জ্বলদর্চি

হেরে গেলেন ভোলে বাবা(প্রথম পর্ব)/সৌমেন রায

হেরে গেলেন ভোলে বাবা

(প্রথম পর্ব)

সৌমেন রায

চিত্র – কল্লোল মজুমদার

নীল ষষ্ঠীর পরের দিন শিবঠাকুর নন্দী আর ভৃঙ্গিকে ডেকে বললেন, ‘বুঝলি,  গাটা একটু ম্যাজ ম্যাজ করছে। জ্বর আসবে মনে হয়। কাল সবাই মিলে যা জল ঢেলেছে !একবার তো মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে মরেই যাব’। 

বাবা  বরফ-জমা কৈলাসে যায় এক কাপড়ে। তার ঠান্ডা লেগেছে শুনে নন্দী আর ভৃঙ্গি তো ভেবেই অস্থির। কি ওষুধ দেবে বাবাকে? অ্যালোপ্যাথি, না অ্যালোপ্যাথি একদম চলবে না। হোমিওপ্যাথি মা ব্যবহার করে।প্রতিবার পুজোর সময় কিনে আনে।কিন্তু ওটা আবার বাবার কাজ করেনা।

 নন্দী বলল, ‘বাবা একটু বাসক পাতার রস করে দিই’?

 ‘না না গুলঞ্চটা ভালো কাজ করবে। আমি যাচ্ছি আনতে’। বলেই ভৃঙ্গী হাঁটতে শুরু করল। 

বাবা তাকে হাত বাড়িয়ে থামাল ।

‘আরে দাঁড়া দাঁড়া। ওসব তিতকুটে রস টস খেতে মোটে ভালো লাগেনা। চল তার চেয়ে বরং একটু এদিক ওদিক ঘুরে গা সেঁকে আসি।

ঘুরতে পেলে নন্দী - ভৃঙ্গীর মহা আনন্দ। তারা প্রথমেই ছুটে গেল বাবার বাহন ষাঁড়ের কাছে। সে সামনের দুই পায়ের মাঝে মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছিল। ডাকা ডাকি শুনে মুখটা তুলে বলল,‘আমার এখন চারদিন ছুটি। কোথাও যাবো না’। বলেই ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকাতে লাগল । অগত্যা দুই সঙ্গী নিয়ে শিব বাবা হেঁটেই বেরোল।

চারিদিকে ডেঙ্গ পটা ডেঙ্গ, ডেঙ্গ পটা ডেঙ্গ গাজনের ঢাক বাজছে। ভক্তরা সব নাচানাচি করছে। একটু এগোতেই শিবঠাকুর দেখল অনেকগুলো শিব ঘোরাঘুরি করছে। তাদের মধ্যে কেউ নাচছে ত্রিশূল উচিয়ে ,আবার কেউ খাচ্ছে ফুচকা। এতগুলো শিব দেখে ঘাবড়ে গেল শিবঠাকুর।

 ‘এ কিরে রে? এ তো দেখি অনেক শিব !’ 

 নন্দী আশ্বস্ত করলো, ‘বাবা ওগুলো শিবঠাকুর নয় গো।  শিব সেজেছে। ওরা বহুরূপী।‘

  হাঁফ ছেড়ে শিবঠাকুর বলল, ‘বাঁচালি বাবা’। 

ঐ রকম এক শিব দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ডাব খাচ্ছিল। শিবঠাকুর তার পাশে দাঁড়িয়ে ডাব খেল। তারপর দাম দিতে গিয়ে ট্যাক খুলে দেখে একটা পয়সাও নেই। কাল সবাই এত পয়সা দিল যে ? সব বামুন ঠাকুর রেখে দিয়েছে মনে হয়। হাত খরচও দেয়নি।

বলল, ‘ দেখ বাবা পয়সা টয়সা নেই। আশীর্বাদ চাস তো দিতে পারি’।

 লোকটা বিচ্ছিরি গালাগালি দিয়ে বলল, ‘ তোমার আশীর্বাদে ঘেঁচু হবে। টাকা ছাড়ো’। 

 ঘেঁচু হবে শুনেই ঠাকুরের মাথায় গেল রাগ উঠে। ত্রিশূল উঁচিয়ে তেড়ে গেল লোকটার দিকে। পিছন থেকে টেনে ধরল নন্দী। রক্তারক্তি হলে একটা বিচ্ছিরি কান্ড হবে। ডাবওয়ালাও বাবার রূপ দেখে বেজায় ভয় পেয়ে বলে, 

‘থাক থাক, পয়সা দিতে হবে না। একটা ডাব বই তো নয়। সবই তো চলছে আপনার কৃপায়’। 

বাবা একদম গলে জল।  ‘তোর বাচ্চা হোক এক গণ্ডা’-- বলে হাত তুলে আশীর্বাদ করল শিবঠাকুর। ঠিক সেই সময় একটা ছেলে পিছন থেকে ডাবওয়ালার জামা টেনে বলল, ‘বাবা পয়সা দাও। মেলা দেখবো।‘

 তার পিছনে দাঁড়িয়েছিল আরও তিনজন। একজন নাক খুঁটছে, একজন দুহাতে মাথা চুলকাচ্ছে আর সবচেয়ে ছোটটা ঢোলা প্যান্ট টেনে ধরে আছে। ডাবওয়ালা ওদের দেখিয়ে করুন মুখে বলল, ‘বাবা এক গণ্ডা আছে, আরো এক গণ্ডা হলে খেতে দেবো কি ?’

‘তাহলে বাচ্চা হোক তোর ডাবের!’ বলেই শিবঠাকুর মিশে গেল ভিড়ের মধ্যে। খানিকক্ষণ পরে লোকটা অবাক হয়ে দেখল সত্যি একটা ডাব থেকে দুটো হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা ছুটল শিবঠাকুরকে খুঁজতে। কিন্তু চারিদিকে অনেক শিব। কোন শিব যে তাকে আশীর্বাদ দিয়েছিল খুঁজেই পেলনা।

এদিকে বাবা আরো কিছুটা এগিয়ে দেখল কতগুলো ছেলে এই কাঠফাটা গরমে ক্রিকেট খেলছে। তাদের কাছে গিয়ে বলল আমিও খেলব। ওরাও খুব মজা পেল। স্বয়ং শিব খেলতে এসেছে বলে কথা ! ব্যাট হাতে দাঁড়ালো শিবঠাকুর । একটা ছেলে ছুটে এসে বল করল। বাবা অ্যায়সা ব্যাট হাঁকালো  বল গেল মেঘের মধ্যে হারিয়ে। সবাই হাঁ করে একবার মেঘের দিকে দেখে আর একবার শিবঠাকুরের দিকে। 

একটা ছেলে বলে উঠল, ‘বাপ রে ! এতো সূর্যবংশীর বাবা’।

(পরের অংশ পরের পর্বে)

🍂

 

Post a Comment

0 Comments