গৌতম বাড়ই
শিশিরের কথা মনে পড়ে:
তখন আমরা যুবকের দল। স্বপ্ন দেখি ঠারেঠোরে দিনেদুপুরে শয়নে, কী জাগরণে! শিশির একদিন হন্তদন্ত হয়ে সান্ধ্য ঠেকে এসে বলল, আমাদের দেশে কোনদিনও বিপ্লব হতে পারে না।
আমরা অবাক হলাম না, শুধু বললাম, স্বপ্নে দেখেছিস ? নাকি তোর চারুপন্থী কাকার বর্তমান বয়ান?
-- চারুপন্থী কাকা কেন হবে? আমি সবপন্থীদের ওপরে,হালপন্থী।আমার কথা মিলিয়ে নিস তিনটে দশক পর!
তিনটে দশক কেন? আমরা বেশিরভাগই জানতাম সেইসময়ে বিপ্লব এক মৃত জিনিস। বিদ্রোহ জেগে জেগে ওঠে বারবার।
স্বপ্নের মধ্যে বিষাদ। স্বপ্নের মধ্যে প্রেম প্রীতি প্রেতাত্মা ভবিষ্যতের আলো আঁধার সম্পর্ক সব। ভালোবাসতে বাসতে যখন কোমর সমান জলে দাঁড়িয়েছি, তখন সাবমেরিনের মতন ভেসে ওঠে মিত্রদের বাড়ির বড়কর্তা। দিলে তো শালা ঘুচিয়ে সুখস্বপ্নটা।
মনে পড়ে অলকানন্দার কথা:
বিজয় আর আমার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনত। দেখেও মনে হত যেন, অলকা সারা দিনমান স্বপ্ন সাগরে ভাসছে। খালি বলত, বল না কাল রাতে স্বপ্ন দেখেছিলি? বানিয়ে বানিয়ে বলতাম। একদিন বানিয়ে বানিয়ে বলে দিলাম সুশীল মিত্রকে আমরা কাঁধে করে নিয়ে চলেছি বনপলাশের শ্মশানে। এতে হিতে বিপরীত হল, প্রায় পক্ষকাল কথা বলেনি আমার সাথে। তখন এইসব গঞ্জ -গাঁয়ে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা বারণ ছিল। যদিও আমি, বিজয় , শিশির, অলকা, সুতপা প্রভৃতি সব একই কলেজে একই ক্লাসে পড়ছি।
ফ্রয়েডীয় স্বপ্ন মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা পড়ছি ও জানছি একটু একটু করে। তবে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক দোদুল্যমান সুতোয় ঝুলছি আমরা।মেয়েরা আছে বলে অধ্যাপকেরা স্বাচ্ছন্দ্য নন। তাতে হল অবিশ্বাসের পাল্লাই ভারী। এই পশ্চিম জগতের ব্যাখা ,যৌনতার এই দর্শন বিশ্লেষণ, কেউ গভীরভাবে বুঝত না, আমাদের বুঝাতেও পারত না। পরিবেশ কিংবা কলেজের অধ্যাপকদের কাছ থেকেও। এক ধরনের অস্পৃশ্যতা যেন ওই শব্দটিকে ঘিরে । তাই স্বপ্ন চিরকাল,এক পেট গরমের বিষয় থেকে গেল। পেট গরম হলেই বুঝি স্বপ্নেরা ভিড় করে আসে। পেট গরম হলেই বুঝি মানুষ তরল হয়ে পড়ে। আজ যেমন মনে হয় , আজকের যুবক যুবতীরা অনায়াসে কত কথা এইসব বিষয় নিয়ে বলতে পারে! আবার অবাক লাগে পাড়ার মোড়ের গাছ গাছড়া শেকড় বাকড়ের দোকানটিও কেমন রমরমিয়ে চলছে!
সে থাক গে। উঠেছিল স্বপ্নের কথা, তাই দিয়েই শেষ করছি। সে ছিল যৌবনের এক প্রান্ত বেলা। বিকেল আর সন্ধের মুখে সন্ধিক্ষণে কী অপূর্ব আলোরছটায় পৃথিবী ভরে ওঠে না! ঠিক অমন এক সময়ে -- অলকা এগিয়ে এসে বলল, তোর সেই বসন্তের স্বপ্নের কথা , এই হেমন্তে এসেও বলতে পারলি না? ভুলেই গেছিস হয়ত! কারণ আবার বসন্ত এসে গেল বলে।
আমি টের পেলাম আমাদের এই আধা শহরের লাইব্রেরীর মাঠে অলকানন্দা আমার প্রায় গা ঘেঁষে আরও নিবিড় হয়ে বসেছে। আমি বসন্তে সেই স্বপ্ন তো এখনও জাগরণেই দেখি! ওটা তো কোনদিনও সুনীলের নীরার মতন স্বপ্নে আসেনি। অলকানন্দা কে তাই বলিনি। পুরো বানিয়ে বলে দিলেই বা কী!
বললাম- শুনবি?
অলকা বলল- ঢঙ না করে সোজাসুজি বল। পুরুষ মানুষের ঢঙ একদম মানায় না।
--- তোকে ওই বসন্ত রাত্রিতে দেখলাম,দেখ...লাম.....তৃপ্তিদের কাঁঠালবাগানে বসবার জায়গার সামনে দাঁড়িয়ে চুমু খাচ্ছি। একটা দুটো....
চুমু নয়, কিস বলতে হয়। দেখিসনি লাভ স্টোরি, কুমার গৌরবের?
অলকানন্দা আমার হাতে আলতো চাপ দিল।
অথচ এরপরে কেমন যেন দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল। ওই বাসন্তী স্বপ্নের জন্য! অলকানন্দার বন্ধুত্ব সুদূর এক পরিযায়ী পাখীর মতন হারিয়ে গেল। যে পাখি ডানা মেলে উড়ে চলে সুদূরে। তাহলে সেই স্বপ্নটাকে কী বলব, বিষাদের না প্রেমের?
যে স্বপ্ন কখনও শেষ হয় না
0 Comments