জ্বলদর্চি

প্রবীর চন্দ্র জানা (স্বাধীনতা সংগ্রামী, প্রাক্তন বিধায়ক, নন্দীগ্রাম)/ ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২১১

প্রবীর চন্দ্র জানা (স্বাধীনতা সংগ্রামী, প্রাক্তন বিধায়ক, নন্দীগ্রাম) 

ভাস্করব্রত পতি

১৯৪২ এর ৪ ঠা ডিসেম্বর ব্রিটিশ পুলিশ নন্দীগ্রামের সুবদী গ্রামে ব্যাপক অত্যাচার চালায়। সেদিন ঘোলপুকুর থেকে গভীর রাত্তে সুবদী গ্রামে হানা দিতে যাওয়ার পথে গ্রামের বাসিন্দা ভিকন মণ্ডলকে পুকুরে ফেলে দেয় এবং হৃষিকেশ মণ্ডলের বাড়িতে আক্রমণ করে। তাঁকে না পেয়ে তাঁর মাকে জলে ফেলে দেয় ব্রিটিশরা। যাবতীয় আসবাবপত্র পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি গেরস্থালির সামগ্রীও ভেঙে নষ্ট করে দেয়। সেইসাথে দারি মণ্ডল এবং বিহারী মণ্ডলের জিনিসপত্রও নষ্ট করে। এরপর ১৯৪৩ এর ২৫ শে জুন গোরাচাঁদ ঘোড়ইয়ের বাড়িতে খানাতল্লাশি করে। আর ২৬ শে জুন গ্রামের বাসিন্দা সুবোধ ঘোড়ইকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। এহেন গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রবীর চন্দ্র জানা। 

প্রবীর চন্দ্র জানা ছাড়াও এই গ্রামের অন্যান্য স্বাধীনতা সংগ্রামীরা হলেন, ঈশ্বরচন্দ্র পাল, পরমেশ্বর পাল, যোগেন্দ্রনাথ জানা, বিজয়কৃষ্ণ পাল এবং জ্যোতিন্দ্রনাথ দাস। প্রবীরচন্দ্র জানা নন্দীগ্রাম থেকে তিনবার বিজয়ী হয়ে বিধায়ক হয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি জেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এবং প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সম্পাদকও ছিলেন। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সদস্যও ছিলেন। 

১৯৫২ তে ভারতের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে প্রথম জেতেন প্রবীর চন্দ্র জানা। ১৯৫৭ এর নির্বাচনে এখানে জেতেন সিপিআই প্রার্থী ভূপালচন্দ্র পণ্ডা। ফের ১৯৬২ এর নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে জেতেন প্রবীর চন্দ্র জানা। পরে ১৯৭৭-এ জনতা পার্টির প্রার্থী হিসেবে তিনি ফের বিধায়ক হন। এই নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ২৬৩৮৮ টি ভোট। সিপিআই প্রার্থী ভূপালচন্দ্র পাণ্ডা পেয়েছিলেন ১২১৩৫ টি ভোট। 

১৯১৪ সালে সুবদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন প্রবীরচন্দ্র জানা। বাবা ইন্দ্রনারায়ন জানা এবং মা নিস্তারিণী জানা। একাধারে তিনি ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। আর অন্যদিকে তিনি ছিলেন জনসেবক। কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজে পড়ার সময় থেকেই ছাত্রনেতা হিসেবে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। 

সেসময় গান্ধিজী সহ ভারতের জাতীয় নেতৃবৃন্দের গ্রেপ্তার হলে তার প্রতিবাদে কাঁথি প্রভাত কুমার কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারি সুবোধগোপাল গুছাইতের নেতৃত্বে সেসময় যে প্রবল ছাত্র বিক্ষোভ এবং আন্দোলন কলেজ সহ সমগ্র কাঁথি শহরকে ধর্মঘটের মাধ্যমে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, তাতে প্রথম সারিতে থাকা ছাত্র নেতৃত্ব বনবিহারী পাল, মৃত্যুঞ্জয় মাইতিদের সঙ্গে ছিলেন প্রবীরচন্দ্র জানা। ১৯৪২ এর ২৩ শে আগষ্ট গ্রেপ্তার হন তিনি। কারারন্তরালে যেতে হয় তাঁকে। 

তিনি ছিলেন বিখ্যাত নিকুঞ্জবিহারী মাইতির (জন্ম : ১৮৯২ এর ২৬ শে সেপ্টেম্বর) ভাগ্না। এই মামা নিকুঞ্জবিহারীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নানা সমাজকর্ম ও সেবার মাধ্যমে কংগ্রেস রাজনীতির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব হিসেবে উঠে আসেন। স্বাভাবিকভাবেই জেলার আরেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব আভা মাইতি (জন্ম : ১৯২৩ এর ২২ শে এপ্রিল) ছিলেন তাঁর মামাতো বোন। 

তিনি যুক্ত ছিলেন জেলা কংগ্রেস এবং প্রদেশ কংগ্রেসের নানা দায়িত্বশীল পদে। বিধায়ক থাকাকালীন তিনি জেলায় প্রায় ২০০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনুমোদন করিয়ে জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করেছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি বাজকুল মিলনী মহাবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা হিসেবে মন্ত্রী আভা মাইতির অন্যতম সহযোগী ছিলেন। নন্দীগ্রাম সীতানন্দ কলেজ প্রতিষ্ঠাতেও তাঁর ভূমিকার কথা শোনা যায়। মানুষ ভোলেনি মেদিনীপুরের এই মহান মানুষ রতনটিকে। ১৯৮৮ এর ৮ ই মার্চ প্রবীরচন্দ্র জানার মৃত্যু হয়।

🍂

Post a Comment

0 Comments