জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত দিবস
দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ৩রা জুলাই, আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত দিবস। প্লাস্টিক পরিবেশে এবং আমাদের সমাজ জীবনের কত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে,তা আমরা জানি, আসুন এই নিয়ে মানুষকে সচেতন করি ও বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।

পরিবেশ রক্ষায় আমাদের অঙ্গীকার প্রতি বছর ৩রা জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত দিবস। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহিত করা। আধুনিক জীবনে প্লাস্টিক আমাদের নিত্যসঙ্গী হলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আজ পৃথিবীর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার কমানো এখন সময়ের দাবি। প্লাস্টিক ব্যাগের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ, এর কম দাম, হালকা ওজন এবং সহজলভ্যতা। বাজারে কেনাকাটা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজে এটি ব্যবহৃত হয়,কিন্তু কয়েক মিনিটের সুবিধার জন্য ব্যবহৃত একটি প্লাস্টিক ব্যাগ প্রকৃতিতে শত,শত বছর পর্যন্ত থেকে যায়। এটি সহজে পচে না, বরং ধীরে, ধীরে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাটি, নদী, সমুদ্র ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে,ফলে শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের স্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
🍂
প্লাস্টিক ব্যাগের কারণে শহর ও গ্রামাঞ্চলের ড্রেন ও নর্দমা আটকে যায়, যা বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। নদী ও খালে জমে থাকা প্লাস্টিক জলপ্রবাহ ব্যাহত করে এবং জলজ প্রাণীর জীবনকে বিপন্ন করে। বহু মাছ, কচ্ছপ, ডলফিন ও সামুদ্রিক পাখি খাবার ভেবে প্লাস্টিক গিলে ফেলে, যার ফলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে বা মৃত্যুবরণ করে। একটি ছোট প্লাস্টিক ব্যাগও এভাবে প্রকৃতির জন্য বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
কৃষিক্ষেত্রেও প্লাস্টিকের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। জমিতে জমে থাকা প্লাস্টিক মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে এবং জল ও বাতাস চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি করে। এতে মাটির উর্বরতা হ্রাস পায় এবং ফসল উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। সূর্যালোক, তাপ ও ঘর্ষণের ফলে প্লাস্টিক ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। খাদ্য ও জলের  মাধ্যমে এই কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কোথাও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কোথাও কর আরোপ করা হয়েছে, আবার কোথাও পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কাপড়, পাট, কাগজ ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উপাদানে তৈরি ব্যাগ এখন প্লাস্টিকের কার্যকর বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করছে।
ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো প্লাস্টিক দূষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা। এ কারণে সরকার, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করছে। বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, র‍্যালি, সেমিনার ও আলোচনা সভার মাধ্যমে দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্লাস্টিকমুক্ত জীবনযাপনের আহ্বান জানানো হয়,তবে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, এই সমস্যার সমাধানে প্রত্যেক নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। বাজারে যাওয়ার সময় কাপড় বা পাটের ব্যাগ সঙ্গে রাখা, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার এড়িয়ে চলা, প্লাস্টিক বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং অন্যদের সচেতন করা,এসব ছোট, ছোট অভ্যাস বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পরিবার থেকেই যদি শিশুদের পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের শিক্ষা দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে। ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ব্যবহার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের প্রসার এবং অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো তাদের সামাজিক দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত,একই সঙ্গে ভোক্তাদের সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন ভোক্তার চাহিদাই বাজারকে পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত দিবস কেবল একটি প্রতীকী দিবস নয়, এটি আমাদের জীবনযাত্রা ও ভোগের অভ্যাস পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাসস্থান,তাই এর পরিবেশ রক্ষা করা শুধু সরকারের নয়, প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। আজ আমরা যদি একটি প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিই,সেটিই আগামী দিনের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
আসুন, আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ব্যাগমুক্ত দিবসে আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি প্রয়োজন ছাড়া প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করব না, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করব এবং অন্যদেরও পরিবেশ রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করব। ছোট,ছোট উদ্যোগের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী। আমাদের আজকের সচেতন সিদ্ধান্তই আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও নিশ্চিত পরিবেশ গড়ে তুলবে।

Post a Comment

0 Comments