জ্বলদর্চি

যজ্ঞডুমুর/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৩২
যজ্ঞডুমুর

ভাস্করব্রত পতি

হিন্দুধর্মে যজ্ঞডুমুর একটি পবিত্র বৃক্ষ। এর নামের সাথেই লুকিয়ে আছে এর পরিচয়। হিন্দুদের যাবতীয় পূজার্চনায় যজ্ঞাদিতে হোমের সময় এই যজ্ঞডুমুরের ছোট ছোট ডোগাযুক্ত ডাল (শাখার অগ্রভাগ) ঘিয়ে ডুবিয়ে আহুতির উপাদান সমিধ হিসেবে দেওয়া হয়। যা খুব পবিত্র বলেই মনে করা হয়। এছাড়াও যজ্ঞডুমুরের কাঠ দিয়ে যজ্ঞস্তম্ভ এবং হাতাও তৈরি করা হত। এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম গাছগুলোর মধ্যে একটি বলে বিবেচিত হয়। প্রাচীন মিশরে এই ডুমুরের জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে। 

গৌতম বুদ্ধ জ্ঞান লাভের জন্য যে তিনটি বটগাছ ব্যবহার করেছিলেন। সেগুলির মধ্যে একটি বটগাছ (পিপল) এবং একই গোত্রের বটগাছ (Banyan Tree), বটগাছ (ডুমুর গাছ) ভগবান দত্তাত্রেয় এবং তাঁর শিষ্যদের জ্ঞান লাভে সাহায্য করেছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে মারাঠি ভাষায় লেখা 'গুরু চরিত্র'-তে এই কাহিনি মেলে। ঋকবেদ, যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদে 'উদুম্বুর' বৃক্ষটির নাম 'উম্বর' বলে উল্লেখ করা হয়েছে -- 'উম্বর স্ত্বমসিপাপ্  মান বলাসং শতস্য পাকারোরসি পৃশ্নিরশ্মা বিচক্রমে'। 
ডুমুর ফল

যজ্ঞডুমুর গাছের ফল এদের কাণ্ডের গায়ে থোকায় থোকায় হয়। মূলতঃ বন্যপশু এবং পাখির খাদ্য। কাঁচা অবস্থায় কোথাও কোথাও এদের ফল খাওয়া হয় ভেষজ হিসেবে। পুকুরের পাশে থাকা যজ্ঞডুমুর গাছের রঙিন ফল পুকুরে পড়লে তা মাছেদের খাদ্য হয়ে ওঠে। উত্তর অস্ট্রেলিয়াতে প্রজাপতির খাদ্য এই গাছের কচিপাতা। সেখানে এজন্য এই গাছের চাষ করা হয় রীতিমতো। এই যজ্ঞডুমুর গাছ সাধারণ ডুমুর গাছের চেয়ে বড় হয়। এদের পাতা ডুমুরপাতার চেয়ে ছোট এবং মসৃন। ফলগুলি ডুমুরের চেয়ে বড়। পেকে গেলে লাল মধুর স্বাদ হয় এবং ফলের মধ্যে পোকা জন্মায়। কাঁচা ফল কেটে দিলে আঠা বের হয়। গ্রীষ্মকালে এই পাকাফলের সরবৎ অনেকে খায়। 

বাগধারাতে আমরা বলে থাকি 'ডুমুরের ফুল হয়ে গিয়েছিস'। আসলে ডুমুরের ফুল দেখা যায় না। উদ্ভিদবিদ্যার পরিভাষায় এদের পুষ্পবিন্যাসকে বলে উদুম্বুর পুষ্পবিন্যাস। আসলে এটি অন্তঃপুষ্প। অর্থাৎ ডুমুরের ফুল থাকে ডুমুরের ফলের মধ্যেই। ডুমুরের পুরুষ এবং স্ত্রী ফুল হাইপেনথোডিয়াম নামের বিশেষ পুষ্পমঞ্জরিতে উৎপন্ন হয়। এর পুষ্পধারকটি স্ফীত, গোলাকার ও ফাঁপা হয়। এ জন্য ডুমুরের ফুল বাইরে থেকে দেখা যায় না। যজ্ঞডুমুরের একটি ফলের ভেতরে ১৬০০-১৭০০ টি বীজ থাকে। পাখি খেয়ে  মলের সঙ্গে বীজ ছড়িয়ে দেয়। তখন নতুন গাছ জন্মায়। 
পাকা ডুমুর

সাধারণ ডুমুরের মতো যজ্ঞডুমুর হল Moraceae পরিবারের অন্তর্গত। এই গাছের বিজ্ঞানসম্মত নাম Ficus racemosa এবং Ficus glomerata। বাংলায় যা যজ্ঞডুমুর বা জগডুমুর বা গজ গাছ নামে পরিচিত, তা ইংরেজিতে Sacred Fig, Cluster Fig, সংস্কৃতে উদুম্বুর, হিন্দিতে গুলাড়, অসমীয়াতে যজ্ঞ ডিমরু, কন্নড়ে আট্টি, তেলুগুতে মেডি পাণ্ডু, সিংহলিতে আট্টিক্কা, নেপালীতে ডুমরী, তামিলে মালাইইন মুনিভান, আতথি, মারাঠীতে আদুম্বুর নামে জনপ্রিয়। এছাড়াও যজ্ঞডুমুরকে হেমদুগ্ধী, যজ্ঞাঙ্গ, উড়ুম্বর, জন্তুফল, হেমদুগ্ধক, যজ্ঞফল নামেও ডাকা হহয় আয়ুর্বেদের পরিভাষায় একে বলে ক্ষীরীবৃক্ষ। কেননা, এই গাছ থেকে ঘন দুধের মত আঠালো নির্যাস নির্গত হয়। 

ভারত ছাড়াও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, অষ্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াতে বহুল পরিমাণে জন্মায়। সমৃদ্ধি অর্জন এবং শত্রুদের পরাজিত করার একটি উপায় হিসাবে এই উদুম্বুরকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে অথর্ববেদে। 

এর ফলগুলি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ হলেও গ্রামাঞ্চলে যজ্ঞডুমুরের ফল খাওয়ার চল তেমন নেই। তবে আয়ুর্বেদিকদের কাছে এটি একটি ভেষজ ফল। যা হজমশক্তি বৃদ্ধি, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে। এএর মধ্যে আয়রন এবং ক্যালসিয়াম থাকে, যা হাড়ের রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। অনেকে এই ডুমুরের খোসা ছাড়িয়ে বিশেষ পদ হিসেবে রান্না করে। তবে সাধারণত গেরস্থের লোকজন হেঁসেলে যজ্ঞ ডুমুরের ব্যবহার এড়িয়ে চলেন।
🍂

Post a Comment

0 Comments