কমলিকা ভট্টাচার্য
সকালে ঘুম ভাঙতেই মধুবাবুর মনে হল, জীবনে এবার একটা বড় পরিবর্তন আনা দরকার। পেটের পরিধি যখন পাড়ার whatsapp গ্রুপের গুজবের মতো বেড়েই চলেছে, শার্টের বোতাম প্রায়শই স্বাধীনতা ঘোষণা করছে,তখন আর বসে থাকলে হবে না। টিভিতে প্রধানমন্ত্রী থেকে পাড়ার কাউন্সিলর—সকলেই যোগব্যায়ামের উপকারিতা নিয়ে বলছেন। মধুবাবু স্থির করলেন, এবারের আন্তর্জাতিক যোগ দিবস তিনি ধুমধাম করে পালন করবেন।
সমস্যা হল, গত দশ বছরে তাঁর একমাত্র ব্যায়াম ছিল টিভির রিমোট খুঁজতে সোফার নিচে উঁকি মারা আর কল্যাণীর মুখঝামটা খেয়ে প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও পার্কে দুই চক্কর হাঁটা।
যেমন ভাবা তেমন কাজ।
সকালে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে, বগলে নতুন কেনা যোগম্যাট গুঁজে তিনি হাজির হলেন পাড়ার পার্কে। সেখানে ইতিমধ্যে নানা বয়সের মানুষ সারি দিয়ে বসে পড়েছেন। একজন রোগা-পাতলা প্রশিক্ষক মাইকে ঘোষণা করলেন—
—"আজ আমরা খুব সহজ কিছু আসন দিয়ে শুরু করব।"
"সহজ" শব্দটা শুনে মধুবাবুর আত্মবিশ্বাস দ্বিগুণ হয়ে গেল।
প্রথমেই তাড়াসন। সবাই গাছের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াল। মধুবাবুও দাঁড়ালেন। কিন্তু পাশের ভদ্রলোক ফিসফিস করে বললেন—
—"দাদা, ছবি তোলা হচ্ছে, ঠিক করে দাঁড়ান।"
এরপর শুরু হল বৃক্ষাসন। এক পায়ে দাঁড়িয়ে অন্য পা তুলতে হবে। মধুবাবু পা তুললেন বটে, কিন্তু ভারসাম্য রাখতে না পেরে এমনভাবে দুলতে লাগলেন যে দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল ঝড়ে পড়ার আগে একটা নারকেল গাছ শেষ চেষ্টা করছে।
শেষ পর্যন্ত ধপাস!
পড়ে গেলেন পাশের তিনজনকে নিয়ে।
প্রশিক্ষক বললেন—
—"শরীরকে শিথিল রাখুন।"
মধুবাবু মাটিতে শুয়ে বললেন—
—"আমি তো পুরোপুরি শিথিল হয়ে গেছি, আর কত শিথিল হব?"
সবাই হেসে উঠল।
প্রশিক্ষক এগিয়ে এসে হাত ধরে টেনে তুললেন।
তারপর বললেন—
—"আমি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বানিয়ে দিচ্ছি। সেখানে সব আপডেট দেব আর ছবি আপলোড করে দেব। আমাদের প্র্যাকটিসের ছবি প্রধানমন্ত্রীকেও টুইট করা হবে।"
🍂
ফোনে মধুবাবু নিজের সোজা দাঁড়ানো ছবিটি দেখলেন। দেখে ঠিক তাঁর নিজেকে সিহর্সের মতো লাগল।
না, কিছু একটা করতেই হবে।
এই পনেরো দিনের মধ্যে পেটটা কমাতেই হবে।
তার উপর মিসেস মিত্তিরের সেই হাসি আর মন্তব্য—
—"আপনাকে ঠিক একপায়ে দাঁড়ানো লাট্টুর মতো লাগছিল!"
কথাটা তিনি হেসে উড়িয়ে দিলেও বুকের ভেতর একটা চিনচিনে ব্যথা থেকে গিয়েছিল।
বাড়ি ফিরেই তিনি ঘোষণা করলেন—
—কল্যাণী! আজ থেকে বাড়িতে তেলেভাজা একদম বন্ধ।
কল্যাণী দেবী তখন লুচি ভাজছিলেন।
—কেন গো?
—তুমি অঙ্কে বরাবর কাঁচা। যোগ করতে গেলে আগে বিয়োগ করতে হয়।
—মানে?
মধুবাবু গম্ভীর মুখে বললেন—
—তুমি বুঝবে না। প্রধানমন্ত্রীজি বলেছেন তেল কম ব্যবহার করতে। আমার কথা তো শোনো না, অন্তত তাঁর কথা শোনো। নাকি তিনি মেলোনীকে কে মেলোডি দিয়েছে তাই তোমার তাঁর প্রতি মেলোডি বদলে গেছে। তোমার যা হিংসা মনে।
কল্যাণীদেবী বললেন,তিনি যদি মেলোডিটা মেলোনীকে না দিয়ে তোমায় দিতেন তাহলে তোমার এই হাই পিচ মেলোডিটা একটু নরম মিষ্টি হতো আর মেলোনী তোমার সাথে ছবিও তুলতো।
সেদিন থেকেই বাড়িতে আহারবিপ্লব শুরু হল।
সকালে ফলাহার।
দুপুরে সিদ্ধ- আহার।
রাতে প্রায় অনাহার।
মাঝে মাঝে মধ্যরাতে উঠে মধুবাবু ফ্রিজ খুলে রসগোল্লার ক্যানটার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কিন্তু উসুলে পাক্কা মানুষ, খেতেন না।
লোভ সংবরণও বিয়োগেরই একটা অঙ্ক।
প্র্যাকটিসের এক সপ্তাহ পরের কথা।
সেদিন পার্কে যোগাভ্যাস শেষ হতেই এক ভদ্রলোক মধুবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন—
—দাদা, আজকাল আপনাকে যেন একটু শুকনো শুকনো লাগছে!
কথাটা শুনে মধুবাবুর বুকের ভেতরটা আনন্দে ফুলে উঠল। মনে হল, পনেরো দিনের ত্যাগ-তিতিক্ষা অবশেষে ফল দিতে শুরু করেছে।
তবে বাইরে খুব নির্লিপ্ত ভাব দেখিয়ে বললেন—
—ও কিছু না, একটু ডায়েট করছি তো... তাই হয়তো।
কিন্তু বাড়ি ফেরার সময় তাঁর হাঁটার ভঙ্গিটা এমন হয়ে গেল যেন তিনি সদ্য "বেস্ট ট্রান্সফরমেশন অ্যাওয়ার্ড" জিতে ফিরছেন।
বাড়ি ঢুকেই জুতো না খুলে সোজা ওজন মাপার মেশিনের ওপর উঠে দাঁড়ালেন।
মেশিনে ভেসে উঠল—৮৫ কেজি।
মধুবাবুর চোখ চকচক করে উঠল।
—কল্যাণী! কল্যাণী! তাড়াতাড়ি এসো!
কল্যাণী দেবী রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন।
—কী হয়েছে?
—দেখো! দেখো! এক সপ্তাহেই তিন কেজি কমে গেছে! বলেছিলাম না, তেলেভাজা ছাড়লে মানুষ বদলে যায়!
কল্যাণী দেবী একবার মধুবাবুর দিকে, আরেকবার মেশিনের দিকে তাকালেন।
তারপর শান্তভাবে ঝুঁকে মেশিনের সুইচ টিপে সেটাকে শূন্যে সেট করলেন।
—এবার আবার ওঠো তো।
মধুবাবু একটু ইতস্তত করলেও উঠে দাঁড়ালেন।
মেশিন এবার দেখাল—৮৮ কেজি।
কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা।
তারপর মধুবাবু গম্ভীর মুখে বললেন—
—দুর! তোমার মেশিনটাই খারাপ।
—মেশিন আমার না, আমাদের।
—তা হলেও খারাপ। পার্কের সবাই বলছে আমি রোগা হয়ে গেছি।
—কজন বলেছে?
—একজন বলেছে।
—আর বাকিরা?
—ওরা এখনও ভালো করে খেয়াল করেনি।
মধুবাবু হাল ছাড়ার পাত্র নন।
সঙ্গে সঙ্গে আলমারি থেকে মাপার ফিতে বের করে আনলেন।
—ওজন দিয়ে সব বোঝা যায় না। এবার বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষা হবে।
বলেই পেটটা যথাসম্ভব ভেতরে টেনে মাপলেন।
—দেখো! দেখো! বেয়াল্লিশ ইঞ্চি!
কল্যাণী দেবী বললেন—
—এবার শ্বাসটা ছাড়ো।
—কেন?
মধুবাবু অনিচ্ছাসত্ত্বেও শ্বাস ছাড়লেন।
ফিতেটা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে আগের জায়গাতেই পৌঁছাল।
কল্যাণী দেবী বললেন—
—এইবার হল আসল মাপ।
মধুবাবু কিছুক্ষণ ফিতের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর দার্শনিকের ভঙ্গিতে বললেন—
—এসব মাপজোক করে কখনও সঠিক ফল পাওয়া যায় না।
—তাই নাকি?
—অবশ্যই। আসল ব্যাপার হল মানুষ কী বলছে আর নিজেকে কেমন লাগছে।
—তোমার নিজেকে কেমন লাগছে?
মধুবাবু পেটে হাত বুলিয়ে বললেন—
—আমার তো নিজেকে অন্তত সাত কেজি কম মনে হচ্ছে।
কল্যাণী দেবী হেসে বললেন—
—তা হলে সমস্যা নেই। শরীর ৮৮ কেজি, আত্মবিশ্বাস ৮১ কেজি।
মধুবাবু গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লেন।মনে মনে ভাবলেন যোগব্যায়ামের এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। আগে শুধু পেট ছিল, এখন আত্মবিশ্বাসও আছে!
আসলে এসবের মধ্যেও মধুবাবুর একটা গোপন পরিকল্পনা ছিল।
তিনি কাউকে বলেননি।
এমনকি কল্যাণী দেবীকেও না।
যোগ দিবসের অনুষ্ঠানে সবাইকে চমকে দেবেন।
সেই জন্যই রোজ ভোরে যোগা ম্যাট নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন।
বাড়িতে ফিরেও দরজা বন্ধ করে গোপনে অনুশীলন চলত।
ভিতর থেকে মাঝে মাঝে শোনা যেত—
ধপ!ঠাস!উফফ!আহা!
একদিন কল্যাণী দেবী ভয় পেয়ে দরজায় ধাক্কা দিলেন—
—কী হয়েছে?
—কিছু না। যোগ-বিয়োগ করছি।
—এই বয়সে যোগ-বিয়োগ করছ? তা ঠিক হচ্ছে না বলে নিজেই নিজেকে পিটছ নাকি?
—ডিস্টার্ব করো না।
আসলে তখন তিনি পদ্মাসন করতে গিয়ে নিজের দুই পায়ের মধ্যে আটকে গিয়েছিলেন।
পাঁচ মিনিট ধরে নিজেকেই উদ্ধার করার চেষ্টা করছিলেন।
এদিকে মধুবাবুর অজান্তেই সুন্দরী কাজের মেয়ে সব খবর কল্যাণী দেবীকে দিয়ে দিচ্ছিল।
একদিন সুন্দরী বলল—
—বৌদি, দাদাবাবু রোজ পার্কে যোগ শিখতে যায়।
—তাই নাকি?
—আর বাড়ি ফিরে দরজা বন্ধ করে একা একা প্র্যাকটিসও করে।
কল্যাণী দেবী হেসে ফেললেন।
—তা হলে দেখি ব্যাপারটা।
পরদিন মধুবাবু বেরোতেই তিনি চুপিচুপি পার্কে গেলেন।
একেবারে সবার পেছনে বসে যোগাভ্যাস শুরু করলেন।
স্কুলজীবনে খেলাধুলায় তিনি বরাবরই ভালো ছিলেন।
তাই খুব দ্রুতই সব আসন শিখে ফেললেন।
যোগা স্যারও খুশি।
একদিন বললেন—
—আপনাদের মধ্যে একজন অসাধারণ করছেন। যোগ দিবসের অনুষ্ঠানে তিনিই নেতৃত্ব দেবেন।
মধুবাবুর বুকটা ধক করে উঠল।
তিনি মনে মনে ভাবলেন—
"বুঝেছি। স্যার আমার কথাই বলছেন।"
সেদিন বাড়ি ফিরে খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন—
—শোনো কল্যাণী, যোগ দিবসের সকালে পার্কে এসো।
—কেন?
—এমনি।
—এমনি তো তুমি কাউকে ডাকো না।
—আরে এসো না। একটা সারপ্রাইজ আছে।
কল্যাণী দেবী মুচকি হেসে বললেন—
—আমি জানি তুমি শবাসন খুব ভালো করো।
—দেখবে, দেখবে।
যোগদিবসের আগেরদিন সারা রাত মধুবাবুর ঘুম এল না।
কখনো ভাবছেন সবাই হাততালি দিচ্ছে।
কখনো ভাবছেন মিসেস মিত্তির দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইছেন।
কখনো আবার ভাবছেন তাঁকে দেখে লোকজন বলছে—
"ওয়াহ! কী আকর্ষণীয় শরীর!"
আবার স্বপ্ন দেখলেন মেলোনী তার সাথে ছবি তুলছেন।
অবশেষে এল যোগ দিবসের সকাল।
পার্ক সাজানো হয়েছে রঙিন বেলুনে।
সামনে ব্যানার।
নিচে সারি সারি ম্যাট।
মধুবাবু সবার আগেই পৌঁছে গেলেন।
মিসেস মিত্তিরকে দেখে রহস্যময় হাসিও দিলেন।
আজ তিনি প্রস্তুত।
সবাই এসে গেলে যোগা স্যার মাইকে বললেন—
—আপনাদের সবাইকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা।
আজকের অনুষ্ঠানে যিনি আমার সঙ্গে থেকে সবাইকে নেতৃত্ব দেবেন, তাঁকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
মধুবাবু পেট টেনে সোজা হয়ে বসলেন।
—তিনি হলেন... কল্যাণী দেবী!
তুমুল হাততালি।
মধুবাবুর মুখের অবস্থা এমন হল যেন কেউ তাঁর সামনে থেকে গরম কচুরি সরিয়ে নিয়েছে।
স্টেজে উঠে কল্যাণী দেবী এমন নিখুঁত সূর্যনমস্কার, বৃক্ষাসন, পশ্চিমোত্তানাসন করলেন যে সবাই মুগ্ধ।
মিসেস মিত্তিরের মুখের হাসি কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল।
আর মধুবাবুর মাথায় তখন শুধু একটাই প্রশ্ন—
"এ যে আমার ঘরের মানুষ! এ আবার কবে এসব শিখল?"
অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে দুজনেই চুপ।
মধুবাবু সোফায় গিয়ে গোঁজ হয়ে বসলেন।
মনে হচ্ছে যেন তার সব জমানো পুঁজি বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
ঠিক তখনই সুন্দরী ঢুকল।
হাতে গরম জিলাপি আর সিঙ্গারা।
মধুবাবুর চোখ চকচক করে উঠল।
কল্যাণী দেবী ট্রেতে সাজিয়ে সামনে ধরলেন।
—নাও, অনেকদিন ডায়েট করেছ। আজ একটু খাও।চোখ মুখ একদম শুকিয়ে গেছে।
সুন্দরী বলল—
সত্যি বৌদি,দাদাবাবু কিন্তু বেশ রোগা হয়ে গেছে।
—দাদাবাবু, তবে আজ কিন্তু বৌদি মিত্তির গিন্নির মুখে একেবারে ঝামা ঘষে দিয়েছে! যখন বৌদি স্টেজে উঠল, তখন ওনার মুখটা একবার দেখলে!
মধুবাবুর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটল।
বললেন ,"ওজন আর কমলো কই,মেশিন দেখায় একই,
তবে তুই ঠিক বলেছিস। আজ তোর বৌদি ওর হাসির ঠিক জবাব দিয়েছে।এই না হলে আমার বউ।
এই বলে তিনি একটা গরম জিলাপি মুখে পুরে দিলেন।
চোখ বন্ধ করে বললেন—
—আহা! এও এক ধরনের যোগ।
কল্যাণী দেবী বললেন—
—কিসের যোগ?
—মুখে মিষ্টি যোগ, মনখারাপ বিয়োগ।
দ্বিতীয় জিলাপির দিকে হাত বাড়াতেই কল্যাণী দেবী প্লেট সরিয়ে নিলেন।
—ব্যস! একটাই।
—কেন?
—পনেরো দিনের কষ্ট পনেরো মিনিটে নষ্ট করতে দেব না। আগামী বছরও যোগ দিবস আছে।
সুন্দরী বলল—
—দাদাবাবুকে একটা সিঙ্গারা অন্তত খেতে দাও।
মধুবাবু আশাবাদী চোখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
কল্যাণী দেবী একটু ভেবে বললেন—
—আচ্ছা, একটা সিঙ্গারা পাবে।
—সত্যি?
—হ্যাঁ, তবে আগে দশ মিনিট বৃক্ষাসন।
মধুবাবু আঁতকে উঠলেন।
—না না, সিঙ্গারা থাক!
তারপর একটু থেমে কল্যাণী দেবীর দিকে তাকিয়ে বললেন—
—আজ বুঝলাম, সংসারে যোগ-বিয়োগ তুমিই ভালো বোঝো।
—আর তুমি?
—আমি? আমি এখনও যোগের চেয়ে বিয়োগই বেশি করছি।
—কীসের বিয়োগ?
—জিলাপি বিয়োগ, সিঙ্গারা বিয়োগ, কচুরি বিয়োগ...!
কল্যাণী দেবী হেসে বললেন—
—আর পেট?
মধুবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
—ওটা কিছুতেই বিয়োগ হচ্ছে না! তাই এখনও শবাসন বিভাগেই গবেষণা করছি!
ঘর জুড়ে হাসির রোল উঠল।
আর মধুবাবু মনে মনে স্থির করলেন, আগামী বছরের যোগ দিবসের আগে তিনি সত্যিই একটু রোগা হওয়ার চেষ্টা করবেন।
তবে সেই চেষ্টা শুরু হবে আগামীকাল থেকে।
কারণ আজকের দিনটা উদ্যাপনের।
এই ভেবে তিনি আড়চোখে সিঙ্গারার প্লেটটার দিকে আর একবার তাকালেন।
কল্যাণী দেবী সেই দৃষ্টি দেখে বললেন—
—খবরদার!
মধুবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে শবাসনে সোফায় শুয়ে পড়লেন।
কল্যাণীদেবী বললেন,
—ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি?
মধুবাবু বললেন,
—না, আগামী বছরের যোগ দিবসের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
ঠিক সেই সময় দরজার বেল আর ফোনের রিং—দুটো একসঙ্গে বেজে উঠল।
কল্যাণী দেবী দরজা খুলতে গেলেন। মধুবাবু ফোনটা কানে তুললেন।
ওপাশ থেকে ছেলের গলা ভেসে এল—
—হ্যাপি ফাদার্স ডে, বাবা!
মধুবাবু হেসে বললেন—
—ধন্যবাদ। তবে ফাদার্স ডে আর কোথায়?তোমার মায়ের জন্য তো বছরের সব দিনই মাদার্স ডে। আজকাল ওরই সময় চলছে।
ছেলে হেসে বলল—
—কেন? মা আবার কী করল?
—কী আর করবে! আজ যোগ দিবসের অনুষ্ঠানে সবাইকে চমকে দিয়েছে। এমন যোগাসন করল যে পার্কের লোকজন মুগ্ধ!
ছেলে বলল—
—আর তুমি? তুমিও তো পনেরো দিনে তিন কেজি ওজন কমিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছ!
মধুবাবু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন—
—ওসব বাদ দে। মেশিনটাই খারাপ ছিল।
ওপাশে হাসির শব্দ শোনা গেল।
—মেশিন খারাপ ছিল না, বাবা। মা আর আমি ইচ্ছে করেই তোমাকে ভুল বলেছি। ভাবলাম, এতে তোমার উৎসাহ বাড়বে। দেখো না, সত্যিই তো চেষ্টা করে কত রোগা হয়েছ!
মধুবাবু একটু চুপ করে রইলেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন—
—তা হলে বুঝি আমাকেই পরীক্ষার ইঁদুর বানানো হয়েছিল?
—একদম! আর সেই পরীক্ষার পুরস্কারও আছে। বাইরে গিয়ে দেখো।
—কীসের পুরস্কার?
—তোমার জন্য একটা সাইকেল পাঠিয়েছি। সাইক্লিংও কিন্তু দারুণ ব্যায়াম।
মধুবাবুর চোখ চকচক করে উঠল।
—সত্যি বলছিস?
—একদম। এবার যোগের সঙ্গে একটু সাইকেলও যোগ করো।
ফোন রেখে মধুবাবু প্রায় দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। নতুন ঝকঝকে সাইকেলটা দেখে তাঁর মুখে এমন হাসি ফুটল, যেন তিনি অলিম্পিকে সোনার পদক পেয়েছেন জিতেছেন।
কল্যাণী দেবী দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন—
—কী গো, কাল থেকে শুরু করবে তো?
মধুবাবু সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে বললেন—
—কাল থেকে কেন? স্বাস্থ্যচর্চা শুরু হচ্ছে আজ থেকেই!
তারপর একটু থেমে যোগ করলেন—
—তবে... ফেরার পথে যদি কোথাও গরম সিঙ্গারা পাওয়া যায়, সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ কাকতালীয় ঘটনা!
কল্যাণী দেবী হেসে বললেন—
—খবরদার!
মধুবাবু আর উত্তর দিলেন না। শুধু সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে এগিয়ে গেলেন নতুন উদ্যমে।
মনে মনে ভাবলেন, আগামী বছরের যোগ দিবসের আগে সত্যিই আরও কয়েক কেজি কমাতে হবে।
3 Comments
মধুবাবুর যত জ্বালা। বেচারি !
ReplyDeleteমাধুবাবুর সিরিজ হোক।
মধুবাবুর গল্প আজ প্রায় একবছরের উপর প্রতি মাসে একটি করে আসে।
Deleteআগের বছর মধুবাবুর কড়চা বলে একটি বই বের হয়েছে।প্রথম খণ্ড। এইবারের গল্পগুলো নিয়ে দ্বিতীয় খণ্ড আসবে।
মধুবাবুর গল্প প্রতি মাসে পড়তে থাকুন।আশাকরি ভালো লাগবে।🙏
comedy queener mukute ar ekti palak.
ReplyDelete