দুটি অণুগল্প
অনন্যা সেনগুপ্ত
সন্তু
মনের জোর সঞ্চয় করে আবার নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সমস্ত পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর, পুরো বায়োডাটাই নতুন করে সাজিয়ে সন্তু পাঠালো বেসরকারি অফিস গুলিতে। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে নানান ধরনের চাকরির পরীক্ষার জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করছিল সে। এর আগে কোনো কাজের অভিজ্ঞতা নেই তার। এবারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে সে স্থির করল, এই অফিস অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজটা করবেই। শুরুও হল কাজ। প্রতিদিন নানান অভিজ্ঞতা। ওদের কোম্পানী আসলে একটা নতুন ট্যুর কোম্পানী। সারাদিন কাজের চাপ খুবই। এদিকে আছে সিনিয়রদের চাপ। ও খাবারের বিভাগটা সামলায়। বিগত কিছু দিন, এতো কাস্টমারদের ভিড় হচ্ছে যে সে নিজে খাবার খাওয়ারও সময় পায়না। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ক্ষুধার্ত দেহে কাজে ভুল করে ফেলেছে। ওর কাছে এটা একটা সামান্য ভুল হলেও সেদিন সবার সামনে অতখানি অপমান ও সহ্য করতে পারেনি। একটা সামান্য ভুল ঠিকানা সে তো ইচ্ছে করে বলেনি, সেদিন টিফিন না খেয়ে ওর শরীর খুব খারাপ লাগছিল। পর্যটকদের সমস্ত অসুবিধের দায় ও কেন নেবে…। ওদের কোম্পানীর সাথে যে ক্যাটারার যুক্ত তারাই তো ঠিকানাটা যাচাই করে দেখেনি, তার ওপর খাবার দিতে বিলম্ব করেছিল। সময়ে খাবার না পেয়ে এক আশাতীত ঘটনা ঘটে গেল।
পদত্যাগ পত্র দিয়ে সে যখন বাড়ি ফিরল, দেখল বিছানায় তার অসুস্থ মা তার দিকে তাকিয়ে। মায়ের সুগারের ওষুধ কেনার জন্য সন্তুকে এক্ষুনি বেরোতে হবে। কিন্তু একমাস পর চাকরি না থাকার অবস্থাটা তো সন্তু কল্পনা করেনি… শুধু মায়ের মুখ নয়, বছর সাতাশের শ্রীলাকে যে সে দুমাসের মাথায় বিয়ে করার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তাহলে এবার কি হবে? সবটা শ্রীলাকে বুঝিয়ে বলতে হবে…
🍂
সেই ছেলেটা
খালধার পেরিয়ে রাস্তার দুপাশে সারি সারি নারকেল গাছ। রাতের আকাশে চাঁদের এক স্তিমিত আলো দেখা যায়। পথে নানা মানুষের মুখ স্পষ্ট। আস্তে, জোরে বিভিন্ন যান চালিয়ে মানুষ রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অনেকের হাঁটাই ভরসা। এই রাস্তা ধরে হেঁটে সোজা গেলেই কুঞ্জপুর স্টেশন। স্টেশন লাগোয়া রাস্তায় টাটকা ফুলের দোকান, ধূপকাঠির দোকান। সাজগোজের দ্রব্যের দোকানে বিভিন্ন বয়সী মেয়েদের কেনাকাটি চলছিল। তারপাশে ছোট আকারের একটা দোকানে উপহার সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। নানা রকমের পুতুল- রোগা, গোলগাল সবাই হাসি মুখে বাক্স থেকে শিশু-ক্রেতাদের যেন ডাকছে। বছর আঠাশের সমীর, মায়ের সাথে এই দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
‘সুমনের বিরিয়ানি’ থেকে তিন প্লেট মাটন বিরিয়ানি কিনে নিয়ে যাবে ও। বাড়িতে রাতে দুই বন্ধু কাঞ্চন এবং শিশিরের নেমন্তন্ন। সমীর আনন্দে তার ছোটোবেলার দুই বন্ধুকে আজ খাওয়াবে। ও কথা দিয়েছিল। একটা ভালো কিছু কাজ পেলেই ও খাওয়াবে।
সমীর একমনে বিরিয়ানির হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে ছিল। পল্লবীর খুব ইচ্ছে, ওদের বিয়েতে বিরিয়ানি খাওয়ানোর। সব ঠিক থাকলে, পুলু ক্যাটারারকে সামনের ডিসেম্বরে মেনু বানিয়ে দেখাতে যাবে। তিনটে বিরিয়ানি নেবে দোকানদারকে জানিয়েই পল্লবীকে মেসেজ করে সমীর বলল, ‘একটু বাদে বাড়ি ফিরব, রাতে একেবারে ওরা খেয়ে ফিরলে, ফোন করব।’
মেসেজ করতে করতে সমীর দেখল, একটা ময়লা জামা পরা, উসকোখুসকো চুলের ছয় সাত বছরের ছেলে ওকে দেখে কিছু খাওয়ানোর কথা বলছে। ‘হবে না, যা’ বলে সমীর প্রত্যাখ্যান করল। কিন্তু ছেলেটা ওই জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে রইল। বিরিয়ানি কিনতে যতটুকু সময় লাগে, ততক্ষণে সমীর অধৈর্য হয়ে পড়ল। ছেলেটা আরো দুইবার সমীরকে খাওয়ানোর কথা জানালো। এইবার সমীর দোকানদারকে ছেলেটির জন্যে আরেক প্লেট বিরিয়ানি প্যাক করে দিতে বলল। কিছুক্ষণ কথা বলল ছেলেটির সাথে।
-তুই খাবি?
‘হ্যাঁ?’
-বাবা মা নেই?
‘বাবা আছে।’
-বাবা কাজ করে?
‘হ্যাঁ, বাবা মরা কাটে।’
সাথে সাথে সমীরের চোখের সামনে শ্মশান, লাশকাটা ঘরের ছবি ভেসে উঠল। মরা কাটার প্রক্রিয়াটা ভেবে খুব অসুস্থ বোধ করল ও। চারপাশের রাস্তাঘাট, বিরিয়ানির গন্ধ প্রেতভূমি হয়ে উঠলো ওর কাছে। ভেতর থেকে গা পাক দিতে শুরু করল সমীরের। বিরিয়ানিটা নিয়ে ছেলেটা রাস্তার জনতার সাথে কোথায় যেন মিশে গেল।
সমীর সে রাতে নিমন্ত্রিত বন্ধুদের সাথে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারলো না। একটা অস্বস্তি ওর সারা শরীরে চেপে বসে আছে। চোখে ভেসে আসছে সেই ছেলেটার মুখ। রাতে ঘুম এলো না সমীরের। অথচ এই অবস্থাটা দুই বন্ধুকে বোঝাতে পারল না সে। ঘড়ির কাঁটা পা বাড়ালো।
0 Comments