দ্বিতীয় পর্ব
কলি সাহু চৌধুরী
God has taken his time to create Ladakh!
আমরা যে সময় গিয়েছিলাম,সেটা ছিল পূর্নিমার সপ্তাহ, ৪৮ ঘন্টা শরীরের বিশ্রাম হেতু প্রথম দিন বিকেলে চারপাশে একটু হেঁটে হোটেলের ব্যালকনিতে বসে আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছি,ওখানে রাত আসে দেরীতে।
হঠাৎ আমাদের সামনের পাহাড়ের মাথা আলো করে পপলার গাছের ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে গোল মস্ত বড় থালার মতো চাঁদ আ্ঃ কী অপূর্ব দৃশ্য!
সেই চাঁদের আলোয় নীচের লেহ শহরের ইতস্তত জনপদ, ঘর বাড়ি আর দূরের পাহাড়শ্রেনীকে মনে হচ্ছিল কেউ এঁকেছেন। সামনে খোলা চাঁদ ভাসি উপত্যকা পিছনে আরও খাড়া পাহাড়।
জোৎস্না রাতে পাহাড়ের দিকে চেয়ে চুপ করে বসে আমরা নিজেদের মনে অনেক কথা ভাবছিলাম। কত কী যে ভাবা যায় বুঝি এমন এমন সময়ে আপন মনে অতীত,ভবিষ্যৎ, অসহায়তা ,সুখ, দুঃখ,হতাশা এবং আশাকেও নেড়েচেড়ে দেখা যায়। তনিমা ওর ফোনে নাইট মোডে চেষ্টা করলো এই অপাথির্ব সৌন্দর্য কে ক্যামেরা বন্দি করার।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠান্ডা হাওয়াটা বেশ জোরে বইতে শুরু করল। পপলার গাছগুলোর ডালপালা কাঁপিয়ে একটা মিষ্টি শিরশিরে আওয়াজ তুলে হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল আমরা দুই চা-পাগল (আমি আর তনিমা) আর দেরি না করে রুমে ঢুকে গরম গরম চা নিয়ে আরাম করে বসলাম। বাইরে ঠান্ডা বাড়ছিল,আর হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ—সেই মুহূর্তটা বেশ উপভোগ করছিলাম।
🍂
পরের দিন খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আমরা একটু হাঁটতে বেরোলাম।বাজারের দিকটা ঘুরে এলাম। তখনও দোকানপাট খোলেনি,এখানে ঠান্ডার জন্য বেশ বেলাতেই দোকান খোলে।চারপাশ বেশ শান্ত,লোকজনও খুব একটা বেরোয়নি,পাহাড়ি সকালের সেই নির্জন পরিবেশ বেশ ভালো লাগছিল আমাদের।
লাদাখে আসার আগে শ্বাসকষ্ট,মাথা ঘোরা,অক্সিজেনের সমস্যা—এসব নিয়ে কত কথাই না শুনেছিলাম।তাই মনেও একটু চিন্তা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়,আমাদের সকলেরই শরীর একদম ঠিকঠাক ছিল। হাঁটাহাঁটি করেও কোনো কষ্ট হলো না,মাথাও ঘোরেনি।তখন মনে হলো যাক বাবা, লাদাখ আমাদের ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে। মনটাও বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল। সামনে যে আরও কত নতুন অভিজ্ঞতা আর অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য অপেক্ষা করে আছে,সেই ভাবনাতেই আমরা বেশ খুশি মনে হোটেলে ফিরে এলাম।
কথামত সকালে ৯ টায় আমাদের ড্রাইভার করমা ভাইয়া এসে জিজ্ঞেস করল শরীর কেমন? আমরা আশেপাশে যেতে পারব কিনা; তাহলে কয়েকটি দ্রষ্টব্য স্থান আমাদের দেখিয়ে আনবে। আমরা কিছুটা সময় চেয়ে নিয়ে তৈরি হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলাম।
শহর ছাড়িয়ে একটু খানি যাওয়ার পর এদিকের পাহাড় থেকে ওই দূরে বিশ্ব শান্তি স্তূপা দেখা যাচ্ছে,গাড়ি থেকেই টপাটপ মোবাইলে ফটো তুলতে লাগলাম,পরে ওখানে গিয়ে মনে হলো শুধু শুধু মোবাইলে space ভরে ফেললাম,এখান থেকে তো আরও অনেক অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। আসলে এটাই লাদাখ ট্রিপ এর মজা! যেমন খুশি, যেখানে খুশি ফটো ক্লিক করুন,এক কথায় সব দৃশ্যই অপূর্ব!কোন দিকে ছেড়ে কোন দিক দেখবেন,চেয়ে থাকবেন অবর্ণনীয়!
শান্তিস্তূপা খুব বেশী পুরনো নয়,১৯৯১ তে তৈরী করেছেন জাপানি ভিক্ষুক গোমো নাকামুরা,জানলাম ওখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই সমান উপভোগ্য! লেহ মেন বাজার থেকে মাত্র ৩-৪ কিলোমিটার এর মধ্যেই অবস্থিত।সাধারনত পর্যটকরা শান্তি স্তুপা দুটো কারণে দর্শন করে, ধর্মীয় স্থান এবং সমুদ্র তল থেকে ৩৬০০ মিটার উপরে , ৫০০ টি স্টেপ হেঁটে শান্তি স্তুপের উপরে পৌঁছে অসাধারণ ভিউ অপার শান্তি! মেডিটেশন এর জন্য আলাদা জায়গা আছে।
আমি ওখানে এক বাঙালি দম্পতিকে দেখলাম যাঁদের বয়স ৭০ পেরিয়েছে তো বটেই!কিন্তু উনারা ব্লগ করছিলেন, আর ভদ্রমহিলা তাঁর স্বামীকে জিজ্ঞেস করছেন আচ্ছা এখানে caption টা কি দেওয়া যায় বলতো। ভাবলাম আমরা কত না প্ল্যান পোগ্ৰাম করি, এই হবে,ওই ভয়!কিন্তু বাড়ি থেকে বেরলেই কত শত অভিজ্ঞতায় ঝুলি ভরে ওঠে যা আমাদের রিচার্জ করে দেয়।
এবারের গন্তব্য ছিল লেহ প্যালেস বা রয়্যাল প্যালেস। লেহ বাজারের একেবারে মাথার উপর পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন রাজপ্রাসাদ দূর থেকেই চোখে পড়ে। উপরে উঠতেই মনে হলো যেন গোটা লেহ শহরটা হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। চারদিকে পাহাড়, নীচে ছোট ছোট বাড়িঘর, আর মাঝখানে বিস্তৃত লেহ শহর, দৃশ্যটা মন ভরিয়ে দেওয়ার মতো।
১৭শ শতকে নামগয়েল রাজবংশের রাজা Sengge Namgyal এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন,তিব্বতি স্থাপত্যের আদলে তৈরি এই নয় তলা প্রাসাদকে অনেকেই লাসার Potala Palace-এর ছোট সংস্করণ বলেও মনে করেন। সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। তবে দিনের পাশাপাশি রাতেও এর আলাদা সৌন্দর্য আছে,লেহ বাজারে ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়ের গায়ে আলোয় সাজানো প্যালেসটিকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। আমরা এখানে একজন গাইড নিয়েছিলাম। তাঁর কাছ থেকেই অনেক গল্প শোনা গেল,প্যালেসের উপরের তলাগুলোতে রাজপরিবারের সদস্যরা থাকতেন। আর নীচের তলাগুলো ব্যবহার হতো খাদ্যশস্য মজুত রাখা আর ঘোড়া রাখার আস্তাবল এবং বিভিন্ন কাজের জন্য। পুরো প্রাসাদটিই মূলত কাঠ, পাথর আর মাটি দিয়ে তৈরি।এখন বড় বড় ঘরগুলোর অনেকটাই প্রদর্শনী কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়,কিছু পুরনো দেওয়ালচিত্র বা ম্যুরাল এখনও অতীতের স্মৃতি বহন করে চলেছে।
একসময় এই প্যালেসই ছিল লাদাখের রাজাদের প্রধান বাসস্থান,পরে নামগয়েল রাজপরিবার Stok Palace-এ চলে গেলে ধীরে ধীরে প্রাসাদের গুরুত্ব কমতে থাকে। পরবর্তীকালে ডোগরা বাহিনীর দখল নেয় এই অঞ্চল। আজ অবশ্য এটি লাদাখের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
প্যালেসের উপরে একটি বিজয় স্তম্ভও রয়েছে।শোনা যায়,লাদাখি সৈন্যদের সাহসিকতার স্মৃতিতে এটি নির্মিত হয়েছিল। বহু শতাব্দী আগের যুদ্ধের ইতিহাস আজও বহন করে চলেছে এই পাহাড়চূড়া।
প্যালেস ঘুরতে ঘুরতে দূরের আরেকটি উঁচু পাহাড়ের মাথায় পুরনো একটি প্রাসাদ দেখতে পেলাম,তার থেকেও বেশি অবাক হয়েছিলাম স্থানীয় মানুষদের দেখে। খাড়া পাহাড়ি পথ ধরে অনায়াসে হেঁটে উঠছেন তারা, এমনকি বয়স্করাও,কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করতেই উত্তর মিলল 'আমরা গাঁওয়ালা, এসব আমাদের রোজকার অভ্যেস!'শুনে সত্যিই অবাক হয়েছিলাম।
প্যালেস থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নীচের লেহ শহরকে আরেকবার চোখ ভরে দেখে নিলাম। তারপর সবাই মিলে কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম স্মৃতি হিসেবে। সারাদিনের ঘোরাঘুরি আর পাহাড়ে ওঠানামার ক্লান্তি তখন শরীরে ভালোই টের পাচ্ছি,তাই সেদিনের মতো ক্লান্ত সবাই গাড়ীতে উঠে সোজা হোটেল।
টিপস :
1:হাই অল্টিটিউডে গেলে সঙ্গে একটু কর্পূর রাখতে পারেন। শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা মাথা ভার লাগলে কর্পূরের গন্ধ শুঁকে অনেকেই সাময়িক স্বস্তি পান।
2:শান্তি স্তুপ এবং লেহ প্যালেস দুটোই লেহ মেন মার্কেট এর কাছাকাছি।
3:হোটেল মার্কেটের কাছে নেওয়াই ভালো।
0 Comments