জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার:ষষ্ঠ খণ্ড /পর্ব- ৪ /কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার:ষষ্ঠ খণ্ড 
পর্ব- ৪ 
কমলিকা ভট্টাচার্য 

নট রিচেবল

দৃষ্টির সঙ্গে সেই প্রথম কথোপকথনের পর যেন আদরের ভিতরে কিছু বদলে গেল।
অদ্ভুত এক অস্থিরতা তাকে ঘিরে ধরল।
যেন বহুদিন ধরে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে থাকা কোনো অনুভূতি হঠাৎ জেগে উঠেছে।
পরপর কয়েকদিন সে কলেজ যেতে পারল না।
প্রথমদিন সবাই ভেবেছিল সে ক্লান্ত।
দ্বিতীয়দিন জ্বর এলো।
তৃতীয়দিন সে বিছানা ছেড়েই উঠল না।
হোস্টেলের জানলার বাইরে সারাদিন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছিল।
ধূসর লন্ডনের আকাশটা যেন আরও নিচু হয়ে নেমে এসেছিল শহরের উপর।
ঘরের ভিতর আধো অন্ধকার। টেবিলের উপর খোলা বই, untouched coffee mug, আর বিছানার পাশে পড়ে থাকা violin case।
ডাক্তার বলল শরীরের দুর্বলতা, আবহাওয়ার পরিবর্তন, অতিরিক্ত চাপ।
কিন্তু আদর জানত—এ শুধু শরীরের অসুখ নয়।
সারাদিন তার মাথার ভিতরে শুধু একটাই মুখ ভেসে উঠছিল।
চোখ বন্ধ করে ভায়োলিন বাজানো একটা মেয়ে।
যে নিজের ছবিটাও দেখতে পারে না, তবু ছবিটাকে এত যত্ন করে ছুঁয়েছিল যেন সে রঙ দেখতে পাচ্ছে আঙুল দিয়ে।
আদরের বুকের ভিতর কেমন অদ্ভুত ব্যথা হচ্ছিল।
সে আগে কখনও এইভাবে ভাবেনি—
মানুষ এত কষ্ট নিয়েও কীভাবে বেঁচে থাকে?
কীভাবে প্রতিদিন হাসে?
কীভাবে এত অভাবের মধ্যেও সুর জন্মায়?
তার নিজের জীবনটা হঠাৎ খুব আলাদা লাগতে শুরু করল।
সে বুঝতে পারছিল—
সে এতদিন নিরাপত্তার ভিতরে মানুষ হয়েছে।
ভালোবাসার ভিতরে।
ভয়ের আড়ালে।
আর পৃথিবীর কোথাও কোথাও মানুষ প্রতিদিন যুদ্ধ করে শুধু আরেকটা সকাল দেখার জন্য।
চতুর্থদিন বিকেলে একটু সুস্থ বোধ করলে আদর হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পড়ে।
লন্ডনের আকাশে তখন পড়ন্ত রোদ।
সোনালি আলো পুরোনো ইটের বাড়িগুলোর গায়ে এসে পড়েছে।
রাস্তার পাশের ছোট café-গুলো থেকে কফির গন্ধ ভেসে আসছে।
দূরে লাল double-decker bus ধীরে চলে যাচ্ছে।
বাতাসে হালকা ঠান্ডা।
শহরটা যেন আজ অন্যরকম লাগছিল তার কাছে।
আগের মতো শুধু সুন্দর নয়—বরং ক্লান্ত, ব্যস্ত, আর কোথাও যেন গভীরভাবে একা।
আদর ধীরে হাঁটতে হাঁটতে সেই পরিচিত রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ায়।
আজও crowd জমেছে।
রাস্তার শিল্পীরা কেউ guitar বাজাচ্ছে, কেউ আগুন নিয়ে খেলা দেখাচ্ছে, কেউ portrait আঁকছে।
শহরের কোলাহলের মাঝেও একটা জীবন্ত ছন্দ।
আর ঠিক তখনই অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে।
দৃষ্টি হঠাৎ যেন তার উপস্থিতি টের পায়।
সে ভায়োলিনের সুর বদলে ফেলে।
আর মুহূর্তের মধ্যে ভেসে ওঠে সেই পুরোনো melody।
সেই রহস্যময় সুর—যেটা আদর নিজেও অজান্তে বাজাত।
আদরের বুক কেঁপে ওঠে।
সে ধীরে crowd-এর পাশ দিয়ে এগিয়ে এসে একটু দূরে বসে পড়ে।
দৃষ্টি চোখ বন্ধ করেই বাজিয়ে চলেছে।
তার কোঁকড়ানো চুল বাতাসে উড়ছে।
পড়ন্ত রোদের আলো তার মুখে এসে পড়েছে।
সেই আলোয় তাকে অদ্ভুত শান্ত দেখাচ্ছিল।
যেন শহরের সমস্ত কোলাহলের মাঝখানে বসে থাকা এক টুকরো নীরবতা।
ধীরে ধীরে crowd কমে আসে।
রাস্তা ফাঁকা হতে শুরু করে।
সন্ধ্যার আলো নরম হয়ে আসে।
একসময় শুধু দৃষ্টি আর আদর।
আদর খুব আস্তে নিজের violin case খোলে।
তারপর দৃষ্টির সুরের সঙ্গে মিলিয়ে সেই একই melody তোলে।
দৃষ্টির মুখে ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হাসি ফুটে ওঠে।
দু’জনের কেউ কথা বলে না।
তবু যেন অসংখ্য কথা হয়ে চলতে থাকে।
একটা সুর শেষ হলে অন্যটা শুরু হয়।
কখনও দৃষ্টি প্রশ্ন করছে সুরে।
আদর উত্তর দিচ্ছে।
কখনও আদরের সুরে একাকীত্ব।
দৃষ্টি তার ভিতরে উষ্ণতা মিশিয়ে দিচ্ছে।
কখনও মনে হচ্ছিল—দু’জন মানুষ নয়, দুটো অসম্পূর্ণ জীবন কথা বলছে।
কখন যে সন্ধ্যা নেমে আসে কেউ খেয়াল করে না।
রাস্তার lamp-postগুলো জ্বলে ওঠে।
হালকা কুয়াশার ভিতরে ভায়োলিনের সুরগুলো ভেসে বেড়াতে থাকে।
দূরে কোনো ক্যাফের দরজা খুলে আবার বন্ধ হয়।
একটা ঠান্ডা বাতাস এসে রাস্তার শুকনো পাতা উড়িয়ে নিয়ে যায়।
একসময় দৃষ্টি ধীরে violin নামিয়ে রাখে।
তারপর মৃদু হেসে বলে—
“তুমি খুব সুন্দর violin বাজাও… ঠিক আমার father-এর মতো।”
আদর চুপ করে শোনে।
দৃষ্টি আবার বলে,
“বাবার সাথেও এইভাবেই সুরে সুরে কথা হত আমাদের। অনেক রাত পর্যন্ত… আজ অনেকদিন পর আবার…”
কথাটা শেষ না করেই সে থেমে যায়।
তার মুখে হঠাৎ একটা নরম বিষণ্ণতা নেমে আসে।
যেন কোনো পুরোনো স্মৃতি এসে আলতো ছুঁয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর হঠাৎ যেন নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে বলে,
“এবার আমায় যেতে হবে। সবাই অপেক্ষা করে থাকবে। তার আগে bread আর কিছু fruits কিনতে হবে।”
সে সামনে রাখা ছোট পাত্রটার কয়েনগুলো গুছিয়ে নিজের coat-এর পকেটে রাখে।
তারপর violin box খুলে খুব যত্ন করে violin রাখতে যায়।
আর ঠিক তখনই আদর দেখতে পায়—
তার আঁকা sketchটা ভিতরে রাখা।
অদ্ভুত যত্নে।
যেন কোনো মূল্যবান জিনিস।
আদরের বুকের ভিতরটা হালকা কেঁপে ওঠে।
সে ধীরে বলে,
“আমি তোমার সঙ্গে কিছুটা পথ যেতে পারি? যদি কোথায় থাকো বলো…”
দৃষ্টি হেসে বলে,
“Of course. আমি এই market-এর পিছনের গলিতে থাকি। কাছেই। চলো।”
তারা হাঁটতে শুরু করে।
লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তা ধীরে ধীরে সরু অন্ধকার গলিতে বদলে যেতে থাকে।
দোকানগুলো একে একে বন্ধ হচ্ছে।
কোথাও shutter নামছে ধাতব শব্দ তুলে।
একটা ছোট bakery থেকে গরম পাউরুটির গন্ধ আসছে।
একজন বৃদ্ধ রাস্তার কোণে পুরোনো accordion বাজাচ্ছে।
দূরে কোথাও বৃষ্টি পড়ার শব্দ।
দৃষ্টি খুব সাবধানে পথ এগিয়ে চলেছে।
কিন্তু তার হাঁটার ভিতরে কোনো দ্বিধা নেই।
যেন অন্ধকারটাই তার বহুদিনের চেনা।
আদর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,
“আমি কি তোমার হাতটা ধরতে পারি?”
দৃষ্টি মৃদু হেসে মাথা নাড়ে।
“এই পথটা আমার চেনা। এখানে আমি একলাই চলছি বহু বছর। অসুবিধা হয় না।”
কথাটার ভিতরে এমন একটা অভ্যেস মিশে ছিল যে আদরের বুকটা আবার ভারী হয়ে যায়।
পথে একটা ছোট ফলের দোকান থেকে দৃষ্টি আপেল আর কলা কিনল।
তারপর একটা bakery থেকে bread।
দোকানদার তাকে চিনত।
হেসে বলল,
“Late today, Drishti.”
দৃষ্টি হেসে উত্তর দিল,
“Had music.”
হাঁটতে হাঁটতে আদর জিজ্ঞেস করল,
“তোমার বাড়িতে কে কে আছে?”
দৃষ্টি একটু চুপ করে থাকে।
তারপর ধীরে বলে,
“আমার মতোই… আরও কিছু ভাইবোন। আর আমার foster mom Geneva. উনি খুব অসুস্থ।”
কিছুক্ষণ পরে আবার বলে,
“My foster dad John was a wonderful musician. আর ভীষণ দয়ালু মানুষ।”
তার গলায় গভীর মমতা।
“একবার India-তে program করতে গিয়ে উনি আমাকে orphanage থেকে adopt করে আনেন। তখন আমার বয়স দুই। আমি চোখে দেখতে পেতাম না… তাই আমাকে কেউ নিতে চাইত না।”
আদর নিঃশব্দে শুনছিল।
দৃষ্টি আবার বলে,
“শুধু আমি না… আমার মতো অনেক disabled orphan child-er বাবা-মা হয়েছিলেন John আর Geneva।”
তার মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
“কিন্তু corona-র সময় dad চলে গেল। তারপর mom অসুস্থ হয়ে পড়ে। এখন আমরা আটজন আছি সেখানে।”
সে হঠাৎ হেসে বলে,
“এই যা… আমি খালি বলে যাচ্ছি। তুমি এখানে কী করতে?”
“পড়তে এসেছি,” আদর আস্তে বলে।
“কি পড়ো?”
“Engineering.”
দৃষ্টি মৃদু অবাক হয়।
“আর violin?”
আদর একটু হেসে বলে,
“ওটাই হয়তো আসল।”
একসময় তারা একটা পুরোনো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়।
গলিটার ভিতরে আলো খুব কম।
দেয়ালের plaster উঠে গেছে।
জানলার কাঁচে পুরোনো পর্দা।
তবু জানালার ভিতর থেকে উষ্ণ হলুদ আলো বেরিয়ে আসছে।
সেই আলোয় বাড়িটাকে অদ্ভুত জীবন্ত লাগছিল।
দৃষ্টি হেসে বলে,
“My house has come. Please come in.”
আদর একটু অস্বস্তিতে বলে,
“আজ থাক… অন্য একদিন—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা ছোট ছেলে দৌড়ে এসে দৃষ্টিকে জড়িয়ে ধরে।
“Sister! Sister!”
দৃষ্টি হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
আদর অবাক হয়ে ভিতরে ঢোকে।
আর মুহূর্তের মধ্যে যেন পরিবেশটাই বদলে যায়।
ছোট্ট ঘর।
পুরোনো আসবাব।
দেয়ালে বাচ্চাদের আঁকা ছবি।
এক কোণে ছোট piano।
একটা পুরোনো heater থেকে হালকা গরম বাতাস বেরোচ্ছে।
কিন্তু ঘরটা অদ্ভুত উষ্ণ।
দৃষ্টি ঢুকতেই সবাই যেন প্রাণ ফিরে পায়।
সে bag নামিয়ে রেখে বলে,
“আগে Geneva-কে বলে আসি আমি ফিরেছি। না হলে খুব চিন্তা করবে।”
তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“This is Adarsh. Came from India. My friend. তোমরা নিজেদের পরিচয় দাও, আমি আসছি।”
একটা ছোট মেয়ে এগিয়ে আসে।
বয়স দশের বেশি না।
হেসে বলে,
“I am Raka!”
তার পাশে আরেকটা ছোট ছেলে।
“He is Pillow.”
পাঁচ বছরের বাচ্চা।
একজন wheelchair-এ বসে আছে।
আরেকজন চোখে দেখতে পায় না।
একটা ছেলে কথা বলতে পারে না।
প্রত্যেকের শরীরে, জীবনে কোনো না কোনো অসম্পূর্ণতা।
তবু তাদের মুখে হাসি।
অদ্ভুত উজ্জ্বল হাসি।
যেন পৃথিবী তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে,
তবু আনন্দটা নিতে পারেনি।
আদর হঠাৎ কেমন হারিয়ে যেতে থাকে।
তার ভিতরটা অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে ওঠে।
নিজের এতদিনের জীবনটা তার হঠাৎ খুব বিলাসী মনে হয়।
সে দ্রুত বলে,
“তোমাদের সিস্টারকে বলো আমি… পরে আবার আসব।”
তারপর প্রায় হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসে।
অন্ধকার গলি থেকে বেরোতেই আবার ঝকঝকে শহর।
নিয়ন আলো।
দামী গাড়ি।
হাসতে থাকা মানুষ।
দুটো পৃথিবী পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
একটায় প্রাচুর্য।
অন্যটায় টিকে থাকার যুদ্ধ।
আদরের ফোন কাঁপছে।
বারবার।
সে যেন শুনতেই পাচ্ছিল না।
অনেকক্ষণ পরে খেয়াল হয়।
Screen-এ লেখা—
মা Calling.
ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন গলা—
“কোথায় তুমি আদর? তখন থেকে ফোন করছি। Phone not reachable!”
আদর কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
চারপাশে শহরের আলো ঝাপসা হয়ে আসে।
তার মনে হয়—আজ সে প্রথমবার সত্যিকারের পৃথিবীটাকে দেখল।
তারপর ধীরে বলে,
“আমি room-এ ফিরে phone করছি…”
ফোন কেটে দেয়।
আদর রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে।
ঠান্ডা বাতাস এসে তার চুল উড়িয়ে দেয়।
দূরে ambulance-এর সাইরেন শোনা যায়।
তারপর খুব আস্তে নিজের মনেই বলে—
“সত্যি… পৃথিবীতে এখনও অনেক জায়গা আছে…
যেখানে মানবতা, সুবিধা, সাহায্য—সত্যিই এখনও not reachable…”

🍂

Post a Comment

2 Comments

  1. AnonymousJune 04, 2026

    গল্প এখন নূতন পথে ।ভালো লাগছে।

    ReplyDelete
  2. কমলিকাJune 04, 2026

    অনেক ধন্যবাদ।🙏

    ReplyDelete