জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি/ পর্ব ১৪/প্রীতম সেনগুপ্ত

ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি 

পর্ব ১৪

প্রীতম সেনগুপ্ত


পাশ্চাত্যে বেদান্ত প্রচারের এক সার্থক ঋত্বিক 

-----------------------------------------------------------                   ইতিহাসের পথ ধরে এগোলে আমরা দেখতে পাই, ১৯০২ সালের ৬ জুন মার্কিন মুলুক ছেড়ে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন স্বামী তুরীয়ানন্দ। রেঙ্গুনে পৌঁছে তিনি স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যুসংবাদ খবরের কাগজে দেখে খুবই মর্মাহত হন। এদিকে স্যান ফ্রান্সিসকো বেদান্ত সোসাইটির প্রেসিডেন্ট মিস্টার এম এইচ লোগান স্বামীজীর কাছে ভগ্নস্বাস্থ্য তুরীয়ানন্দজীর পরিবর্তে অপর একজন সন্ন্যাসী পাঠাতে আগেই অনুরোধ করেছিলেন। স্বামীজী স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দকে মনোনীত করেন এবং তার অব্যবহিত পরে ৪ জুলাই ১৯০২ সালে দেহত্যাগ করেন। ত্রিগুণাতীতানন্দজী ‘উদ্বোধন’-পত্রিকার সম্পাদনার কাজ স্বামী শুদ্ধানন্দের উপর সমর্পণ করে নভেম্বর মাসে কলম্বো- জাপান হয়ে ২ জানুয়ারি ১৯০৩ স্যান ফ্রান্সিসকোতে উপস্থিত হন। 

     স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ সোমবার সন্ধ্যায় গীতা ও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপনিষদ ক্লাস এবং রবিবার সকাল ও সন্ধ্যায় বক্তৃতা শুরু করেন।  শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ শিষ্যের আগমনে ভক্তমহলে খুব সাড়া পড়ে গেল। জনসমাগম প্রচুর হওয়ায় ত্রিগুণাতীতানন্দজী ও ভক্তেরা জমি ক্রয় করে মন্দির নির্মাণ করতে মনস্থ করেন। ১৯০৬ সালের ৭ জানুয়ারি মন্দিরের উদ্বোধন হয়। এটি পাশ্চাত্যের প্রথম হিন্দু মন্দির এবং এখনো তা স্যান ফ্রান্সিসকো শহরের ঐতিহাসিক চিহ্নিত স্থান। মন্দির প্রতিষ্ঠাকালে ত্রিগুণাতীতানন্দজী বলেন: “ যদি এ-মন্দির ঠাকুরের ইচ্ছায় হয়ে থাকে তাহলে এটি তার কাজের জন্য দীর্ঘকাল দণ্ডায়মান থাকবে।” আশ্চর্যের বিষয় ১৯০৬ সালের এপ্রিল মাসে স্যান ফ্রান্সিস্কোর ভয়াবহ ভূমিকম্প ও অগ্নিকাণ্ড হিন্দু মন্দিরের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। 

স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ নতুন মন্দিরে সাধুনিবাস গড়ে তুললেন। দশ জন পুরুষ ভক্ত বাইরে কাজ করত এবং তার অধীনে ভারতের ব্রহ্মচারীদের মতো জীবন যাপন করত। তিনি নিজে রান্না করে খাওয়াতেন, শ্রীরামকৃষ্ণের পুণ্য জীবন কথা শোনাতেন এবং নানাবিধ নীতিবাক্য ছাপিয়ে শিক্ষা দিতেন। তাঁর প্রিয় নীতিবাক্যগুলি হল --- ১. সাধুর মতো জীবন যাপন করবে কিন্তু ঘোড়ার মত কাজ করবে। ২. এই কাজটি এখনই কর। ৩. সদা সজাগ থাক ও প্রার্থনা কর এবং ৪. কর বা মর, কিন্তু করলে তুমি মরবে না।

১৯০৪ সালে স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দজী লস এঞ্জেলেসেও প্রচারকার্য শুরু করেন। কিন্তু স্যান ফ্রান্সিসকো আশ্রম চালিয়ে ৫০০ মাইল দূরে আরেকটা আশ্রম চালানো কষ্টকর হওয়ায় তিনি বেলুড় মঠ থেকে একজন সহকারী চাইলেন। তদনুযায়ী স্বামী সচ্চিদানন্দ আসেন কিন্তু এক বছরের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি দেশে ফিরে যান। ১৯০৬ সালে স্বামী প্রকাশানন্দ ত্রিগুণানতীতানন্দজীকে সাহায্য করতে স্যান ফ্রান্সিসকোতে আসেন। স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করতেন। সকলের শেষে শুতেন এবং সকলের আগে উঠতেন। তার কোনো বিছানা ছিল না। মেঝেতে কার্পেটের উপর কম্বল বিছিয়ে, নিজ বাহুতে মাথা রেখে শুতেন এবং উপরে আরেকটা কম্বল থাকত। সকালে কম্বল দুটি ভাঁজ করে অফিসের টেবিলের নিচে রাখতেন।

🍂

জোসেফ হারভাথ নামে এক হাঙ্গেরীয় যুবক বাইরে এক প্রেসে কাজ করত এবং আশ্রমে থাকত।  হারভাথের সাহায্যে হিন্দু মন্দিরের নিচের তলায় ছাপাখানার যন্ত্রাদি কিনে মুদ্রণ কার্য শুরু করেন। দূরস্থ ও কর্মব্যস্ত ভক্তরা যাতে বেদান্তের বাণী জানতে পারে সেজন্য তিনি ‘Voice of Freedom’’নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর ভূমিকায় তিনি লেখেন -- ‘আমাদের হৃদয়ের অন্তরতম তন্ত্রী ঝঙ্কৃত হোক। এটি এমন সুরে ঝঙ্কৃত হোক, যাতে আমরা সকলে একবাক্যে মুক্তির বিশ্বসঙ্গীত গাইতে পারি। এস, আমরা মুক্তির ভাষায় কথা বলি। এস, আমরা মুক্তির আলোকে চিন্তা করি। এস, আমরা মুক্তির বলে কাজ করি।’ এই পত্রিকা এপ্রিল ১৯০৯ থেকে মার্চ ১৯১৬ সাল পর্যন্ত চলে। শ্রীম কর্তৃক অনূদিত ‘ The Gospel of Sri Ramakrishna’-এর প্রথম খণ্ড (আমেরিকান সংস্করণ) স্বামী-স্ত্রীগুণাতীতানন্দের চেষ্টায় স্যান ফ্রান্সিসকো থেকে বের হয়। ত্রিগুণাতীতানন্দজী স্যান ফ্রান্সিসকো থেকে দেড় ঘন্টার পথ কংকর্ডে একটা বেদান্ত উপনিবেশ গড়ার মনস্থ করেন, যেখানে ভক্তেরা বৃদ্ধবয়সে অবসর জীবন যাপন করবেন। ২০০ একর জমি ক্রয় করে সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা হলো এবং বেদান্ত সোসাইটির জন্য ২৫ একর জমি বরাদ্দ হলো, যেখানে মন্দির ও গ্রন্থাগার থাকবে। ভক্তেরা স্ব স্ব ভূমিতে গৃহনির্মাণ, কূপখনন, সবজি ও ফলফুলের বাগান প্রভৃতি তৈরি শুরু করল। প্রতি শনিবার ত্রিগুণাতীতানন্দজী ভক্তদের নিয়ে ধর্মপ্রসঙ্গ করতেন। 

১৯১৪ সালের প্রথম থেকে ত্রিগুণাতীতানন্দজী অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতার দরুন বক্তৃতার সময় তাঁর কণ্ঠস্বর কাঁপত। কিন্তু রামকৃষ্ণ মিশনের এই বার্তাবহ দৈহিক যন্ত্রণা অগ্রাহ্য করে ঠাকুরের কাজ করে যেতেন। ক্রমে ১৯১৪ সালের বড়দিনের উৎসব এল। সকাল ৬টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত এই উৎসব চলত। ২৫ ডিসেম্বর ত্রিগুণাতীতানন্দজী সকাল ১১টা, বিকাল ৩টা ও সন্ধ্যা ৬টায় বক্তৃতা দেন। স্তবপাঠ, সঙ্গীত ও ধর্মগ্রন্থ ব্যাখ্যা করেন। ক্রিসমাসের দুদিন পরে রবিবাসরীয় অপরাহ্ন বক্তৃতার সময় এক বিকৃতমস্তিষ্ক যুবক তাঁর উপর বোমা নিক্ষেপ করে। গুরুতররূপে আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। একজন সেবক দিনরাত তাঁর কাছে থাকত। তিনি ওই যন্ত্রণার মধ্যে মিসেস পিটারসনকে ঠাকুরের মন্দিরের বেদি মেরামত করতে বলেন এবং ওই হতভাগ্য যুবকটির জন্য অনুশোচনা করেন। ১০ জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দের জন্মতিথির দিন সন্ধে ৭:৩০ মিনিটে স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দজী মর্ত্যলীলা শেষ করে রামকৃষ্ণলোকে চলে যান।

তাঁর দেহাবশেষ এক বছর পর উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার শান্তি আশ্রমের সিদ্ধগিরিতে সংস্থাপন করেন স্বামী প্রকাশানন্দ ও অন্যান্য ভক্তেরা। বিদেশে এক মরুপ্রান্তরে নির্বাক সাক্ষী হয়ে থাকল তাঁর দেহাবশেষ। কিন্তু তাঁর অমরবাণী চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল: খুব কাজ কর।  নিজেকে সংযত কর। চরিত্র গঠন কর। শেষ পর্যন্ত সহ্য কর।আত্মজ্ঞান লাভ কর এবং মুক্ত হও।

স্বাম ত্রিগুণাতীতানন্দ পাশ্চাত্যে শ্রীরামকৃষ্ণের মিশন বহন করে শহীদ হয়ে রইলেন এবং পাশ্চাত্যে বেদান্ত প্রচারের ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল প্রতিভূরূপে চিরস্মরণীয় হয়ে রইলেন।

(তথ্য সহায়তা: পাশ্চাত্যে শ্রীরামকৃষ্ণের পাঁচ শিষ্য -- স্বামী চেতনানন্দ, উদ্বোধন: পুরাতনী, বইমেলা ২০০৬ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত বিশেষ সাহিত্য সংখ্যা)

Post a Comment

0 Comments