জ্বলদর্চি

চিন দেশের গল্প: ৫ (মায়াবী পাখি)/বাংলা ভাষান্তর : নিখিলেশ ঘোষ

চিন দেশের গল্প: ৫ (মায়াবী পাখি)
/বাংলা ভাষান্তর :  নিখিলেশ ঘোষ

(একটি মঙ্গোলীয়  লোককথা। মূল চিনা ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন : জন মিনফোর্ড)


বহু বহু বছর আগের কথা। চীন দেশের উত্তর প্রান্তে ছিল এক গহীন পাহাড়ি বন। সেই বনের ঘন সবুজ ডালপালার আড়ালে বাস করত এক অদ্ভুত মায়াবী পাখি। এই পাখিটি কেবল অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং চতুরই ছিল না, বরং মানুষের মতো স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারত।

এই অলৌকিক পাখির কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। দূর-দূরান্তের দেশের বড় বড় রাজা মহারাজার  কানে যখন এই খবর পৌঁছাল, এমন এক দুর্লভ পাখিকে নিজের প্রাসাদের খাঁচায় বন্দী করার জন্য তারা মরিয়া হয়ে উঠলেন।। কিন্তু কেউই সফল হননি।অদ্ভুত বিষয় ছিল এই যে, মায়াবী পাখিটি কখনো উড়ে চলে যেত না। এটিকে সবসময় একটি প্রাচীন পাইন গাছের ঘন সবুজ ডালপালার মধ্যে বসে মিষ্টি সুরে গান গাইতে দেখা যেত।

এই মায়াবী পাখির খবর পূর্ব দেশের  পরাক্রমশালী শাসক, ইর্তেগেল খানের কানে পর্যন্ত পৌঁছাল। তিনি বললেন: "কী অসাধারণ ই না পাখিটি! লোকে বলে,কেউ  নাকি এটিকে ধরতে পারবে না। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে আমি চেষ্টা করলে ঠিক ধরতে পারব।" এই বলে তিনি রওনা হলেন।

ইর্তেগেল উত্তরের পাহাড়ি বনের মধ্য দিয়ে  ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে  শুরু করলেন যতক্ষণ না তিনি সেই প্রাচীন পাইন গাছের কাছে পৌঁছালেন। সেখানে এর ঘন সবুজ ডালপালার মধ্যে জাদুকরি পাখিটি বসে ছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হল পাখিটি কোনো ভয় পায়নি এবং পালিয়ে যাওয়ার কোনো চেষ্টাও করেনি, বরং সামান্যতম প্রতিরোধ ছাড়াই নিজেকে ধরা দিতে দিল।

 ইর্তেগেল তো খুব সন্তুষ্ট হলেন। যখন তিনি পাহাড়ের দুর্গম পথ ধরে বাড়ি ফিরছিলেন, তখন মায়াবী পাখিটি বলল: "মহামান্য! আপনি হয়তো আমাকে বেশ সহজেই ধরে ফেলেছেন, কিন্ত মনে রাখবেন, চলার পথে কোনো দীর্ঘশ্বাস বা নীরবতা থাকা চলবে না, অন্যথায় আমি চোখের নিমেষে উড়ে চলে যাব। তাই আমরা যখন হাঁটছি, আমাদের মধ্যে একজনকে কিছু বলতে হবে।" একথা শুনে ইর্তেগেল কিছুটা অবাক হলেও হেসে বললেন, "ঠিক আছে। তাহলে তুমিই কিছু বলো!" পাখিটি তখন তার রঙিন ডানা দুটি একটু ঝাপটে বলল, "খুব ভালো। তবে শুনুন মহামান্য, আপনাকে আমি এক চমৎকার গল্প শোনাই।"এই বলে মায়াবী পাখিটি পাহাড়ি পথের নীরবতা ভেঙে গল্প বলতে শুরু করল।
🍂
এক দেশে ছিল এক নামকরা শিকারী। তাঁর যেমন ছিল নিখুঁত নিশানা, তেমনই ছিল এক বিশ্বস্ত শিকারী কুকুর। একদিন যখন তিনি তাঁর কুকুরকে নিয়ে শিকারে যাচ্ছিলেন তখন দেখলেন একটি উপত্যকায় সোনা, রুপো এবং মূল্যবান জিনিসে বোঝাই একটি একটি গরুর গাড়ি ভেঙে পড়ে রয়েছে। তার পাশে চিন্তিত হয়ে বসে ছিলেন গাড়ির মালিক। শিকারী এবং গাড়ির মালিক একে অপরকে অভিবাদন জানালেন, তামাকের ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে সুখ-দুঃখের আলাপ জুড়ে দিলেন। কিছুক্ষণ গল্প করার পর গাড়ির মালিক বললেন ' ওহে বন্ধু, আমি একজন মিস্ত্রীকে পাশের গ্রাম থেকে ডেকে আনবো।আমার এই গাড়িটি মেরামত করা দরকার। আমি পাশের গ্রামে যাচ্ছি একজন মিস্ত্রি ডাকতে। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আপনি আর আপনার এই বিশ্বস্ত কুকুরটি কি আমার এই ধন-সম্পদে ঠাসা গাড়িটি একটু পাহারা দেবেন?" শিকারী সানন্দে রাজি হয়ে বললেন, "অবশ্যই দেব, আপনি নিশ্চিন্তেষপপ্র যান।"আশ্বস্ত হয়ে গাড়ির মালিক পাহাড়ের চূড়ার পথ ধরে গ্রামের দিকে রওনা দিলেন। আর শিকারী তাঁর কুকুরটিকে নিয়ে সেই নির্জন উপত্যকায়  অপেক্ষা করতে লাগলেন।

 এদিকে সন্ধ্যা নামল। কিন্তু তখনও গাড়ির মালিকের আশার কোন খবর নেই। শিকারি তো বড়ই চিন্তায় পড়ল। মনে মনে ভাবল: 'বুড়ো মা ভালো করে চোখে দেখতে পায় না। আমার ভয় হচ্ছে যে আজ সকাল থেকে তিনি নিজের জন্য রান্না করে কিছু খেতে পারেননি।' তাই সে তার কুকুরকে বলল: 'তুমি এখানে থাকো এবং গাড়ির মালিক ফিরে না আসা পর্যন্ত গাড়িটি পাহারা দাও।আর চোরদের থেকে সাবধান থেকো! আমি মায়ের জন্য খাবার রান্না করতে বাড়ি যাচ্ছি।' একথা বলে সে বাড়ি চলে গেল।"কুকুরটি বিশ্বস্ততার সাথে তার মালিকের নির্দেশ পালন করল।সে বলদটির ওপর কড়া নজর রাখল, যাতে এটি কোনোভাবেই এদিক-ওদিক চলে না যায়।এবং সে একজন দায়িত্বশীল নৈশপ্রহরীর মতো ক্রমাগত গাড়িটির চারপাশে ঘুরতে লাগল।"এদিকে গাড়ির মালিক বেশ কয়েকটি গ্রামে গিয়েছিল, কিন্তু তার গাড়ি মেরামতের জন্য কাউকে খুঁজে পেতে পেতে মধ্যরাত হয়ে গেল।

যখন সে ফিরে এল, সে দেখল যে শিকারী চলে গেছে এবং গাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য তার বিশ্বস্ত কুকুরটিকে রেখে গেছে।সে কুকুরটির প্রশংসা করল, তাকে পুরস্কার হিসেবে কিছু রূপো দিল এবং তাকে বাড়ি যেতে বলল।কুকুরটি যখন বাড়ি পৌঁছাল, শিকারী দরজায় তার জন্য অপেক্ষা করছিল।তার মালিককে দেখে কুকুরটি তার মুখ থেকে রূপো মাটিতে ফেলে দিল।রূপো দেখে শিকারী প্রচণ্ড রেগে গেল।' আমি তোমাকে গাড়ির মালিকের জিনিসপত্র দেখাশোনা করতে বলেছিলাম,' সে চিৎকার করে বলল, 'কিন্তু তার বদলে তুমি লোকটার রূপো চুরি করেছ!'সে একটি বড় লাঠি হাতে নিল এবং কুকুরটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলল!"

" হায়!" খাঁ সাহেব বললেন। "শিকারী কতটা অন্ধ ছিল! এমন এক বিশ্বস্ত কুকুরকে মেরে সে কত বড় ভুলই না করল!" তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"দেখো! তুমি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছ! আমার কথার খেলাপ করলে তাই আমি তোমাকে ছেড়ে চললাম।" মায়াবী পাখিটি একথা বলে সাথে সাথেই উড়ে চলে গেল।খাঁ সাহেব পাখির দেওয়া সতর্কবার্তা ভুলে যাওয়ার জন্য নিজেকে ধিক্কার জানাতে লাগলেন।
            
তিনি মায়াবী পাখিকে ধরার জন্য আবার উত্তরের পাহাড়ি বনে ফিরে গেলেন এবং আবারও সেই জাদুকরী পাখিটিকে আঁকড়ে ধরে ফেললেন। পাখিটি আগের মতোই এক প্রাচীন পাইন গাছের ঘন সবুজ ডালে বসে মিষ্টি সুরে গান গাইছিল। পাখিটি আবার তাকে ইর্তেগালকে পুনরায় সতর্ক করে বলল," চলার পথে আবার যেন দীর্ঘশ্বাস না ফেল।আচ্ছা, তোমার যাত্রা পথের কষ্ট লাঘব করার জন্য তোমাকে অন্য একটি গল্প বলি।"
          
এক দেশে এক গৃহবধূ তাঁর অতি আদরের ও বিশ্বস্ত বিড়ালটিকে তার ঘুমন্ত শিশুর পাহারায় রেখে কুয়ো থেকে জল আনতে গেলেন। যাওয়ার আগে তিনি বিড়ালটিকে বললেন: 'দোলনায় থাকা শিশুটির ভালো যত্ন নিও।'তিনি চলে যাওয়ার পর, বিড়ালটি দোলনার পাশে শুয়ে পরম যত্নে মাছি ও মশা তাড়াচ্ছিল। এমন সময় এক মস্ত ইঁদুর দরজার আড়াল থেকে বেরিয়ে শিশুর কান কামড়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। তা দেখে ক্ষিপ্ত বিড়ালটি ইঁদুরটিকে তাড়া করে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল।

কিন্তু নিয়তির কী পরিহাস! বিড়ালটি যখন বাইরে ছিল তখন অন্য এক রাক্ষুসে ইঁদুর এসে ঘুমন্ত শিশুর একটা কান কামড়ে ছিঁড়ে ফেলল। ব্যথায় চিৎকার করে কেঁদে উঠল অবোধ শিশুটি। সেই আর্তনাদ শুনে বিড়ালটি তিরের বেগে ঘরে ফিরে এলো এবং দ্বিতীয় ইঁদুরটিকে কোণঠাসা করে কামড়ে মেরে ফেলল।

তারপর বিড়ালটি আবার দোলনার পাশে গিয়ে শান্ত ভাবে বসল এবং শিশুটির কান থেকে রক্ত চেটে পরিষ্কার করতে লাগলো।ঠিক সেই মুহূর্তে জল নিয়ে ঘরে ফিরলেন সেই মা। তিনি দেখলেন, দোলনার পাশে বসে বিড়ালটি রক্ত চাটছে। রাগে, অন্ধ ক্ষোভে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তিনি ভাবলেন বিড়ালটিই তাঁর সন্তানের এই দশা করেছে।  তিনি লাঠি দিয়ে আঘাত করে তাঁর সেই পরম বিশ্বস্ত প্রাণীকে তখনই মেরে ফেললেন। তিনি বিড়ালটিকে পিটিয়ে মেরে ফেললেন। কিন্তু যখন তিনি পিছন ফিরে তাকালেন এবং দরজার পিছনে মরা ইঁদুরটিকে তার শিশুর কান মুখে নিয়ে পড়ে থাকতে দেখলেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে বিড়ালটিকে মেরে তিনি ভুল করেছেন, এবং কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

পাখির মুখে এই করুণ কাহিনী শুনে খাঁ সাহেব আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন, "হায়! মানুষটা কত বড় অন্ধ ছিল! এমন এক বিশ্বস্ত অবলা জীবকে মেরে সে কত বড় পাপই না করল!" অমনি খাঁচার ভেতর থেকে জাদুকরী পাখিটি ডানা ঝাপটে হেসে উঠল, "দেখো মহামান্য! তুমি নিজের শর্ত ভুলে আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলেছ!" সুতরাং আমি চললাম। এই না বলেই পাখিটি চোখের পলকে খাঁচার ফাঁক গলে মুক্ত আকাশে ডানা মেলল এবং মেঘের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল।

ইর্তেগেল খাঁয়ের খুব ইচ্ছে  পাখিটিকে নিজের কাছে রাখবেন তাই তিনি পুনরায় উত্তরের পাহাড়ি বনে গেলেন, পাখিটি হেসে উত্তর দিল ইর্তেগেল, তুমি আবার আমায় ধরতে এসেছ। দেখি তুমি আমায় ধরে রাখতে পারো কিনা।" 
ইর্তেগেল প্রাচীন পাইন গাছ থেকে জাদুকরী পাখিটিকে  আবার ধরলেন এবং আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে ফিরে চললেন।
পথের মধ্যে পাখিটি তাকে আরেকটি গল্প বলল।

"এক বছর খুব কম বৃষ্টি হয়েছিল এবং খরা দেখা দিয়েছিল। আলবাই নামের এক ব্যক্তি দুর্ভিক্ষ থেকে বাঁচতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। যখন তিনি পথ চলছিলেন, তখন সূর্যের তাপ ছিল প্রচণ্ড প্রখর। গরমে তার জিব শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল এবং তৃষ্ণার কারণে তিনি প্রায় নড়াচড়াও করতে পারছিলেন না। তিনি একটি উঁচু পাহাড়ের খাঁজের নিচে বসে পড়লেন এবং মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। হঠাৎ তিনি কাছেই টুপটাপ শব্দ শুনতে পেলেন এবং পাহাড়ের চূড়া থেকে জল চুঁইয়ে পড়তে দেখলেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে, আলবাই জল সংগ্রহ করার জন্য দ্রুত তার কাঠের বাটিটি বের করলেন। তিনি কোনোমতে এক বাটি জল সংগ্রহ করেছিলেন এবং সেটি পান করতে যাবেন, ঠিক তখনই একটি কাক পাশ দিয়ে উড়ে গেল এবং তার ডানা দিয়ে বাটিটি উল্টে দিল।আলবাই ভীষণ রেগে গেলেন। 'ঈশ্বর আমার প্রতি দয়া করে আমাকে জল দিয়েছিলেন!' তিনি চিৎকার করে উঠলেন।
'ফোঁটা ফোঁটা করে আমি এটি সংগ্রহ করলাম, আর তারপর ওই দুষ্টু বুড়ো কাকটা এসে 
সব ফেলে দিল!’ সে একটি পাথর তুলে নিল, কাকটির পিছনে দৌড়াল এবং এবং পাথর ছুঁড়ে সেটিকে মেরে ফেলল। যেখানে মৃত কাকটি পড়ে ছিল সেই জায়গার দিকে যখন সে হেঁটে গেল  সে একটু দূরে লক্ষ্য করল,সামনে,  একটি পাহাড়ের খাঁজে ফাটল থেকে জল ধীরে ধীরে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে।

 আনন্দে আত্মহারা হয়ে, আলবাই প্রাণ ভরে জল পান করে তৃষ্ণা মিটালো এবং ফিরে এলো তার আগের বসার জায়গায়। সে তার পুটলিটি তুলে নিল, ঠিক যখন সে রওনা হতে যাচ্ছিল ,তখনই উপরের দিকে তাকিয়ে, সে একটি সাপকে দেখল পাহাড়ের চূড়ায় ঘুমিয়ে রয়েছে। বিষ ঝরছিল তার জিভ থেকে।
"আহ্! তাহলে ওটা সাপের বিষ ছিল যা আমি সংগ্রহ করছিলাম! কাকটি আমার জীবন বাঁচিয়েছে!" সে অনুশোচনায় কেঁদে ফেলল।"
"হায়!" ইর্তেগেল চিৎকার করে উঠলেন। "বেচারা কাক! নিজের জীবন  উৎসর্গ করেছে  অন্য একজনের জীবন বাঁচাতে!" গভীর দীর্ঘশ্বাস ইর্তেগেল হৃদয় থেকে বেরিয়ে এলো‌।"তুমি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললে!" জাদুকরী পাখিটি বলল এবং মিষ্টি হেসে উড়ে চলে গেল।

পাখিটি চোখের আড়ালে চলে গেলে ইর্তেগেল এক চিলতে হেসে আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর মৃদুস্বরে বলে উঠলেন, "হায়! তবে তাই হোক! এই  পাখিটিকে স্পষ্টতই আমাদের সবার চেয়ে অনেক বেশি চতুর এবং মায়াবী। একে ধরে রাখা কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়।" নিজের পরাজয় মেনে নিয়ে, এক বুক বিস্ময় আর ভালোলাগা নিয়ে তিনি আবার পাহাড়ের পথ ধরে তাঁর বাড়ির পানে হাঁটা শুরু করলেন।

Post a Comment

0 Comments