মুখোশ, পশুমুখা নাচ এবং টিকে থাকার লড়াই
সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
ভিলওয়ারা, রাজস্থান : নিজস্ব সংবাদদাতা – গতকাল রাজস্থানের ভিলওয়ারার এক মোবাইল ফোনের দোকানে রোমহর্ষক চুরির ঘটনা ঘটেছে। গতকাল গভীররাতে এক চোর ছাদের দরজার তালা ভেঙে দোকানে ঢুকে বহু দামী মোবাইল চুরি করে নিয়ে যায়। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জানা গেছে যে ঐ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখোশে নিজের মুখ ঢেকে দোকানে প্রবেশ করেছিল। পুলিশ জোরদার তদন্ত শুরু করেছে।…..
“মুখোশে মুখ ঢাকা চোর” – এই খবরের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে মুখোশ হলো নিজেকে আড়াল করার এক সাধন বা উপকরণ। মনে পড়ে ছোটোবেলায় পুজোর সময় বাটা কোম্পানির মুখোশ পাবার জন্য মন কেমন আকুলিবিকুলি করতো। সেক্ষেত্রে মুখোশ ছিল বিনোদন বা মনোরঞ্জনের এক আশ্চর্য সহায়। আবার করোনা মহামারীর সময় মুখোশের গণ ব্যবহার ছিল প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলে চলার জন্য আবশ্যিক প্রতিরক্ষা। চারদিকে ঘটে চলা ঘটনাপ্রবাহ দেখে কেউ কেউ অবশ্য তির্যক মন্তব্য করেন – মুখোশে ঢাকা মানুষের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলি অবিরত। মনে পড়ে যায় কবি শঙ্খ ঘোষের লেখা কবিতার সেই অবিস্মরণীয় পংক্তি কটি –
মুখের কথা একলা হয়ে
রইল পড়ে গলির কোণে
ক্লান্ত আমার মুখোশ শুধু,
ঝুলতে থাকে বিজ্ঞাপনে।
আজ অবশ্য এই নিবন্ধের প্রেক্ষাপটে কোনো জটিল বিশ্লেষণ নেই, আছে নিছকই বিনোদন, মনোরঞ্জন আর এক দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের কথা। আমাদের বাংলার দুটি লোকনৃত্যের ধারায় মুখোশের ব্যবহার অপরিহার্য। এই দুটির একটি অবশ্যই পুরুলিয়া জেলার বিখ্যাত ছৌ নাচ,আর একটি তুলনামূলক ভাবে স্বল্প পরিচিত মালদহ জেলার গম্ভীরা নাচ।
ছৌ নাচ পরিবেশিত হয় মুখ্যত পৌরাণিক নানান কাহিনিকে আশ্রয় করে। কুশীলব নৃত্যশিল্পীরা চরিত্রানুগ ঝলমলে মুখোশ পড়ে নাচ করেন। ছৌ নাচে বীররসের দাপট।
অন্যদিকে মালদহের গম্ভীরায় ভোলানাথ শিব বা গম্ভীর হলেন প্রধান চরিত্র। এই গম্ভীরের কাছে স্থানীয় মানুষ তাদের অভাব - অভিযোগ, আনন্দ - বেদনা, প্রত্যাশা - হতাশা, প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির কথা বলেন নাচ ও গানের মাধ্যমে। ছৌ নাচে মুখোশ অপরিহার্য। তবে মুখোশের ব্যবহার ছাড়াও লোকশিল্পীরা গম্ভীরা পরিবেশনা করেন। বাঙলার লোকজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে এই দুটি লোকজ শিল্প ধারা।
মুখোশ নাচের ধারা বিস্তৃত হয়েছে আমাদের পাশের রাজ্য ওড়িশাতেও। এই রাজ্যের সমুদ্রোপকুলবর্তী জেলা গঞ্জামে প্রায় দুশো বছরের পুরনো এক আশ্চর্য মুখোশ নাচের ধারা আজও বহমান রয়েছে – পশুমুখা নাচ।পুরুলিয়ার ছৌ নাচে যেমন ঐশী চরিত্রদের প্রাধান্য,পশুমুখায় একচ্ছত্র আধিপত্য পশুদের। অনেকটা যেন ঈশপের গল্পের মতো।ময়ূরভঞ্জের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় একটু একটু করে বিকশিত হওয়া এই লোক বিনোদনের ধারাটি আজকের দুনিয়ায় রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। তাকে সচল করে আবার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আর এই কর্মকান্ডের প্রধান মানুষটি হলেন জগদীশ পাণিগ্রাহি। আমরা তাঁর কথায় আসবো, তবে তার আগে এই বিশিষ্ট নৃত্যধারা সম্পর্কে দুই একটি কথা বলে নিই।
দক্ষিণ ওড়িশার গঞ্জাম জেলায় একসময় ঘুমুসার নামের এক ছোট্ট রাজকীয় রাজ্য ( Princely State) ছিল। ইংরেজ শাসকরা এই রাজ্যের আবাসিকদের নরখাদক বলে মনে করতো। অভিযোগ ছিল যে নানা ছল ছুতোয় তারা নাকি নরবলি দিত। আসলে অরণ্যসঙ্কুল এই ছোট্ট রাজ্যে বন্য পশুদের আনাগোনা ছিল খুব। প্রায়শই বাঘের আক্রমণের শিকার হতো এই ঘুমুসারের মানুষ। ইংরেজ শাসকরা এই ব্যাপারটাকেই রঙ চড়িয়ে অন্যরকম ব্যাখ্যা খাড়া করতো। এই এলাকায় তন্ত্র মন্ত্রের প্রভাবও ছিল খুব। অধিবাসীরা বিশ্বাস করতো যে জঙ্গলের রাণী মা ব্যাঘ্র দেবী ও তাদের বহু পুরুষের আরাধ্যা মা ঠাকুরানি দেবীকে সন্তুষ্ট করলেই বোধহয় বনের পশুরা শান্ত হবে , তাদের জীবনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরে আসবে। সেই বোধ আর বিশ্বাস থেকেই ঘুমুসারের মানুষেরা পশুদের মুখোশে নিজেদের সজ্জিত করে নৃত্য গীতের মাধ্যমে দেবীদের আরাধনায় মেতে ওঠে। নরখাদক পশুর চলনভঙ্গির অনুকরণে তৈরি হয় এই নাচের পদ সঞ্চালন ভঙ্গিমা। পশুমুখা নাচের প্রতিটি পদক্ষেপের মধ্যেই মিশে আছে অরণ্য পরিবেশ ও বন্যপ্রাণিদের স্বভাবের প্রতিফলন। বসন্ত বাতাস যখন নতুন উন্মাদনায় ভরে ওঠে, তখন ঘুমুসারের সাধারণ মানুষ ব্যস্ত হয়ে ওঠে পশুর সাজে নিজেদের সাজিয়ে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রিয় ছাঙ্গুর ( ঢোল) দ্রিমি দ্রিমি আওয়াজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অঙ্গ সঞ্চালনে। এই সময় যে দেবীকে বন্দনার সময়, ঠাকুরানি যাত্রার এই সময় যে পশুমুখা নাচে মেতে ওঠার সময়।
সময়ের সাথে সাথে একসময় পশুমুখা নাচের ধারায় ভাটা পড়ে যায়। লোকজন উপযুক্ত উৎসাহ আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই ছন্দোময় জীবনের স্বাদ ভুলে যেতে থাকে। গঞ্জাম জেলার গুটিকয়েক মানুষ আর পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই থমকে থাকে এই গৌরবময় নৃত্যধারার পরম্পরা। এমনি এক কঠিন পরিস্থিতিতে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন পদ্মশ্রী প্রয়াত ভগবান সাহু মহাশয়। তিনি নিজে এবং নরেন্দ্রপুরে তাঁর বিখ্যাত নাচের দলকে সঙ্গে নিয়ে ময়দানে নেমে পড়লেন। ভগবান সাহু ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দক্ষিণ ওড়িশার একাধিক বিস্মৃতপ্রায় নৃত্য শৈলীর পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর অদম্য লড়াইয়ের ফলেই অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত পশুমুখা নাচের গরিমা ওড়িশা রাজ্যের আঙিনা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্ব বিনোদন মঞ্চে।
নদীর জোয়ার ভাটার মতো শিল্পেরও ওঠানামা থাকে। বিপরীত ধারার প্রভাবে ভেসে যায় বহুদিনের চেনা খাতের প্রবাহ। পশুমুখা নাচের ক্ষেত্রেও এমনটাই হলো। ঘুমুসারের যে কয়েকটি পরিবার এই বিশিষ্ট নৃত্যের চলনের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে রেখেছিল তারাও একসময় হতোদ্যম হয়ে পশুমুখা নাচের চর্চা থেকে সরে গেল প্রায় নীরবে। ঘোর সংকট নেমে এলো গঞ্জামের লোক শিল্পে।
এমনই এক সমস্যাঘন সময়ে অবতার হিসেবে এগিয়ে এলেন জগদীশ পাণিগ্রাহি। তিনি বুঝতে পারলেন যে চলতি হাওয়ার পন্থি না হয়ে পশুমুখা নাচের একান্ত দেশজ বৈশিষ্ট্যকে যদি ধরে রাখা যায় তাহলেই কেবলমাত্র এই বিশিষ্ট নৃত্যধারা টিকে থাকতে পারে। মানুষ স্বকীয়তা চায়। দেশজ যন্ত্রানুষঙ্গের পাশাপাশি,আভরণ ও আবরণকে সম্পূর্ণ বদলে না ফেলে, তাকে যুগপোযোগী করে তোলার প্রচেষ্টা করতে হবে।
জগদীশ ভঞ্জনগরের মানুষ হিসেবে খুব ছোট বেলা থেকেই পশুমুখা নাচের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল এই নাচ তো কেবল মনোরঞ্জন বা বিনোদনের মাধ্যম নয়,পশুমুখা নাচের প্রতিটি আখ্যান মানুষ ও পশুর চিরায়ত সম্পর্ককে তুলে ধরে শৈল্পিক উপায়ে। তাই আজকের দিনে এই ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে মানুষেরই কল্যাণ হবে।
জগদীশ পাণিগ্রাহির গুরু ছিলেন শ্রদ্ধেয় শান্তনু কুমার দাস। একরকম ভাবে গুরুর নির্দেশিত পথেই তিনি নিজেকে নিয়োজিত করলেন – ওড়িশার হারিয়ে যাওয়া লোক শিল্প তথা লোক নৃত্যকলার পুনরুজ্জীবনই হয়ে উঠলো তাঁর জীবন সাধনা। ১৯৯৯ সালে তিনি বিশ্ব জননী কলা পরিষদ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন যার উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হাতে হাত রেখে পশুমুখা নাচের চর্চ্চার সুযোগ বৃদ্ধি করা। এই সুবাদে বেশ কিছু পুরস্কার জিতে নিলেন তিনি। পাশাপাশি চলতে থাকে গবেষণা, অনুসন্ধান ও মঞ্চে তার প্রয়োগ।
জগদীশ মাটি কামড়ে পড়ে রইলেন। একটু একটু করে পরিস্থিতি যেন বদলাতে শুরু করলো। জগদীশ আর তার নাচের দল আবার ডাক পেতে শুরু করেছে এলাকার বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে, মেলা আর লোকোৎসবের আঙিনায়। বন বাঁচাও, বন্যপ্রাণিদের বাঁচাও , মানুষ ও বন্য প্রাণিদের সঙ্গে সংঘাত নয় সহাবস্থানের ভাবনাকে প্রসারিত করার বার্তা আজ জগদীশ ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব জননী কলা পরিষদের সদস্যরা পৌঁছে দিচ্ছেন দেশ বিদেশের মাটিতে। পশুমুখাকে বাঁচাতে কোনো সমঝোতায় যাননি জগদীশ। তিনি মনে করেন যে চলতি হাওয়ায় গা না ভাসিয়ে নিজেদের ঐতিহ্য ও পরম্পরায় বিশ্বস্ত থাকলে এক সময় ঠিক ঘুরে দাঁড়ানোর রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়। এই সাফল্য আজ অনেক নবীন প্রজন্মের শিল্পীদের আগ্রহী করে তুলেছে পশুমুখা নাচের প্রতি। জগদীশ পাণিগ্রাহির সাফল্য এখানেই।
ঘুমিয়ে পড়া ঘুমুসার নতুন করে জেগে উঠেছে। নিয়মিত ডাক পড়েছে নানান অনুষ্ঠানে। সরকারি সাহায্য মিলছে একটু একটু করে। পোষাক, অঙ্গসজ্জা আর পদসঞ্চালনের সাবলীল সৌন্দর্য এই তিনের মেলবন্ধনে পশুমুখা সত্যিই অনন্য। ঐতিহ্যর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার সুবাদে মুখোশের আড়ালে থাকা সত্যিকারের মানুষগুলোর মুখে আজ হাসি ফুটেছে। এটা কি কম পাওয়া!
3 Comments
লেখককে জ্বলদর্চি পরিবারে স্বাগত জানাই।বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে তিনি এক বিরল সংস্কৃতির কথা তুলে ধরেছেন। আশা করছি ভবিষ্যতে নানা বিষয়ে তার লেখনীর বর্ণালীতে আমরা রঞ্জিত হওয়ার সুযোগ পাবো।
ReplyDeleteপ্রথম মতামত জানানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। এসে যখন পড়েছি তখন দাগ রেখে যাবার জন্য নিশ্চয়ই নিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করবো। মুখোশের আড়ালে থাকা সত্যিকারের মানুষগুলোর কথা বলতে পেরে ভালো লাগছে। আপনাদের কেমন লাগলো তা জানালে খুশি হবো। ভালো থাকবেন সবাই।
ReplyDeleteবিষয়টি আমার কাছে বেশ নতুন লেগেছে। লেখক সম্ভবত এই লেখার মধ্য দিয়ে জ্বলদর্চির পাতায় আত্মপ্রকাশ করলেন। গম্ভীরা ও পশুমুখার কথা এই লেখার সূত্রেই জানলাম। ভালো লাগলো। টানটান গদ্য বাড়তি সম্পদ।
ReplyDelete