দূর দেশের লোক গল্প—২৮৮
বোনপোর গোঁসা মাসির উপর
সোমালিল্যাণ্ড (আফ্রিকা)
চিন্ময় দাশ
এক দিন এক শেয়াল বেরিয়েছে শিকারে। যেতে যেতে এক বিড়ালের সাথে দেখা। বেড়াল তখন একটা গাছে চড়ে, আয়েস করে শুয়ে আছে।
চোখ পড়তেই গা-টা রি-রি করে উঠল শেয়ালের। দুনিয়ার এই একটা জিনিষ গাছে চড়া, শেয়াল আজও রপ্ত করে উঠতে পারেনি। সেজন্যই বেড়াল গাছে চড়তে পারে, এটা ভাবলেও রাগ চড়ে যায় শেয়ালের মাথায়।
মনের রাগ মনেই চেপে রাখল শেয়াল। জানতে চাইল—তুমি গাছে চড়ো কেন বল তো, মাসী?
যেমনটি বসে ছিল, তেমনই বসে রইল বিড়াল। এক গাল হেসে বলল—চড়ি কি আর সাধে, বাছা? হাজারটা সুবিধা আছে গাছে চড়ার।
--তাই না কি? হাজারটা সুবিধা?
--হাজারটাই তো। প্রথম ধরো, গাছে চড়লে, চারদিকটা কতো সুন্দর দেখতে পাই। কতো সুন্দর সময় কেটে যায়। তারপর ধরো, দূর থেকে কেউ এলে, আমি আগেভাগে বুঝতে পেরে গেলাম, সে বন্ধু, না শত্রু। কতো উপকার, ভাবো একবার।
শেয়াল সায় না দিয়ে পারল না। বলল—তা বটে। ঠিকই বলেছ।
বিড়াল বলল—তার চেয়েও বড় কথা আছে একটা। জানোই তো বাছা, হতচ্ছাড়া কুকুরগুলোকে। বড্ড জ্বালায়। দেখলেই তাড়া করে আমাকে। ওদের হাত থেকে রেহাই পাবার একটাই উপায়, গাছে চড়ে পড়া। এর চেয়ে মোক্ষম উপায় আর নাই।
--কী ভীতু গো তুমি, মাসী? শেয়াল বিদ্রূপের গলায় বলল—একমাত্র ভীতুরাই গাছে চড়ে নিজেকে বাঁচায়। সাপ আর পাখী ছাড়া, আর কেউ গাছে চড়ে না।
বিড়ালের ভারি গায়ে লাগল খোঁচাটা। কিন্তু মেজাজ হারাল না। শেয়াল কত হারামজাদা, বেশ ভালোই জানে সে। কড়া কথা বলে, চটানো বুদ্ধির কাজ নয়। বরং তাল মিলিয়ে চলাই ভালো।
বিড়াল একটু তোয়াজ করে বলল—সে তো বুঝলাম, বাছা। কিন্তু আমি কি আর তোমার মত দৌড়াতে পারি? কত জোর তোমার পায়ে।
শেয়াল খুশীতে ডগমগ। বলল—তা যা বলেছ, মাসী। দৌড়ে আমার সাথে পারবে, চিতা ছাড়া দুনিয়ায় আর কেউ নাই।
বিড়াল তাল মিলিয়ে জবাব দিল-- সেটাই তো বলছি। হতভাগা কুকুরগুলো যে আমাদের চিরশত্রু। দেখলেই তাড়া করবে।
শেয়াল গর্ব করে বলল—আসতে দাও বুড়ো শয়তানগুলোকে। আমি এক্টুও ডরাই না ওদের। একদিন মুখোমুখি হই। উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব ব্যাটাদের।
বিড়াল গলা মোলায়েম করে বলল— সেটা তুমি ঠিকই বলেছ। তবুও আমি বলব, গাছে চড়তে পারাটা আয়ত্বে থাকা ভালো। হঠাৎ সঙ্কটে পড়ে গেলে, ভারি কাজ দেয়। অকারণ হয়রানি হতে হয় না।
বিড়াল কথা বলছে বটে, খোঁচা দিয়ে বলাটা ভোলেনি। এখন একটু ধূর্তামি এল তার মাথায়। গলা নরম করে বলল—আমি কি বিদ্যেটা শিখিয়ে দেব তোমায়?
শেয়াল একটু চমকে গেল। বিড়ালের মতো গাছে চড়তে পারা তার বহুদিনের সখ। মুখ ফুটে বলতে পারেনি কোনদিন। এখন বিড়াল নিজের থেকে যেচে কথাটা বলছে, ভাবতেই পারছে না শেয়াল।
মন তো আনন্দে ফুটছে টগবগ করে। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করা চলবে না। সে একেবারে শুকনো গলায় বলল—ঠিক আছে। দাও না হয় শিখিয়ে। জ্ঞাণ তো আর ক্ষতিকর জিনিষ নয়। উপকার ছাড়া অপকার নাই তাতে। তাছাড়া, এই মূহুর্তে হাতেও কিছু কাজ নাই আমার।
সহজ গলায় কথাগুলো বলে গেল বটে, শেয়াল কিন্তু বিদ্যাটা রপ্ত করার জন্য ভারি ব্যস্ত।
বিড়াল গাছ থেকে নেমে এল। প্রাথমিক কতকগুলো পরামর্শ আর কসরত বাতলে দিল শেয়ালকে। ছাত্র হিসাবে শেয়াল কিন্তু তেমন সরেস নয়। আসল কথা হোল, শেয়ালের মাথাটাই মোটা। গাছে চড়বার বিদ্যা রপ্ত করবার উপযোগী নয়।
গাছের বাকল আঁকড়ে ধরতে পারছে না ঠিক মতো। খানিকটা ওঠে। আর ধপাস করে পড়ে যায়।
বিড়ালের স্বভাব এমনিতে নরম। তেমন হিংসুটেও নয় মোটেই। কিন্তু শেয়ালটা বারবার আছাড় খেয়ে পড়ে যাচ্ছে। দেখে সে আর হাসি চেপে রাখতে পারছে না। মাঝে মাঝেই বিড়াল ফিক করে হেসে ফেলছে। তাতে জেদ আরও বেড়ে যাচ্ছে শেয়ালের। মরীয়া হয়ে আঁচড়ে কামড়ে কিছুটা ওপরে উঠে পড়ছে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। আবার পড়ে যাচ্ছে চিতপটাং হয়ে।
একটু একটু করে মাথায় রাগ চড়ছিল শেয়ালের। এক সময় আর চেপে রাখতে পারল না। রাগে ফেটে পড়ল একেবারে। বিড়ালের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। এই বুড়িটার জন্যই তার এই বেহাল দশা। ঝাঁপিয়ে পড়েছে বিড়ালের ওপর।
শেয়ালের ভঙ্গী দেখে বিড়াল বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু একটু দেরি করে ফেলেছিল দৌড় লাগাতে। তার পিছনের একটা পা ধরে ফেলেছে শেয়াল।
পা কামড়েই শেয়াল ভাবল, সব খেল খতম। মেরেই ফেলব আজ বুড়িটাকে। বহুত বেইজ্জত করেছে আজ।
বিড়ালও বুঝে গেছে আজই তার শেষ দিন। সব খেল খতম। কেন যে ঝামেলা বাধাতে গেলাম শয়তানটার সাথে।
কিন্তু রাখে হরি, মারে কে? হঠাতই প্রচণ্ড ঘেউ-ঘেউ চিৎকার। এক পাল কুকুর দৌড়ে আসছে দল বেঁধে।
আওয়াজটা কানে গিয়েছে শেয়ালের। তার সব বাহাদুরি মূহুর্তে উধাও। মুখের কামড় কখন আলগা হয়ে গেছে, সে খেয়ালও নাই।
ছাড়া পেয়ে লাফিয়ে উঠেছে বিড়াল। তরতর কর গাছের একেবারে মগডালে চড়ে বসেছে সে। এদিকে শেয়ালও লাগিয়েছে চোঁ-চোঁ দৌড়।
কিন্তু বিড়ালের কাছে যতই বাহাদুরি দেখাক, কুকুরের সাথে দৌড়ে পার পাওয়া তার কম্মো নয়। এক সময় কুকুরগুলো যখন প্রায় ধরে ফেলেছে, কপাল ভালো বলতে হবে। সামনে একটা বুড়ো ওকগাছ। তার গুঁড়ির তলায় একটা গর্ত চোখে পড়ে গেল শেয়ালের। সুড়ুৎ করে মাথা গলিয়ে দিয়েছে। একটু কসরত করতে হোল বটে, ঢুকে পড়তে পেরেছে গর্তটায়।
কুকুরগুলোর কপাল মন্দ। এক্টুর জন্য ফসকে গেছে শিকার। অনেক ক্ষণ বসে থেকেও লাভ হোল না কিছুই। মন মরা হয়ে ফিরে গেল তারা।
কতক্ষণ পর শেয়াল মুখ বার করেছে। এদিক ওদিক উঁকি মেরে দেখে নিল, কাছাকাছি কেউ আছে কি না । নিশ্চিন্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।
এবার ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিকটা জরীপ করল ভালো করে। তার বীরত্বের ছবি কারও চোখে পড়ে গেছে কি না, দেখে নিচ্ছে। তা যদি হয়, মুখ দেখানো ভার হবে যে।
অমনি গাছের মগডালে বসা বিড়ালটা হি-হি করে হেসে উঠল। গায়ে জ্বালা ধরে যায় সে শব্দে। কিন্তু করবার কিছু নাই শেয়ালের। গাছে চড়বার বিদ্যাটা রপ্ত হয়নি যে তার।
এক্টুখানি আগেই বড়াই করে নিজের বাহাদুরীর কথা শুনিয়েছিল বিড়ালকে। গাছের ডগায় বসে, তার সব বাহাদুরি দেখে ফেলেছে বিড়াল। লজ্জার একশেষ। মাথা নামিয়ে সুড়সুড় করে সেখান থেকে সরে পড়ল শেয়াল। বলা তো যায় না, ফোড়ন কেটে আবার কিছু শুনিয়ে দিল। একে কাটা ঘা, তার উপর আবার নুনের ছিটে লেগে যাবে।
সেদিন থেকেই বিড়ালের সাথে সাপে-নেউলে সম্পর্ক শেয়ালের। শেয়ালকে দেখলেই চটপট কোনও একটা গাছে তরতরিয়ে চড়ে বসে বিড়াল। আর, শেয়ালেরও জেদ, যে করেই হোক, উচিত শিক্ষা দিতে হবে বিড়ালকে। বেইজ্জতির কথাটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেনি শেয়াল। অপেক্ষা করে থাকে, কবে মওকা মত পাকড়াতে পারবে শয়তানিটাকে। তাতে যত কাল, যত যুগ সময় লাগে, লাগুক। কিচ্ছু যায় আসে না তাতে শেয়ালের।
0 Comments