জ্বলদর্চি

সংবিধান হত্যা দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে


সংবিধান হত্যা দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ২৫শে জুন, সংবিধান হত্যা দিবস, এই কথাটা শুনলে চমকে উঠতে হয়, সংবিধান হত্যা দিবস আবার কি,কেন এরকম আমরা বলি এবং দিবসটি পালন করি। আসুন সবকিছুই আমরা জেনে নিই বিস্তারিতভাবে।

১৯৭৫ সালের এই দিনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে 'জরুরি অবস্থা'  ঘোষণা করেছিল।
২০২৪ সালে ভারত  সরকার ২৫শে জুনকে “সংবিধান হত্যা দিবস” হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। এই দিবসের উদ্দেশ্য হলো, ১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন ঘোষিত জরুরি অবস্থার ঘটনাকে স্মরণ করা এবং গণতন্ত্র, সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের গুরুত্ব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা।
১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে। রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদের অনুমোদনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। জরুরি অবস্থার সময় দেশের বহু সাংবিধানিক অধিকার সীমিত করা হয় এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নানা বিধিনিষেধ জারি করা হয়। এই সময়কাল প্রায় ২১ মাস স্থায়ী ছিল এবং ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে এর সমাপ্তি ঘটে।
🍂
“সংবিধান হত্যা দিবস” নামকরণের মাধ্যমে বর্তমান সরকার এই সময়কালকে ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর একটি গুরুতর আঘাত হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। সরকারের মতে, জরুরি অবস্থার সময় সংবিধানের মূল চেতনা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ণ হয়েছিল,তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সেই ইতিহাস সম্পর্কে অবগত করা এবং গণতন্ত্র রক্ষার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়াই এই দিবস পালনের প্রধান লক্ষ্য।
ভারতের সংবিধান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও বিস্তৃত লিখিত সংবিধান। এটি দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার প্রদান করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতিমালা নির্ধারণ করে। গণতন্ত্রের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি অবস্থার সময় এই ক্ষেত্রগুলোর অনেকগুলিই সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। ফলে,অনেক ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সেই সময়কে ভারতের গণতন্ত্রের জন্য একটি কঠিন অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করেন।
তবে জরুরি অবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদও রয়েছে। একাংশের মতে, সে সময় দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক সংকট মোকাবিলার জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এটি ছিল, ক্ষমতার অপব্যবহার, যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এই বিতর্ক আজও ভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আলোচিত হয়।
“সংবিধান হত্যা দিবস” পালনের মাধ্যমে কেবল অতীতের একটি ঘটনা স্মরণ করা হয় না,বরং গণতন্ত্রের মূল্যবোধ রক্ষার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা যে কোনো জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের ভুল ও সাফল্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করা যায়। এই দিবস সেই শিক্ষাকেই সামনে নিয়ে আসে।
বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জরুরি অবস্থার সময়কার বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সরাসরি অবগত নয়,তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সেই সময়ের ইতিহাস তুলে ধরা প্রয়োজন। নাগরিকদের অধিকার, সংবিধানের মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। “সংবিধান হত্যা দিবস” ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে স্মরণ করার দিন। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়,বরং জনগণের অধিকার, স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি মূল্যবোধ। সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা বজায় রাখা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। এই দিবস সেই দায়িত্ববোধকে আরও দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

Post a Comment

0 Comments