জ্বলদর্চি

বিশ্ব সামুদ্রিক কচ্ছপ দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

বিশ্ব সামুদ্রিক কচ্ছপ দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ১৬ই জুন, বিশ্ব সামুদ্রিক কচ্ছপ দিবস। কচ্ছপ একটি নিরীহ নির্ভেজাল প্রাণী, সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কচ্ছপের গুরুত্ব অনেক। আসুন, এই দিনটি পালন সম্পর্কে সবকিছুই জেনে নিই।
সামুদ্রিক কাচ্ছপ হলো, সামুদ্রিক পরিবেশে অভিযোজিত একদল বৃহৎ সরীসৃপ প্রাণী। এরা প্রায় ১০০ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে আছে। এরা জীবনের ৯৯% সময় সমুদ্রের জলেতে কাটায় এবং শুধুমাত্র স্ত্রী কাচ্ছপরা ডিম পাড়ার জন্য ডাঙ্গায় বা বালুকাময় সৈকতে উঠে আসে।
 কচ্ছপ সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষার উদ্দেশ্যে পালন করা হয়। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন প্রাণী হিসেবে সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রায় ১০ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে বসবাস করছে। ডাইনোসরের যুগ থেকে টিকে থাকা এই প্রাণীগুলো আজ মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
সামুদ্রিক কচ্ছপ সমুদ্রের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা সমুদ্রের ঘাস ও জেলিফিশ খেয়ে খাদ্যশৃঙ্খলকে সুষম রাখে। সমুদ্রের তৃণভূমি সুস্থ রাখতে তাদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সামুদ্রিক কচ্ছপের সংখ্যা কমে গেলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে পৃথিবীতে সাত প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপ দেখা যায়। এর মধ্যে লেদারব্যাক, গ্রিন, লগারহেড, হকসবিল, কেম্পস রিডলি, অলিভ রিডলি এবং ফ্ল্যাটব্যাক উল্লেখযোগ্য। ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে বিশেষ করে ওড়িশার গহিরমাথা সৈকত অলিভ রিডলি কচ্ছপের গণডিমপাড়ার জন্য বিশ্বখ্যাত। প্রতিবছর লক্ষ,লক্ষ অলিভ রিডলি কচ্ছপ সেখানে এসে ডিম পাড়ে, যা প্রকৃতির এক অসাধারণ দৃশ্য।
🍂
তবে, নানা কারণে সামুদ্রিক কচ্ছপের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ তাদের জন্য অন্যতম বড় বিপদ। অনেক সময় কচ্ছপ প্লাস্টিককে খাবার ভেবে খেয়ে ফেলে,ফলে তাদের মৃত্যু ঘটে। এছাড়া মাছ ধরার জালে আটকে পড়া, উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প, সমুদ্র দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অবৈধ শিকারও তাদের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। কচ্ছপের ডিম ও খোলসের অবৈধ বাণিজ্য এখনও বিশ্বের অনেক স্থানে একটি বড় সমস্যা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও সামুদ্রিক কচ্ছপের ওপর গভীরভাবে পড়ছে। বালুর তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে কচ্ছপের বাচ্চার লিঙ্গ নির্ধারিত হয়। তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে স্ত্রী কচ্ছপের সংখ্যা বেশি জন্মায়, যা ভবিষ্যতে প্রজননের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক ডিমপাড়ার স্থান বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও পরিবেশবাদী সংগঠন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সংরক্ষিত সামুদ্রিক অঞ্চল গড়ে তোলা, ডিমপাড়ার সৈকত রক্ষা, অবৈধ শিকার প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি এসব উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতে বন দপ্তর, উপকূলরক্ষী বাহিনী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কচ্ছপ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে।
বিশ্ব সামুদ্রিক কচ্ছপ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সামুদ্রিক কচ্ছপ শুধু একটি প্রাণী নয়,বরং সমুদ্রের সুস্থতার একটি সূচক। তাদের রক্ষা করা মানে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা।
আমরা প্রত্যেকেই কচ্ছপ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে পারি। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, সমুদ্রসৈকত পরিষ্কার রাখা, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করা এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা আমাদের দায়িত্ব। ছোট, ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশ্ব সামুদ্রিক কচ্ছপ দিবস তাই শুধু একটি দিবস নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার প্রতীক। আসুন, আমরা সবাই মিলে সমুদ্রের এই প্রাচীন ও বিস্ময়কর প্রাণীদের রক্ষা করার অঙ্গীকার করি, যাতে আগামী প্রজন্মও তাদের অবাধ বিচরণ দেখতে পারে এবং পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধ হয়।

Post a Comment

0 Comments