মননের দর্পণে জীবনের কিছু টুকরো কথা
তৃতীয় পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
স্মৃতিচারণের মাধ্যমে চলে যাচ্ছি, আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগের কথায়- আমার শৈশবের বা বাল্যকালের আঙিনায়। বর্তমান প্রতিযোগিতামুখর যান্ত্রিক সভ্যতার তথাকথিত সুউন্নত জীবনযাত্রার সাথে যা অনেকটাই অপরিচিত একটা জীবন। বাঁশ গাছের মর্মরতা, আকাশের দিকে তাকিয়ে চরকা কাটা বুড়ি বা চাঁদের পাহাড়ে কল্পনার বাস্তবতা খোঁজা, কালবৈশাখীর ঝড়ে ঝরে পড়া আমরাশি সংগ্রহ করা, বইয়ের পাতা উল্টে তার মাঝে খুজে নেওয়া ভবিষ্যতের সুন্দর দিনের কল্পনার ছায়াপথ, কিত্ কিত্ খেলার দান ছুঁড়ে ঘর কেনার অস্থায়ী সেই বিকেল বেলা, বৃষ্টির দিনে মায়ের বকুনি খেয়ে গেটের বাইরে বড় মানপাতাকে ছাতা বানিয়ে মানভঙ্গের আশায় দাঁড়িয়ে থাকা, শীতের দিনে পড়ায় ফাঁকি দিয়ে শুধু সজাগতা জ্ঞাপক পড়ার 'গুনগুন' ফাঁকা আওয়াজটুকু জারি রেখে- লেপের মুড়ি দিয়ে আধঘুমে পড়ায় ফাঁকি দেওয়া- ইত্যাদি এরকম আরো কত কত কথা প্রায়ই মনে পড়ে।
বৈদ্যুতিক আলোর বর্তমান সার্থক ব্যবহার করার মত পরিস্থিতি তখন ঠিক ছিল না। লোডশেডিং ছিল একটা সাধারন সমস্যা। তবে তা ছিল বলেই প্রকৃতির আলোর মৃদুতা- স্নিগ্ধতা মানুষের মন পর্যন্ত সহজে পৌঁছতে পারতো।
🍂
বর্তমান ও অতীতের সমাজের পার্থক্য বা দোষত্রুটি বিচার করা এই পর্বে আমার আলোচনার লক্ষ্য নয়। হয়তো কিছু ক্ষেত্রে মনে হতেই পারে, আগের জীবনযাত্রাটা অনেকটাই পিছিয়ে পড়া জীবনের ছায়াপূর্ণ। কিন্তু তা সঠিক নয়। প্রকৃতির মাঝে প্রকৃত জীবন যতটা উপলব্ধি করা যায় বা শান্তিপূর্ণ বলে মনে হয় কৃত্রিমতার মাঝে প্রকৃত জীবনভাব ঠিক সেরকম ভাবে উপলব্ধি করা যায় না।
যান্ত্রিক সভ্যতার মাঝে থেকে মানুষের মনগুলোও ওই রোবোটিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই নিজের সাথে নিজের জগতে নিজের মতো করে বাঁচতে মানুষ এখন প্রায় আর পারেই না।
নিজেকে জগৎ মাঝে বিশেষভাবে চিহ্নিত করার বাসনায় টাকা-খ্যাতি এসব অর্জন করতে গিয়ে, প্রতিযোগিতায় সফলতা নিশ্চিত করতে গিয়ে- শৈশব কালের সরল শৈশবত্ব আর সেইভাবে থাকছে না। বাচ্চার কোমল মনটাকে প্রকারান্তরে পরিচিত করানোর চেষ্টা হচ্ছে ভবিষ্যতের নানান গুরুদায়িত্বের সাথে। বয়সের আগেই বয়সের ভার কোমল গুণাবলীর সুষ্ঠু বিকাশের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আর প্রকৃতি? প্রকৃতিকেন্দ্রিক নৈতিকতাবাদ উগ্র ভোগবাদী জীবনের কাছে হচ্ছে অবহেলিত। প্রকৃতির প্রতিও মানুষের যে নৈতিক কর্তব্য রয়েছে- তা বর্তমান কৃত্রিম সভ্যতা প্রায় ভুলতে বসেছে। মানুষের চেনা পরিবেশ হচ্ছে দূষিত।আর তার ফলেই ক্রুদ্ধ প্রকৃতিপ্রদত্ত সাজায় পৃথিবী প্রায়ই আংশিকভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি হচ্ছে। পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে মাঝে মাঝে সচেতনতামূলক কিছু পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছে বটে , তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় নেহাৎ-ই নগণ্য। প্রকৃতির সাথে পরিচিতি করানো খুব দরকার। কারণ আজ যে শিশু, সেই তো ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার রূপকার। তাই সেই শিশুকে তার শৈশব থেকেই শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়, প্রকৃতির স্নেহ ছায়ায়, প্রকৃতির মুক্ত অঙ্গনে প্রকৃতির সাথে প্রকৃত পরিচয় করানোর আবশ্যিকতা- অনুধাবন করানোর গুরুত্ব অস্বীকার করলে চলবে না।
সমাজকে সুস্থ রাখার জন্য নৈতিক মূল্যবোধসংক্রান্ত শিক্ষা যেমন প্রয়োজন, তেমনি যে পৃথিবীতে আমরা শ্বাস নিই, যা জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ- তাকে সুস্থ -সুন্দর রাখার শিক্ষারও প্রয়োজন রয়েছে।
বেঁচে থাকার জন্য আবেগেরও প্রয়োজন।বলা হয়-'বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ'- আর এটাই মানুষকে যান্ত্রিক বানিয়ে ফেলছে। এত উন্নতি চারিদিকে। এই উন্নতির সমারোহেও মানুষ কিন্তু মনুষ্যত্বের খোঁজে দিশেহারা। তাইতো প্রাচুর্যের মাঝেও সুখ নেই- শান্তি নেই। ভেতরের আসল 'আমিটা'-ই তো উপবাসী- তাই যতই জড় খিদে মেটানো হোক না কেন, সেই বুভুক্ষু তাড়না সাফল্যের মাঝেও শূন্যতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। যা শুধুমাত্র জড়প্রাচুর্য কখনোই মেটাতে সক্ষম হয় না।।
0 Comments