ ফন্দি আঁটলো। তারা প্রথমে বাজার থেকে ছোট ছোট কয়েকটি রুপোর বল আর একটা লিকলিকে রোগা ঘোড়া জোগাড় করল। তারপর চালাকি করে ঘোড়ার লেজের নিচে রুপোর বলগুলো ঢুকিয়ে তুলোর পুটলি দিয়ে মুখটা বন্ধ করে দিল। এবার পালা একজন সঠিক মানুষের, যে জমিদারের সামনে গিয়ে অভিনয় করতে পারবে। সেই গ্রামেই ছিল এক চাষী। লোকটা যেমন চালাক, তেমনই বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে পারত। মুখে সারাক্ষণ কথার খই ফুটত বলে সবাই তাকে 'গপ্পোখুড়ো' বলো ডাকত। গ্রামের মানুষ ঠাট্টা করে বলত, গপ্পোখুড়ো নাকি কবরে শুয়ে থাকা মড়ার সাথে কথা বলে তাকেও হাসিয়ে দিতে পারে! গ্রামের লোকেরা তাকেই বেছে নিল।

 পরদিন চাষিরা গপ্পোখুড়োর হাতে সেই লিকলিকে ঘোড়াটা দিয়ে জমিদার বাড়িতে পাঠাল। ওই হাড্ডিসার ঘোড়া নিয়ে গপ্পোখুড়ো যখন জমিদার বাড়ির প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকল, জমিদার মশাই তো রেগে কাঁই! রাগে তার মুখের দাড়িগুলো খোঁচা হয়ে উঠল। সে ভাবলো, ব্যাটা ঠিক দানা শস্য চাইতে এসেছে। সে চিৎকার করে বলল, "কী রে হতভাগা! তোর এত বড় সাহস? আমার পরিষ্কার খামারবাড়িতে এই মরা ঘোড়া নিয়ে এসে নোংরা করছিস? দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে!" জমিদারের রাগ দেখে গপ্পোখুড়ো কিন্তু একটুও ভয় তো পেলই না, বরং মুখে এক চিলতে ধূর্ততার হাসি হেসে বলল, "কত্তা, অত চিল্লাবেন না, একটু গলাটা নামিয়ে কথা বলুন। আপনার চিৎকারে আমার ঘোড়াটা যদি ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়, তবে তার ক্ষতিপূরণ দিতে আপনার সাতপুরুষের সম্পত্তি বিক্রি করলেও তা কুলোবে না! "জমিদার খেপে গিয়ে বলল, " ছোট মুখে এত বড় কথা! এই তেলেভাজা চামড়া-ওঠা ঘোড়ার জন্য তুই এত দেমাক দেখাচ্ছিস? কতই বা দাম হবে এর?" তখন গপ্পোখুড়ো চোখ টিপে জোর গলায় বলল, "হুজুর, দেখতে রোগা হলে কী হবে, এর গুণ তো আপনি জানেন না। এই ঘোড়া যখন পেটের নাড়িভুঁড়ি নাচিয়ে ডাক ছাড়ে, তখন এর পেট থেকে সোনা  রুপোর দানা ঝরঝর করে  পড়তে থাকে!"

হাড়কিপটে জমিদার বাবুর দেমাক এক লহমায়  উধাও! সে অবাক হয়ে চশমা জোড়া নাকের ডগায় নামিয়ে বাচাল চাষিটিকে জিজ্ঞেস করল, "বলি হ্যাঁ রে, কোত্থেকে পেলি এই আজব জীবটিকে? বস্ বস্।" গপ্পোখুড়ো এতক্ষণ এই সুযোগটাই খুঁজছিল। এইবার সে বেশ গুছিয়ে বসে, গাল ফুলিয়ে গল্প ফাঁদল, "আজ্ঞে কত্তা, সে এক গণ্ডগোলে কেস! গতকাল রাতে আমি এক অদ্ভুতুড়ে স্বপন দেখলুম। দেখলুম, এক মস্ত সাদা দাড়িওয়ালা বুড়ো  আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। এসে আমাকে শুধোলেন, 'চিনতে পারছিস একে?
আমি বললুম, 'কী এটি?'
"এই ঘোড়াটি আগে স্বর্গে কুবের দেবতার সোনা-রুপোর বস্তা পিঠে বয়ে বেড়াত। কিন্তু দেবতার শাপে সে আজ আমাদের  মাঝে এসে পড়েছে। তুই এক কাজ কর, জলদি উত্তর-পুব পানে যা। গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে আয়।' বুড়ো আরও বললেন, 'এই ঘোড়ার এক মস্ত গুণ। যখনই এর পেট ডাকবে , অমনি এর পেছন থেকে সোনা আর রুপোর ডেলা ঝুরঝুর ঝুরঝুর করে পড়তে থাকবে। একে যদি একবার কাবু করতে পারিস, তবে তোর ভাগ্য খুলে যাবে।' 
এই বলেই বুড়ো আমাকে এক ঠেলা মারলেন, সে ঠেলার কী জোর রে বাবা। আমি পড়লুম খাট থেকে নীচে, আর ধড়ফড় করে আমার ঘুমটা গেল ভেঙে ।"

চাষি একটু দম নিয়ে আবার বলতে লাগল, "প্রথমে ভাবলুম, ধুর্! স্বপনই তো, এসব কি আর সত্যি হয়? তাই গায়ে না মেখে আবার উপুড় হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লুম। কিন্তু চোখ দুটো বোজার উপায় নেই কত্তা! চোখ বন্ধ করতেই সেই বুড়ো আবার হাজির। এবার বেশ রেগেমেগে বললেন, 'হাঁ করে দেখছিস কী? জলদি যা! দেরি করলে ঘোড়াটা অন্য কেউ হাতিয়ে নেবে।' এই বলে এবার বুড়ো আমার মাথায় জোরসে  একটা গাট্টা মারলেন। ব্যস, আমার ঘুমটা এক্কেবারে চটকে গেল!"

বাচাল খুড়ো বলে চলল, "তখন ভাবলুম, বুড়ো যখন বারবার বলছে, তখন একবার দেখেই আসি না কী হয়! যেমন ভাবা তেমন কাজ।আর তর সইল না! বিছানা ছেড়ে গায়ের চাদরটা জড়িয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লুম। স্বপনের ইশারা মিলিয়ে সোজা নাক বরাবর উত্তর পুব পানে হাঁটা দিলুম। কিছুদূর যেতেই দেখি, ও মা, মাটির ওপর সত্যি সত্যিই চকচক করছে একটা খাঁটি রুপোর ডেলা! অমনি দে দৌড়! কাছে যেতেই আমার চোখ তো ছানাবড়া, আরে! এ তো সেই স্বপ্নে দেখা বাচ্চা ঘোড়াটা! মাঠের মধ্যে মনের সুখে নরম ঘাস চিবোচ্ছে। আমি আর দেরি না করে আদর করে ঘোড়াটিকে ঘাস খাইয়ে খাইয়ে বাড়ি নিয়ে এলুম।"

একটু থেমে গপ্পোখুড়ো আবার বলা শুরু করল। এবার জমিদারকে আরও উসকে দিয়ে বলল, "আসল খেল তো দেখলুম পরদিন সকালে! বুদ্ধি করে ঘোড়াটার ঠিক পেছনে একটা ধূপদানি রাখলুম। তারপর যেই না দেশলাই জ্বেলে ধূপকাঠিগুলোয় আগুন ধরিয়েছি, অমনি ভানুমতীর খেল! ধূপের ধোঁয়া ছড়াতেই অমনি ঘোড়াটি পেট নাচাতে থাকে আর  তার পোঁদ থেকে টপাটপ রুপোর চকচকে  ডেলা বার হতে থাকে! আমার  পরিবার টপা ট প কুড়াতে থাকে সে কি আনন্দ!  ও! সেদিন যদি স্বপ্নে দেখা বুড়োটার কথা না শুনতুম তো এই জাদু ঘোড়াটা হাত ফসকে যেত।"

গপ্পোদাদুর খেজুরে গল্প শুনে হাড় কিপটে জমিদার বাবাজীর চোখ তো চড়কগাছ! লোভের চোটে তাঁর জিবে জল চলে এল। তিনি অতি কুতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তাই নাকি রে হতভাগা? এমন আজব কাণ্ড বাস্তবেও ঘটে নাকি?"
বাচাল চাষীটি বুঝে গেল কিপটে বুড়োর গল্পটা ভালই মনে ধরেছে। তখন মুচকি হেসে বুক ফুলিয়ে উত্তর দিল, "আজ্ঞে কত্তা, কথায় বলে না— 'ফলেন পরিচীয়তে'! অর্থাৎ, ফল দেখেই গাছের বিচার হয়। আমার কথা যদি আপনার বিশ্বাস না হয়, তবে আমি এখনই আপনার চোখের সামনে এর জ্যান্ত প্রমাণ দিতে পারি!"

 গপ্পোখুড়ো জমিদারকে বলল, "কত্তা, তবে আর দেরি কেন? একটা ধূপদানি আর কয়েকটা ধূপকাঠির ব্যবস্থা করে দিন। তাহলেই ঘোড়াটির কেরামতি চর্মচক্ষে দেখতে পাবেন।" লোভের চোটে অধীর জমিদার তৎক্ষণাৎ হাঁক পাড়লেন, "এই কে আছিস রে, জলদি একটা ধূপদানি আর ধূপ জ্বেলে নিয়ে আয়!" জমিদারের হাঁকডাকের মাঝেই ধূর্ত গপ্পোখুড়ো চট করে ঘোড়াটার পেছনে গিয়ে একটা থালা ধরল। আর সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে, হাতসাফাই করে ঘোড়ার পেছনের সেই তুলোর পুঁটলিটা খুলে ফেলল। পুঁটলি খুলতেই ম্যাজিক! ঝনঝন ঝনঝন শব্দে ছোট ছোট রুপোর বল থালার ওপর পড়তে শুরু করল।ঝকঝকে রুপো দেখে জমিদার মশাই তো আনন্দে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন! তিনি চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলেন, "বলিস কী রে! দিনে এমন কতগুলো রুপোর ডেলা উগরোয় রে এই ঘোড়া?" বাচাল চাষি ততক্ষণে বুঝে গেছে যে বড়মাছ বড়শিতে গেঁথেছে। এবার তো আসল খেলা। সে তখন সাধু সেজে বানিয়ে বানিয়ে বলল, "আজ্ঞে কত্তা, আমাদের মতো কপালপোড়াদের ঘরে তো দিনে মোটে তিন-চারটে রুপোর টাইল (টাইল পূর্ব এশিয়া এবং চীনের ওজনের একক যার পরিমাণ প্রায় ৫০ গ্রাম) দেয়। কিন্তু সেই স্বপ্নে দেখা দাড়িওয়ালা বুড়ো আমাকে বলেছিল— এই ঘোড়া যদি কোনো মস্ত ভাগ্যবানের হাতে পড়ে, যার খুবই চওড়া কপাল, তাহলে  দিনে কম করে ৩০ থেকে ৪০টা সোনা এবং রুপোর টাইল অনায়াসে উগরোবে!"

কিপটে বুড়ো গপ্পোখুড়োর কথায় গলে গেল, মনে মনে ভাবল, "ভাগ্য বুঝি এবার আমার সহায় হলো! এই ঘোড়াটা যদি একবার হাতাতে পারি, তবে দিনে অন্তত কুড়িটা করে দামি টাইল হাতিয়ে নেব। সেই হিসাবে মাসে ছ-শো আর বছরে দাঁড়াবে পুরো সাত হাজার দু-শো টাইল! বাপরে বাপ! এত লাভ রাখব কোথায়?"
হিসেবের খাতা যত বাড়তে লাগল, ঘোড়াটার জন্য হাড়কঞ্জুসের লোভও তত লাগামহীন  হয়ে উঠল আর আকাঙ্খা হয়ে উঠল আকাশচুম্বী । সে আর লোভ সামলাতে পারল না। ঘোড়ার মালিক গপ্পোখুড়োর কাছে গিয়ে সে ঘ্যানঘ্যান শুরু করল। গপ্পোখুড়ো তো প্রথমে সাফ জানিয়ে দিল—সে  এত দামী ঘোড়া কোন ভাবেই বেচবে না। কিন্তু কিপটে বুড়ো তো ছাড়ার পাত্র নয়! সে তখন লোভের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। সে হাতে পায়ে ধরে বলল, "তুমি যা চাইবে ভাই, আমি  তা-ই দিতে রাজি! দয়া করে ঘোড়াটা আমাকে দাও।"   না না করে শেষে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "হায়রে, কপাল! আমার ভাগ্যটাই মন্দ। অনেক মেহনত করে ঘোড়াটা পেলুম, তাও রাখতে পারলুম না। ঠিক আছে, ঘোড়াটা আপনাকে দিলাম। তবে এর বদলে আমার সোনা-দানা বা টাকা-পয়সা কিচ্ছু লাগবে না। আমাকে শুধু ত্রিশ বাসেল (প্রায় সাড়ে নয়শো কেজি) শস্য মেপে দিন, তাতেই আমি খুশি।"

কিপটে জমিদার ভাবল, ''এত দামি ঘোড়ার দাম মাত্র তিরিশ বাসেল! এযে একেবারে জলের চেয়েও সস্তা!'' তাই সঙ্গে সঙ্গে চাষীর প্রস্তাব মেনে নিল। তারপর শস্যের বিনিময়ে ঘোড়াটিকে কিনে নিল।

ওদিকে গপ্পোখুড়ো যেই না ঝোলাভরতি শস্য নিয়ে গাঁয়ে ফিরল, চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। সে বিন্দুমাত্র দেরি না করে সমস্ত শস্যদানা গ্রামবাসীদের মধ্যে বিলিয়ে দিল। গাঁয়ের সকলে পেট পুরে খেল আর ধন্য ধন্য করে গপ্পোখুড়োর ক্ষুরধার বুদ্ধির তারিফ করতে লাগল। 

 জাদুকরী ঘোড়া পেয়ে হাড়কিপটে বুড়োর তো তখন মেঘ না চাইতেই জল! বুড়োর  দেঁতো হাসি আর থামতেই চায় না। এদিকে এত আনন্দের মধ্যেও বুড়োর এক চরম ভয় কাজ করতে শুরু করল—যদি কেন চোর এই সোনার ডিম পাড়া হাঁস চুরি করে চম্পট দেয়?  ঘোড়াটিকে লুকানোর জন্য সে বাড়ির সব জায়গা তন্নতন্ন করে খুঁজলেন। কিন্তু খুঁতখুঁতে বুড়োর কোনো জায়গাই তাঁর নিরাপদ মনে হলো না। অবশেষে চোরের হাত থেকে বাঁচাতে সে ঘোড়াটিকে সোজা নিজের শোয়ার ঘরের খুঁটিতে এনে কষে বাঁধল। আমোদ যেন আর ধরে না! এইবার তো শুধু সোনা রূপা  কুড়োনোর পালা। বুড়ো স্ত্রী কে বলল, "গিন্নি, জলদি মেঝের ওপর আমার সবচেয়ে প্রিয়, নকশা করা লাল কার্পেটটি বিছিয়ে দাও আরএকটি দামি ধূপদানি এনে ঘোড়াটির ঠিক পেছনের দিকে রাখো, যাতে সোনা-রুপো বেরনোর সময় সুগন্ধ ছড়ায়! সঙ্গে সেই কারুকার্য করা ব্যাগটা আনতে ভুলো না যেন।" স্ত্রী কিপটেবুড়োর কথামত কাজ করলো।এবার হাড়কঞ্জুস আর তার পুরো পরিবার চাতক পাখির মতো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেই লাল কার্পেটের দিকে। সবার চোখে-মুখে লোভের ঝিলিক, বুক কাঁপছে উত্তেজনায়। পলক যেন পড়তেই চাইছিল না! কখন যে জাদু ঘোড়াটা তার পেট থেকে সোনা আর রুপোর চকচকে ডেলা বার করবে।  

আশা আর লোভের গুড়ে বালি দিয়ে কেটে গেল সারাটা রাত। বুড়োর ঘুম উঠল মাথায়। ভোর হব হব, এমন সময় হঠাৎ দেখা গেল জাদুকরী ঘোড়াটা তার পেছনের পা দুখানা একটু তুলল। ব্যস! হাড়কঞ্জুসের বুকের ভেতর যেন আনন্দের দামামা বেজে উঠল! সে ভাবল—‘যাক, এতক্ষণে বাচ্চাটা  নাড়িভুড়ি নাচাতে শুরু করেছে। এবার বুঝি কেল্লাফতে!  এবার ঠিক সোনা-রুপোর ডেলা উগরে দেবে!’ বুড়ো আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। তড়িঘড়ি করে একটা চকচকে দামি পোর্সিলিনের ট্রে এনে ঘোড়াটার পেছনের দিকে মেলে ধরল।কিন্তু হায়রে কপাল! সোনা-রুপো তো দূরের কথা, ঘোড়াটা কিছুই ত্যাগ করল না।  ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল, কিন্তু লাল কার্পেটের ওপর একটা কানাকড়িও পড়ল না। 

হতাশ হয়ে কিপটে জমিদার শেষ পর্যন্ত পোর্সিলিনের ট্রে টি নিচে নামিয়ে রাখল। হাড়কঞ্জুসের বুক তখন দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগে দুরুদুরু কাঁপছে। কি করবে ভেবে কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছিল না। শেষমেশ লোভের চোটে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সে ঘোড়াটার লেজটা দু-হাতে খপ করে ওপরে তুলল। তারপর নিজের মাথাটা ঈষৎ ঝুঁকিয়ে,  ঘোড়ার পশ্চাৎদেশের দিকে উঁকি মেরে দেখতে লাগল—সেখানে সামান্য সোনা বা রুপো আটকে আছে কি না! ঠিক সেই মোক্ষম মুহূর্তে ঘটল এক মহাবিপত্তি! হঠাৎ ‘ভড়ভড়-ভড়াস’ করে এক বিকট আওয়াজ হলো। আর ঘোড়ার পেছন থেকে ছিটকে বের হওয়া তথাকথিত ‘তরল সোনা’ ফিনকি দিয়ে এসে সরাসরি জমিদারের মাথা, মুখমণ্ডল আর সারা গায়ে লেপটে গেল! দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র ও ভয়ানক ছিল যে, জমিদার মহাশয় প্রথমে সেটাকে গলানো সোনা ভেবে ভুল করলেও, পরক্ষণেই আসল সত্যটা বুঝতে পারল। বুঝতে পেরেই সে এক লাফে ছিটকে উঠল এবং চিৎকার-চেঁচামেচি জুড়ে দিল। ঘোড়ার মলের সেই ঝাঁজালো দুর্গন্ধে তার নাড়িভুঁড়ি বের হওয়ার জোগাড় হলো এবং সে বারবার বমি করতে লাগল। 

দুর্দশার এখানেই শেষ নয়! এরপর সেই ঘোড়াটি হুড়মুড় করে প্রচুর পেচ্ছাপ করে জমিদারের অতিপ্রিয় সেই কারুকার্য করা লাল কার্পেটটিকে একেবারে ভাসিয়ে দিল। দেখতে দেখতে গোটা শোয়ার ঘর নরককুন্ডে পরিণত হলো এবং তীব্র দুর্গন্ধে সেখানে টেকা দায় হয়ে উঠল। কিপটে বুড়োর মুর্খামির জন্য তার স্ত্রী তাকে গাল দিতে শুরু করল। হাড়কঞ্জুস এতক্ষণে হাড়ে হাড়ে টের পেল, সেই বাচাল চাষি তাকে কিভাবে ঠকিয়েছে! তীব্র আক্রোশ, অপমান আর রাগে অন্ধ হয়ে সে একটা লাঠি তুলে নিল এবং রাগের চোটে ঘোড়াটিকে মেরেই ফেলল।

পরদিন সকালে হাড়কিপটে বুড়ো কোনরকমে ঘুম থেকে উঠেই রাগে ও অপমানে তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে লাগল। গা থেকে ঘোড়ার মলের গন্ধ তখনও পুরোপুরি যায়নি। রাগে গরগর করতে করতে হাড়কঞ্জুস প্রথম যে কাজটি করল, তা হলো—সেই বাচাল চাষিকে যেখান থেকে হোক ধরে এনে খতম করা। সেজন্য সে কয়েকজন ভাড়াটে জল্লাদ ও খুনি কাজে লাগালো। কিন্তু গপ্পোখুড়ো তো কাঁচা খেলোয়াড় নয়! সে জানত যে জমিদার এর ঠিক প্রতিশোধ নেবে। তাই গ্রামের মানুষ ইতিমধ্যেই তাকে এমন এক গোপন ডেরায় লুকিয়ে ফেলেছে যে কারোর সাধ্য নেই তার খোঁজ পায়। হাড়কঞ্জুসের গুণ্ডা-বদমাশরা সারা গাঁয়ের চারদিক তন্নতন্ন করে খুঁজল, ঘরের চাল থেকে খড়ের গাদা —এ ঘর ও ঘর মাঠ ঘাট কিছুই বাদ দিল না। কিন্তু শেষমেশ সবাই খালি হাতে,  মুখে  চুনকালি মেখে ফিরে এল। হাড়কঞ্জুসের রাগ আর বিরক্তি যেন এবার আসমানে গিয়ে ঠেকল! রাগে চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে সে চারদিকে চতুর চর  নিয়োগ করল বাচাল চাষিকে পাকড়াও করার জন্য। অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর কিছুই করার ছিল না।
🍂
 দেখতে দেখতে দিন যায় মাস যায়।  রাজ্যে জেঁকে বসল হাড়কাঁপানো শীতকাল। হু হু করে বইতে লাগল বরফ-শীতল উত্তুরে হাওয়া। একদিন কী এক অসাবধানতায় গপ্পোখুড়ো নিজেকে লুকিয়ে রাখার কথা বেমালুম ভুলে বাইরে বেরিয়ে এলো! অমনি ওত পেতে থাকা হাড়কঞ্জুসের এক ধূর্ত চরের চোখে সে ধরা পড়ে গেল। জল্লাদের দল তাকে বেঁধে নিয়ে সোজা হাজির করল পরম শত্রু হাড়কঞ্জুসের দরবারে। গপ্পোখুড়োকে সামনে দেখে কঞ্জুস বুড়ো রাগে  দাঁত কিড়মিড় করতে লাগলন । তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বের হচ্ছিল। যেন কাঁচা চিবিয়ে খাবে। বাচাল চাষী চালাকি করে তার এতগুলো টাকা শটকিয়েছে তা কিছুতেই সে মেনে নিতে পারছিল না।  জমিদার হুকুম দিল হুকুম দিল, "এই বাচালকে ওই কলঘরের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ভাঙা কুঠুরিতে পুরে রাখো  শুধু তাই নয়,ওর গায়ের সমস্ত গরম পোশাক একে একে জোর করে খুলে নাও।"  শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য গপ্পোখুড়োর শরীরে রইল কেবল একটি পাতলা সুতির জামা। বুড়োর মোক্ষম চাল—ঠান্ডায় জমে গিয়ে কুঁকড়ে যেন এই বাচাল চাষি ওখানেই পটল তোলে! 

ওদিকে বাইরে তখন বছরের হাড় হিম করা শীত পড়েছে। ঝুপঝুপ করে বরফ আর তুষারপাত হচ্ছে, সাথে বইছে কনকনে হাওয়া। বন্দিশালার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে গপ্পোখুড়ো থরথর করে কাঁপতে লাগল। যখন ঠান্ডা একেবারে হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকল তখন সে আর সইতে পারছিল না, মনে হচ্ছিল ভেতরে কেউ তিল পিষছে। ঠিক তখনই হঠাৎ গপ্পোখুড়োর  উর্বর মগজে বিদ্যুতের মতো একটা খাসা বুদ্ধি খেলে গেল! সে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল। কুঠুরির এক কোণে রাখা ছিল এক ভারী পাথরের জাঁতা। গপ্পোখুড়ো সেই মস্ত ভারী জাঁতার পাথরটাকে মাটি থেকে এক টানে ওপরে তুলল এবং সেটিকে দু-হাতে কোলের মধ্যে জাপটে ধরে ওইটুকু বন্ধ কুঠুরির চারদিকে হনহন করে হাঁটতে শুরু করল! ভারী পাথর নিয়ে অমন কসরত করায় দেখতে দেখতে তার শরীরের ইঞ্জিন গরম হয়ে উঠল এবং শীতের রাতেও তার  কপাল বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরতে লাগল। ক্লান্ত হয়ে পড়লে সে মাঝে মাঝে একটু জিরিয়ে নিত, পাথরটা কোলে  নিয়ে আবার জাঁতা-নৃত্য শুরু করত!এভাবেই উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের জোরে গোটা একটা-শীতের রাতের  মরন কামড় সে অনায়াসে সামলে নিল।!

পরদিন তখন সবেমাত্র পুব আকাশে সূয্যি উঠছে। পরম শান্তিতে ঘুম থেকে জেগে উঠল সেই কিপটে বুড়ো। মনে মনে হাসল আর ভাবল, "এতক্ষণে ওই বেচারা চাষীটা নিশ্চয়ই শীতে জমে বরফ হয়ে গেছে!" কিন্তু কুঠুরির ভাঙ্গা দরজা খুলতেই বুড়োর  তো চক্ষু চড়কগাছ! সে অবাক হয়ে দেখল, কনকনে ঠান্ডায় জমে যাওয়া তো দূরের কথা, চাষী বাবাজি সেখানে দিব্যি বসে আছেন। উল্টোদিকে গরমে তার সারা শরীর বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে!হাড়কঞ্জুস বুড়োকে দেখেই চাষী অনুনয়-বিনয় করে বলে উঠল, "ও হুজুর! দয়া করে আমাকে বাঁচান! তাড়াতাড়ি একটা হাতপাখা এনে দিন, নইলে আমি গরমে এখনই মরে যাব!" বুড়ো তো বিস্ময়ে পুরো হতবাক! সে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, "বলিস কী 
রে হতভাগা! এই হাড়কাঁপানো শীতে তোর এত গরম লাগছে কেন?" তখন চাষী তির্যক হেসে তার রহস্য ফাঁস করল, "হুঁজুর, আমার গায়ের এই জামাটি কোনো সাধারণ হেঁজিপেঁজি পোশাক নয়। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের দেওয়া এক অমূল্য সম্পদ। এর নাম 'অগ্নিড্রাগন জামা।' গায়ে দিলে গল গল করে আগুন বেরোয়'। এই জামার বিশেষত্ব হলো, বাইরের আবহাওয়া যত ঠান্ডা হবে, এই জামা ভেতর থেকে তত বেশি গরম বের হতে থাকবে!" বুড়ো চোখ কপালে তুলে শুধাল, "তা, এমন আশ্চর্য জামা তুই পেলি কোথায়?" চাষী তখন রূপকথার মতো আষাঢ়ে গল্প শুনিয়ে বলল, "বহু কাল আগে, স্বয়ং এক অগ্নি ড্রাগন একটি বাণ ছুড়েছিল। স্বর্গের দেবী সেই বাণটি কুড়িয়ে নিয়ে তা দিয়ে পরম যত্নে এই জামাটি বুনেছিলেন। কোনোভাবে সেটি আমার পূর্বপুরুষদের হাতে আসে। তারপর থেকে এক প্রজন্ম পার হয়ে আরেক প্রজন্মের হাত ধরে আজ অবশেষে এটি আমার কাছে এসে পৌঁছেছে।"
। 
হাড়কঞ্জুস বুড়ো হাত দিয়ে দেখল, চাষীর শরীর সত্যিই আগুনে পুড়ছে! তা দেখেই বুড়োর মনে আর কোনো সন্দেহ রইল না—গপ্পো খুড়োর পুরো গল্পটা তার কাছে এক্কেবারে সত্যি বলে মনে হলো।  বুড়োর বয়স বাড়লেও তো লোভ এতটুকু যায়নি। সে তখন বেমালুম সোনালী  ঘোড়ার কথা  ভুলে গিয়ে যেভাবেই হোক ওই জাদুকরী 'অগ্নি ড্রাগন জামা' হাতানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন।সে নিজের গা থেকে দামী নেকড়ের লোমে তৈরি গরম পোশাকটি খুলে গপ্পোখুড়োকে দিয়ে বলল, "এই নে, আমার এই রাজকীয় পোশাকের বদলে তোর ওই জামাটা আমাকে দিয়ে দে!" প্রথমে তো গপ্পোখুড়ো কিছুতেই রাজি হলো না, বারবার মাথা নেড়ে অস্বীকার করল। কিন্তু লোভী বুড়ো যখন নাছোড়বান্দা হয়ে পোশাকের সাথে আরও পঞ্চাশ তোলা চকচকে রুপো দেওয়ার টোপ দিল, তখন গপ্পোখুড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।চোখের জল মুছে সে বলল, "হায়রে! আমি এক্কেবারেই অপদার্থ সন্তান! আজ নিজের পেটের দায়ে পূর্বপুরুষদের এমন পবিত্র পারিবারিক সম্পদ হারিয়ে ফেললাম!" এই বলে সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জামাটি গা থেকে খুলে বুড়োকে দিল। তারপর বুড়োর দামী নেকড়ের পোশাকটি পরে আর পঞ্চাশ তোলা রুপো পকেটে পুরে লম্বা লম্বা পা ফেলে মুখে হাসি চেপে সেখান থেকে দ্রুত চম্পট দিল। 

এদিকে জাদুকরী জামাটি হাতে পেয়ে হাড়কঞ্জুস জমিদারের আনন্দের আর সীমা রইল না। সে তো খুশিতে আত্মহারা! কাকতালীয়ভাবে, ঠিক তার দিনকয়েক পরেই বুড়োর এক ধনী আত্মীয়ের জন্মদিন এসে পড়ল। নিজের এই নতুন জাদুকরী সম্পদ সবাইকে দেখিয়ে হিংসা লাগানোর এক দারুণ সুযোগ পেয়ে গেল বুড়ো। সে আর অন্য কোনো পোশাক না পরে, শুধু গপ্পোখুড়োর কাছ থেকে পাওয়া সেই অগ্নি ড্রাগন আঁকা জামাটি গায়ে চড়িয়ে বুক ফুলিয়ে রওনা হলো আত্মীয়ের বাড়ির দিকে। 

কিন্তু নিয়তির খেলা বোঝে কার সাধ্য! বুড়ো যখন মাঝরাস্তায়, ঠিক তখনই হঠাৎ আকাশ কালো করে কালবৈশাখীর মতো প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে ঝুরঝুরে বরফ পড়তে লাগল। হাড়কঁপানো ঠান্ডা বাতাসে কঞ্জুস বুড়োর হাড়গোড় পর্যন্ত কেঁপে উঠল। তার আশা ছিল বাচাল চাষীর দেওয়া জামা আছে যখন তার কোন চিন্তাই নেই কারণ গপ্পোখুড়ো তো বলেছিল—বাইরে যত ঠান্ডা পড়বে, এই জামা নাকি তত গরম হবে! কিন্তু এখানে তো উল্টো কাণ্ড! ঠান্ডায় বুড়োর প্রাণ যায় যায়, অথচ জামা তাকে এতটুকু ওম দিচ্ছে না! বুড়ো তখন বুঝতে পারল সে এক চরম প্রতারণার শিকার হয়েছে। সে বুঝতে পারল ওই বাচাল চাষীরা একবারে পাজির পা ঝাড়া। কিন্তু ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। জায়গাটি ছিল তার নিজের গ্রাম বা কোনো সরাইখানা থেকে অনেক অনেক দূরে। চারপাশে মাথা গোঁজার মতো কোনো ঠাঁই ছিল না। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে কোনো রকমে চোখ তুলে বুড়ো দেখল, রাস্তার পাশে একটা মস্ত গাছ দাঁড়িয়ে আছে, যার অর্ধেক অংশ আগেই কোনো এক বজ্রপাতে পুড়ে কালো হয়ে গেছে।একটু আশ্রয়ের আশায় বুড়ো দ্রুত ছুটে গিয়ে সেই পোড়া গাছের কোটরে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করল। কিন্তু বিধাতার লিখন তো আর খণ্ডানো যায় না! সামান্য কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড ঠান্ডায় কঞ্জুস বুড়োর পুরো শরীর অবশ হয়ে এল, হাত-পা জমে পাথর হয়ে গেল এবং জাদুকরী জামার লোভ করতে গিয়ে শেষমেশ সেখানেই তার করুণ মৃত্যু হলো।

এদিকে হাড়কঞ্জুস বুড়ো বাড়ি না ফেরায় তার পরিবারের লোকজন তো চিন্তায় অস্থির! নানা স্থানে খোঁজাখুঁজি করার পর, দিনকয়েক বাদে বনের ধারে সেই আধা-পোড়া গাছের নিচে তারা বুড়োর হিম হয়ে যাওয়া মৃতদেহটি খুঁজে পেল। বুড়োর গায়ে গপ্পোখুড়োর সেই জামাটি দেখেই পরিবারের সবাই মাথায় হাত দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল—"হায় হায়! বাবা নিশ্চয়ই আবার ওই সেয়ানা চাষীটার চাতুরিতে পা দিয়ে শেষ পর্যন্ত জীবনটাই হারিয়েছে!" ক্রোধে ফেটে পড়ে তারা তখনই লাঠিসোটা নিয়ে গপ্পোখুড়োকে বেঁধে আনার জন্য পেয়াদা পাঠাল। গপ্পোখুড়োকে যখন হাড়কঞ্জুসের পরিবারের সামনে হাজির করা হলো, সে একটুও না ঘাবড়ে, মুখে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে বলল, "আহা হুজুরেরা! আপনারা খামোখাই আমার ওপর চোটছেন! আমি তো আগেই বুড়ো কর্তাকে সাবধান করেছিলাম। ওই মহামূল্যবান জামার একটা বড় খামতি আছে—সেটি যখনই কোনো জ্বলন্ত বস্তু, শুকনো ঘাস কিংবা পোড়া কাঠের গুঁড়ির সংস্পর্শে আসে, তখনই তা ভেতরে ভেতরে আগুনে পুড়ে খাক হয়ে যায়! আমার মনে হয়, মনিব নিশ্চয়ই অসাবধানে কোনো পোড়া কাঠের কাছে গিয়ে জামাটার জাদুকরী ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলেছেন। এতে আমার কী দোষ বলুন? আমি কি তাকে ওই পোড়া গাছের নিচে গিয়ে লুকোতে বলেছিলাম? আপনারা বিশ্বাস না হলে এখনই গিয়ে দেখে আসুন, যে গাছের নিচে তার দেহ মিলেছে, সেটির অর্ধেকটা আগুনে পোড়া কি না!"

গপ্পোখুড়োর এমন অকাট্য যুক্তি শুনে হাড়কঞ্জুসের পরিবার থমকে গেল। তারা তড়িঘড়ি করে বনে গিয়ে সেই গাছটি ভালো করে পরীক্ষা করে দেখল। অবাক কাণ্ড! গপ্পোখুড়ো ঠিক যেমনটি বর্ণনা করেছিল, গাছটি আসলেও ঠিক তেমনই আধা-পোড়া! তারা তো আর জানত না যে চালাক গপ্পোখুড়ো দূর থেকে বুড়োকে ওই গাছের নিচে জমতে দেখেই মনে মনে এই ফন্দি এঁটে রেখেছিল!আইনের মারপ্যাঁচে আর কোনো প্রমাণ না থাকায়, গপ্পোখুড়োকে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কিপটে জমিদারের পরিবারের আর কোনো উপায় রইল না। গপ্পোখুড়ো তো বুক ফুলিয়ে হাসতে হাসতে রাজকীয় কায়দায় মুক্ত হয়ে বেরিয়ে এলো। আর যেই না এই খবর গ্রামে ছড়াল, অমনি চারদিকে হুল্লোড় পড়ে গেল! বছরের পর বছর ধরে হাড়কঞ্জুস জমিদারের অত্যাচারে গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ ছিল; আজ গপ্পোখুড়োর তুখোড় উপস্থিত বুদ্ধির জোরে শুধু যে সেই অত্যাচারী বুড়োর হাত থেকে তারা রেহাই পেল তা-ই নয়, সবার ঘরে ঘরে যেন অকাল আনন্দ নেমে এলো। গ্রামের বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাই খুশিতে ডগমগ হয়ে গপ্পোখুড়োকে কাঁধে তুলে  নাচতে লাগল। আর এভাবেই, চতুর চাষী গপ্পোখুড়ো নিজের বুদ্ধির জোরে চিরদিনের জন্য গ্রামের মানুষের চোখের মণি হয়ে রইল।
-------------------------------
লেখার জন্য আবেদন। 
✒️
বিষয় : 'কেন লিখি'। আপনি লিখুন—আপনি কেন লেখেন। নির্ভুল বানানসহ অপ্রকাশিত (কমবেশি ১০০০-১২০০ শব্দের) গদ্য পাঠান(হোয়াটসঅ্যাপ : ৯৭৩২৫৩৪৪৮৪) আগামী ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে। প্রকাশ পাবে জ্বলদর্চি অ্যাপ-এ।

Post a Comment

0 Comments